১৮+ কনটেন্ট মানেই কি অশ্লীলতা?

নাটক-সিনেমায় যৌনতা বা প্রাপ্তবয়স্কদের উপযোগী (১৮+) কনটেন্ট দেখানো মানেই সেটি অশ্লীলতা বা পর্নোগ্রাফি কি না, এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার জন্য গুগল করছিলাম। মজার ব্যাপার হলো, গুগল করতে গিয়ে অশ্লীলতা আর পর্নোগ্রাফি নিয়ে আমার নিজেরই দুটো আলাদা লেখা খুঁজে পেলাম।

প্রথমে জানা যাক, পর্নোগ্রাফি কী। পর্নোগ্রাফির ইতিহাস ও বিবর্তন নিয়ে নিজের লেখা থেকেই কোট করছি, ‘পর্নোগ্রাফিকে এখনো সুনির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞায় সংজ্ঞায়িত করা যায়নি। আভিধানিকভাবে পর্নোগ্রাফি (pornography) শব্দটি এসেছে গ্রিক porni (prostitute) ও graphein (to write) থেকে। অর্থাৎ শব্দের উদ্ভবের দিক থেকে পর্নোগ্রাফি বলতে বোঝায় সেসব শিল্প বা সাহিত্যকে, যাতে পতিতাদের জীবনাচার তুলে ধরা হয়। তবে প্রচলিত অর্থে পর্নোগ্রাফি হলো বই, ছবি, মূর্তি, ভাস্কর্য, ভিডিও কিংবা অন্যান্য মাধ্যমে যৌনক্রিয়া বা নগ্নতার প্রতিফলন, যেগুলোর লক্ষ্য থাকে দর্শকদের মধ্যে যৌন উন্মাদনা জাগিয়ে তোলা।’

অর্থাৎ, কোনো শিল্প উপাদান তখনই পর্নোগ্রাফি হিসেবে বিবেচিত হবে, যখন সেটির একমাত্র কিংবা প্রধানতম উদ্দেশ্য হবে অডিয়েন্সকে সেক্সুয়ালি উত্তেজিত করে তোলা। অক্সফোর্ড ডিকশনারিতেও একই রকম অর্থই বলা আছে, ‘Printed or visual material containing the explicit description or display of sexual organs or activity, intended to stimulate sexual excitement.’

এবার আসা যাক অশ্লীলতা প্রসঙ্গে। সবাই জানেন, একসময় বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে অশ্লীলতার বাম্পারফলন হয়েছিল। তো, আসলে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কোন উপাদানসমূহ ছিল যার কারণে সেগুলোকে অশ্লীলতা বলা হচ্ছিল?

এ বিষয়ে লোটে হাওক রচিত Cut-Pieces: Celluloid Obscenity and Popular Cinema in Bangladesh বই অবলম্বনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অশ্লীলতা নিয়ে একটা লেখা লিখেছিলাম। ওই বইটিতে মূলত ‘কাটপিস ফেনোমেনন’-এর কথা বলা হয়েছিল। কাটপিসগুলোই ছিল মূল অশ্লীলতার ধারক ও বাহক।

কাটপিস বলতে কী বোঝায় তা ব্যাখ্যা করা হয়েছিল এভাবে – ‘(অশ্লীলতার যুগে) দৃশ্যপটটি ছিল অনেকটা এমন: আপনি বাংলাদেশের কোনো একটি ছোট শহরের সিনেমা হলে বসে একটি ছবি উপভোগ করছেন। ছবির কাহিনী সেই চিরাচরিত ভালো বনাম মন্দের লড়াই। অতি স্বাভাবিকভাবেই সেখানে রয়েছে নাচ-গান-মারামারি। আর তারই এক ফাঁকে হঠাৎ করে, ছবির কাহিনীর সাথে অপ্রাসঙ্গিক কিছু দৃশ্যের উদয় হবে পর্দায়। এবং যেমন হুট করে এসেছিল তেমন হুট করেই আবার তাদের প্রস্থানও ঘটবে। তবে যেটুকু সময় তাদের উপস্থিতি থাকবে, সেটুকুই যথেষ্ট সিনেমা হলের পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকদের মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে। কারণ সেই দৃশ্যগুলোতে দেখানো হবে নারীদের উন্মুক্ত জননাঙ্গ বা স্তন।’

খেয়াল করে দেখুন, অশ্লীল কাটপিস চিহ্নিত করতে এখানে বলা হচ্ছে ‘অপ্রাসঙ্গিক কিছু দৃশ্যের’ কথা। অর্থাৎ যেসব দৃশ্যের সাথে চলচ্চিত্রের মূল কাহিনীর কোনো সম্পর্ক নেই। মূল কাহিনীর সাথে যদি কোনো সম্পর্ক না-ই থাকে, তাহলে ওইসব কাটপিস কেন ঢুকাতো, সেটিও খুব সুন্দর করেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে, ‘সিনেমা হলের পুরুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ দর্শকদের মনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করতে।’

তাহলে দেখা যাচ্ছে, আমাদের দেশের চলচ্চিত্রে একসময় যে কাটপিস ঢোকানো হতো, সেগুলোর উদ্দেশ্যের সাথে পর্নোগ্রাফির উদ্দেশ্য হুবহু মিলে যায়। এবং যেহেতু সেগুলোর সাথে চলচ্চিত্রের মূল কাহিনীর কোনো সম্পর্ক ছিল না, সেগুলোর কাজ ছিল কেবলই বিকৃতমনস্ক দর্শককে হলে টেনে আনা এবং তাদেরকে ক্ষণিকের যৌন উত্তেজনা দেয়া।

