ইরফান, আপনি চলে যাবার আগে সুবিশাল এক জীবন রেখে গেছেন

জন্ম মানে মৃত্যুর প্রতি অমোঘ যাত্রা, জন্মদিন মানে একটি সিড়ি অতিক্রম। রুদ্রের কবিতার পঙতি। সকলের জানা। দু হাজার বিশের সাতই জানুয়ারি সাহেবজাদে ইরফান আলী খান কি ভেবেছিলেন অমোঘ যাত্রার সময় সন্নিকটে? ভেবেছিলেন হয়ত। সেটা প্রথমবার ক্যান্সার বিনা নিমন্ত্রণে শরীরের নিয়ন্ত্রণ নেবার পর।

বলিপাড়ায় এমন এক সময়ে তাঁর আগমন, অফট্র্যাক সিনেমা লোকে দেখে না বললে চলে! জেনেশুনে এগিয়েছেন। সাফ জানান – ‘যেদিন থেকে স্রোতে গা ভাসাব, সেদিন থেকে মৃত্যু হবে আমার অভিনেতা সত্ত্বার।’

মরতে দেননি, জীবনের শেষ অবধি!

টায়ার ব্যবসায়ী বাবার ব্যবসায়ে মনোনিবেশ করেননি। ভারতের প্রথম টেস্টের অধিনায়ক সি কে নাইড়ুর নামে চলা সি কে নাইড়ু টুর্নামেন্টের জন্য নির্বাচিত হয়েছিলেন রাজ্য দলে, চালিয়ে যাননি খেলা। মাথায় তার অভিনয়ের পোকা, চলে আসেন দিল্লী, ভর্তি হন ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায়। ইরফান, ভাগ্যিস আপনি দিল্লীর ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় (এনএসডি) ভর্তি হলেন!

জীবনের অনেক রঙের প্রথম রঙ দেখার শুরু হয় এরপর। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক মীরা নায়ার তার সিনেমায় কাস্ট করালেন, এরপর বাদ দিয়ে দিলেন। তারচেয়েও ভয়ংকর হলো, নাটকে কাজ করার পর পেমেন্ট পান চুক্তির অর্ধেক! ম্যানেজমেন্টের যুক্তি, অভিনয় খারাপ হয়েছে! একজন অভিনেতার অভিনয় খারাপ হতেই পারে, এর বদলে টাকা কেটে নেওয়ার মতো অপমান দ্বিতীয় কিছু নেই।

সেই ইরফানই ক্রিস্টোফার নোলান, রাইডলি স্কটের মতো নামজাদা ডিরেক্টরদের দেওয়া অফারে অবলীলায় না করে দেন একাধিকবার! ইন্টারস্টেলার, সাইফাইপ্রেমীদের কাছে এ এক অনুভূতির নাম। তাতেই কাজের প্রপোজাল মেলে, কিন্তু লাঞ্চবক্সের জন্য তা ছেড়ে দেন ইরফান। দ্য মার্শিয়ান আরেক ভাললাগার নাম। রাইডলির দুর্দান্ত নির্মাণ আর ম্যাট ডেমনের অভিনয়ে এটিও সকলের পছন্দের। ইরফান এটাও প্রত্যাখান করেন পিকু’র জন্য!

তার আগে রিডলি স্কটের অ্যাকশন থ্রিলার ‘বডি অব লাইজ’-এ নাম লেখাননি চিত্রনাট্য পছন্দ হয়নি বলে! এত না’র পরেও নামের পাশে জুরাসিক ওয়ার্ল্ড, ইনফার্নো দিয়ে হলিউড মাতিয়েছেন। লাইফ অব পাই, স্লামডগ মিলিয়নিয়ার, অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ড বাগানো এই একজোড়া চলচ্চিত্রের সাধারণ মিল ইরফান খান আর পর্দায় তার সহজ অথচ দাপুটে অভিনয়।

