বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন বর্বরতা ও ‘অভিনব’ এক ভালবাসার গল্প

১.

১৯২০ সাল। বেলা তখন ১২ টা। হেনরি স্টিমসন অফিসে বসে ভাবছেন নিজ দেশের কর্তৃত্বের কথা। হেনরি স্টিমসন গভর্নর জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন ফিলিপাইনে। উপরের মহলে নানান কানাঘুষা চলছে আমেরিকার কলোনিয়ালিজম নিয়ে। কলোনিয়ালে ক্ষমতা অর্থ প্রতিপত্তি সবই পাওয়া যাচ্ছে, আবার ব্যবহার ও করা যাচ্ছে!

সবদিক থেকেই কিছুটা চাপ অনুভব করছেন হেনরি।

বিয়ের বয়সও হয়ে গিয়েছে তাঁর। ভাবছেন বিয়েটা করে ফেলবেন। অবিবাহিত গভর্নর জেনারেল কেমন যেন বেমানান বেমানান লাগে। অবশেষে পরিবার তাঁর বিয়ে ঠিক করলো। বিয়ে করে ফেললেন হেনরি। পাত্রী ম্যাবেল।

স্ত্রীর সাথে স্টিমসনের সাথে এই ছবিটা ৪০ দশকের মাঝামঝি সময়ে তোলা।

বিয়ের পর যতদিন ছিলেন আমেরিকায় ততদিন শুধু স্ত্রীর সাথে খুনসুঁটি। লুকোচুরি খেলা আড়ালে আবডালে চলতে লাগলো। ভাবছেন ক’দিন পরেই ছুটি শেষ। যেতে হবে ফিলিপাইন। গুরুদায়িত্ব তাঁর কাঁধে!

আবার মনে মনে এটাও ভাবছেন হানিমুনে যাবেন নববধূকে নিয়ে। স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করছেন হানিমুনে কোথায় যাওয়া যায়। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা নাকি ল্যাটিন অঞ্চলের কোথাও!

২.

১৯৪৫ সাল। এপ্রিল মাসের কোন একদিনের ঘটনা। আমেরিকার যুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে গোলটেবিল বৈঠক চলছে। বৈঠকে উপস্থিত যুদ্ধ বিষয়ক সচিব হেনরি স্টিমসন, আর্মি অফিসারগণ, মিলিটারী জেনারেল ও বিজ্ঞানীগণ। প্রসঙ্গ পারমানবিক বোমা নিক্ষেপ। পৃথিবীকে বুঝিয়ে দেয়া যুক্তরাষ্ট্র কি জিনিস, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ‘পাঙ্গা’ নেয়ার পরিণাম যে কি ভয়াবহ সেটিই তারা বুঝিয়ে দিতে চান জাপানকে!

পার্ল হারবার আক্রমণের প্রতিশোধ হিসেবে এবার পারমানবিক বোমা। তৈরি হয়ে আছে ফ্যাটম্যান আর লিটলবয়!

টাইম ম্যাগাজিনের কভারে স্টিমসন

আজ বৈঠকে ঠিক করা হবে জাপানের কোন দুটি শহরে নিক্ষেপ করা হবে ফ্যাটম্যান আর লিটলবয়কে! বৈঠকে অনেকগুলো শহর ঠিক করা হলো। ইয়োকোহামা, নিগাটা, হিরোশিমা, ককোরা, কিয়োটো এবং নাগাসাকি!

এর মধ্য থেকে দু’টি শহর বেছে নিতে হবে। হিরোশিমা সর্বসম্মতিক্রমে বাছাই করা হলো।

এবার অপরটির পালা। মোটামুটিভাবে কিয়োটোকে সবাই বেছে নিলেন দ্বিতীয় শহর হিসেবে! কিয়োটোকে বেছে নেয়ার কারণ হলো- প্রায় ২,০০০ বৌদ্ধ মন্দির, ১৭ টি ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট, অনেকগুলো শিল্প কারখানা সহ প্রায় ১,০০,০০০ অধিবাসীর বসবাস।

তাছাড়া বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে কিয়োটোতে এখন পর্যন্ত কোনো বোমা হামলা করা হয়নি। ফলে অনেকগুলো শিল্প কারখানাই তাদের ব্যবসা জাপানের অন্যান্য স্থান থেকে সেখানে স্থানান্তরিত হয়েছে!