ফলে আমাদের দেশের প্রকৃত কনটেন্ট নির্ভর চলচ্চিত্র ক্রমশ বিরল থেকে বিরলতর হয়ে উঠছিল। যেহেতু ওই কাটপিস নামক অশ্লীলতা আমাদের দেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে ধ্বংস করে দিচ্ছিল, সে কারণেই একসময় সকলে ওই অশ্লীলতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, এবং বাংলাদেশী চলচ্চিত্র থেকে সেটিকে নির্মূল করেছে।

এবার আসা যাক সমসাময়িক প্রসঙ্গে। ধরুন কোনো চলচ্চিত্রে যৌনতা বা নগ্নতা দেখানো হলো, তাহলেই কি সেটি অশ্লীলতা বা পর্নোগ্রাফি হয়ে যাবে? না, যাবে না। কারণ অশ্লীলতা ও পর্নোগ্রাফির ব্যাপারে আগেই আলোচনা করেছি। যদি এমন কোনো দৃশ্য আসে যেটির অবতারণা ঘটেছে নিতান্তই কাহিনীর প্রয়োজনে, কিংবা নাটক-সিনেমার কোনো একটি চরিত্রকে প্রতিষ্ঠার জন্য, তাহলে সেটিকে কোনোভাবেই অশ্লীলতা বা পর্নোগ্রাফি বলা যাবে না।

কারণ –

১. সেটি কাহিনীর সাথে অপ্রাসঙ্গিক নয়, এবং

২. সেটির আগমন ঘটেছে দর্শকমনে যৌন উত্তেজনা সৃষ্টির জন্য নয়, বরং কাহিনীকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার উদ্দেশে।

সুতরাং নাটক-সিনেমায় একটু যৌনতা, কিংবা যৌনতার ন্যূনতম আভাস দেখা গেলেই, সেটিকে অশ্লীলতা বলার কোনো যৌক্তিকতাই নেই।

তারপরও আপনি বলতেই পারেন, এসব যৌনতা দেখে তো বাচ্চারা উচ্ছন্নে যাবে, কিংবা এগুলো পরিবারের সবাই মিলে দেখা যাবে না। এখানেই আসে ‘১৮+ সতর্কতা’-র বিষয়টি। সব নাটক-সিনেমা তো সব বয়সীদের উপযোগী নয়। যদি কোনো নাটক-সিনেমায় যৌনতা রাখাটা অপরিহার্য হয়ে যায়, তাহলে তো তা রাখতেই হবে। সেটিকে বাদ দেয়া মানে শিল্পের সাথে আপস করা। এর বদলে যেটি করা উচিৎ তা হলো ‘১৮+ সতর্কতা’ দিয়ে দেয়া, যেন কেবল প্রাপ্তবয়স্ক দর্শকরাই সেটি দেখে, এবং পরিবারের সবাই মিলে না দেখে একা একা কিংবা যাদের সাথে বসে দেখা সম্ভব শুধু তারাই একত্রে দেখে।

এবং এটি অভিভাবকদের দায়িত্ব যেন তাদের অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা এসব প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের নাগাল না পায়। অভিভাবকরা নিজেদের দায়িত্বটুকু পালন না করে যদি এই আশায় বসে থাকে যে ৮ বছরের নাতি থেকে শুরু করে ৮০ বছরের নানা পর্যন্ত পরিবারের সবাই মিলে উপভোগ করা যাবে, তাহলে তো নাটক-সিনেমা দেখার আশা পুরোপুরি বাদ দেয়া উচিৎ। দেখা উচিৎ স্রেফ গোপাল ভাঁড় কিংবা টম অ্যান্ড জেরি। কিন্তু ওয়েট, টম অ্যান্ড জেরি টাইপ কার্টুনেও তো অনেক সহিংসতা দেখানো হয়, যা বাচ্চাদের উপযোগী নয়!

যা-ই হোক, যেজন্য এই লেখাটা লিখতে শুরু করেছিলাম। আজকাল ওয়েব সিরিজের নামে অশ্লীলতা চলছে বলে একটি ঢালাও অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। অনেক চলচ্চিত্রবোদ্ধা আবার এটিকে চলচ্চিত্রের অশ্লীলতার সাথেও তুলনা করছেন। তাদের উদ্দেশে বলতে চাই, এ ধরনের সাধারণীকরণ বন্ধ করুন। যৌনতা বা ১৮+ কনটেন্ট মানেই সেটি অশ্লীলতা নয়। কোন প্রেক্ষাপটে সেগুলো আসছে, সেগুলো কাহিনীর সাথে প্রাসঙ্গিক কি না, এবং সেগুলোর উদ্দেশ্য দর্শককে উত্তপ্ত করা কি না, এ বিষয়গুলো আগে যাচাই করে দেখুন।

সব নাটক-সিনেমা-ওয়েব সিরিজই ভালো হয় না। কিছু কিছু ওয়েব সিরিজে যে অশ্লীলতা হচ্ছে, এবং সুযোগ পেলে চলচ্চিত্র কিংবা টিভি নাটকেও তা হবে, সেটি অনস্বীকার্য। কিন্তু দয়া করে একটু যৌনতার আভাস কিংবা একটু অস্বস্তিকর দৃশ্য দেখলেই সেটিকে অশ্লীলতার তকমা দেবেন না। ওই নাটক-সিনেমা-ওয়েব সিরিজের শুরুতেই ‘১৮+ সতর্কতা’ দেয়া হয়েছে কি না, সেটিও খেয়াল করে দেখুন। সর্বোপরি, অশ্লীলতার সাথে প্রাপ্তবয়স্ক কনটেন্টের ফারাকটা বুঝতে শিখুন।

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।