চরিত্রের গভীরে ঢুকে মিলেমিশে একাকার হবার ক্ষমতা সবার থাকে না। ইরফান কখনোই নায়ক ছিলেন না। তিনি ছিলেন সেই ব্যক্তি যাকে দিয়ে পরিচালক গল্প বলাতে চাইতেন। তিনিও নিদারুণ আন্তরিকতায় সেসব গল্প বলে যেতেন। আমরা মুগ্ধ হতাম। হিন্দি মিডিয়ামের অশিক্ষিত রাজ বাত্রার সিনেমার শেষাংশে বলা কথায়, লাইফ ইন অ্যা মেট্টোর মন্টির সহাস্য বিচরণে, কারওয়ার হেঁয়ালি বড়ভাই, পিকুর রানা, বিল্লু বারবারের বিল্লু কিংবা পান সিং তমারের সংগ্রামী পান সিং জীবনকে চিনতে শিখিয়েছে।

ডুব সিনেমা বিতর্কিত হলেও ফারুকী সকলের ধন্যবাদ পেয়েছেন ইরফানকে দিয়ে বাংলা বলানোয়। অভিনয়ের মুন্সীয়ানার সুবাস খানিকটা পেয়েছে আমাদের ফিল্মপাড়াও। দ্য লাঞ্চবক্স, যে সিনেমার জন্য নোলানকে মানা করেন সেটি ভক্তদের হৃদয়ে গেঁথে থাকবে আজীবন। ইরফান বেঁচে রবেন পর্দায় নিজেকে উপস্থাপন করানো প্রতি সেকেন্ডে, প্রতি পদক্ষেপে। হয়ে উঠেছেন ভক্তদের আত্মার আত্মীয়।

লাইফ অব পাই’য়ে বলেছেন অমূল্য এক সংলাপ, ‘যে জিনিসটি আমাদের সবচাইতে বেশি কষ্ট দেয়, তা হচ্ছে প্রিয়জনকে শেষবার বিদায় বলার সময়টুকু না পাওয়া।’ পিকুতে দেন আরেকটি ডার্ক হিউমারাস সংলাপ – ‘পটি এবং মৃত্যু, যেকোন সময় যেকোন স্থানে আসতে পারে।’

সত্যিই, বৈশাখের টালমাটাল কালবেলায় হুট করেই এসেছে ইরফানের মৃত্যু সংবাদ। লাইফ ইন অ্যা মেট্টোয় ইরফান শিখিয়েছেন দুঃখকে কিভাবে উড়াতে হয়। শহরের সবচেয়ে উঁচু দালানের ছাদে উঠে কঙ্কনা সেন শর্মার সঙ্গে সর্বস্ব দিয়ে চিৎকার করা ইরফানের মৃত্যুতে যেন একমূহুর্তের জন্য থমকে গেছে সব।

সব্যসাচী, সরল, সাবলীল অভিনয়ের শেষ শো ‘আঙরেজি মিডিয়াম’ আপনার মুখ থেকে বের হয় এক আপ্তবাক্য – ‘জীবন যখন হাতে লেবু ধরিয়ে দেবে, তা চেপে শরবত বের করো।’ হতাশায় নিমজ্জিত বহু মানুষকে অনুপ্রেরণা দিতে এই একটি সংলাপই যথেষ্ট। আপনি নিজেও ক্যান্সারকে চেপে ফিরেছেন। কথা ছিল হলিউডে জুটি বাঁধবেন স্টিফেন স্পিলবার্গের সঙ্গে রোবো অ্যাপোকেলিপ্সো, সুজিত সরকারের উধম সিং বায়োপিক প্রজেক্টে। কথা রাখা হয়নি এই যাত্রায়।

ক্রিকেটের সবুজ ঘাস ছেড়ে অভিনয়ের রঙিন কার্পেটে এসে পরিশ্রমকে ভালবেছেন। সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইরফান বন্দনায় মেতেছে সকলে। এমন শক্তিধর অভিনেতা তো আর অহরহ আসে না। আনান্দ সিনেমায় রাজেশ খান্নার বলা একটি কথা মনে পড়ছে ভীষণভাবে। জিন্দেগী বড়ি নেহি, লম্বা হোনি চাইয়ে বাবুমশাই। ইরফান সাহেব, আপনি চলে যাবার আগে সুবিশাল এক জীবন রেখে গেছেন। যে জীবনের বন্দনা কখনো শেষ হবার নয়!

https://www.mega888cuci.com