পাশাপাশি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সেখানে আগে থেকেই আছে। সেই সাথে কিয়োটোতে বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়ও আছে!

কমিটির বিজ্ঞানীরা চান, কিয়োটোর মানুষজন বুঝুক পারমাণবিক বোমার সাথে বিশ্বের অন্য কোনো বোমার তুলনা হয় না, এর ভয়াবহতা আজীবন মনে রাখবার মতোই একটি ঘটনা হবে!

৩.

সবকিছু যখন চূড়ান্ত, তখনই বেঁকে বসলেন দেশটির যুদ্ধ বিষয়ক সচিব হেনরি স্টিমসন। জুনের শুরুর দিকে তিনি জোর দাবি জানালেন শহরটির নাম সেই তালিকা থেকে বাদ দিতে।

ট্রুম্যানের সাথে স্টিমসনের বৈঠক

অন্যদিকে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারাও নাছোড়বান্দা। তারাও সেই নাম কোনোভাবেই লিস্ট থেকে বাদ দিতে রাজি নন।

এভাবে চলে আসলো জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহ।

কোনোভাবেই তাঁদের দমানো যাচ্ছে না দেখে স্টিমসন সরাসরি চলে গেলেন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের কাছে।অনেক চেষ্টার পর তিনি তাঁকে কিয়োটো বাদ দেয়ার ব্যাপারে রাজি করতে সক্ষম হলেন।

কিয়োটো ছিলো পারমাণবিক বোমা হামলার ব্যাপারে সেই কমিটির পছন্দের শীর্ষে। কারণ অক্ষত বাণিজ্যিক, শিক্ষাদীক্ষা, পর্যটন শিল্প ও ধর্মীয় দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ এই শহরে হামলা চালালে তা পুরো জাপানবাসীর কাছে অন্যরকম এক বার্তা পৌঁছে দিতে পারতো।

বিধ্বস্ত জাপান

তবে যখন কিয়োটো বাদ গেলো, তখনই সেখানে ট্রুম্যানের হস্তক্ষেপে স্থান পেলো নাগাসাকি। এরপরই এলো আগস্টের ৬ তারিখ ও ৯ তারিখ। মানবজাতির ইতিহাসে ঘটলো সেই ন্যাক্কারজনক ঘটনা।

৪.

হেনরি স্টিমসন কেন কিয়োটোকে বাদ দিতে জোরাজুরি করলেন? শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যানের কাছে গেলেন কিয়োটো শহরকে বাঁচাতে। কিন্তু কেন?

এর পেছনে আছে ভালবাসা। এ ভালবাসা যেমন নববধূর জন্য, ঠিক তেমনি এ ভালবাসা একটি শহরের জন্য।

প্রথম পর্বে বলেছিলাম হেনরি স্টিমসন স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করছেন কোথায় হানিমুনে যাবেন! আন্দাজ করতে পারেন পাঠক, তারা হানিমুন করতে কোথায় গিয়েছিলেন!

নয়নাভিরাম জাপানের কিয়োটো

জ্বি, তারা দু’জন হানিমুন স্পট হিসেবে জাপানের কিয়োটো শহরকে বেছে নিয়েছিলেন! হানিমুনে গিয়ে শহরটির সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন আমেরিকার যুদ্ধ বিষয়ক সচিব হেনরি স্টিমসন!

শহরটিকে ভালবেসে ফেলেছিলেন হেনরি। তাই তো তিনি কিয়োটোর এমন ভাগ্য মেনে নিতে চাননি! তাই তিনি সর্বশক্তি নিয়োগ করে কিয়োটোর নামটি সেদিন বাদ দিয়েছিলেন তালিকা থেকে, সেই জায়গাটি দখল করে নিয়েছিল নাগাসাকি!

কিয়োটো’র প্রতি হেনরির ভালবাসাই পারমানবিক বোমা হামলা থেকে সেদিন বাঁচিয়ে দিয়েছিল জাপানের শহর কিয়োটোকে!

https://www.mega888cuci.com