ঢাকায় এসে যে ১০ অভিজ্ঞতা হল ট্রাভেলার ড্রিউ বিন্সকির

ড্রিউ বিন্সকি। তিনি নানা দেশে ‍ঘুরে বেড়ান। সেসবের অভিজ্ঞতা লেখেন নিজের ব্লগ drewbinsky.com-এ। ভিডিও করেন, পোস্ট করেন স্যোশাল মিডিয়াতে। কেতাবী ভাষায় তিনি হলেন ভ্লগার। ২০১২ সাল থেকে শুরু হয় তাঁর ভ্রমণ। এখন অবধি ১৫০ টিরও বেশি দেশ ঘোরা হয়ে গেছে তাঁর। তিনি ঘুরে গেছেন বাংলাদেশেও। সেই অভিজ্ঞতার কথা তিনি লিখেছেন নিজের ব্লগ পোস্টে

বাংলাদেশ নিয়ে হয়তো অধিকাংশ মানুষেরই কোনো ধারণা নেই। সত্যি করে বলুন, আপনি কি বাংলাদেশের ব্যাপারে দু’টো কথা বলতে পারবেন? বাংলাদেশের মানচিত্র খুঁজে বের করতে পারবেন? কিংবা বলতে পারেন ওদের পতাকাটা দেখতে কেমন?

বাংলাদেশ নামটা শুনলেই যদি আপনি এমন বিভ্রান্ত হন, তাহলে তাতে দোষের কিছু নেই। আসলে ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে দেশটা ভ্রমণের আগ পর্যন্ত আমারও খুব একটা ধারণা ছিল না। এমনকি যাওয়ার আগেও আমি খুব একটা পড়াশোনা করিনি। আসলে আমি নিজেকে চ্যালেঞ্জ করতে চেয়েছিলাম অজানাকে জানার মধ্যে যে আনন্দ তা আর অন্য কিছুতেই নেই।

একটা সুন্দর শহর বলতে যা বোঝায় ঢাকা আসলে তা নয়। এটা বিশৃঙ্খল, অপরিস্কার, জনবহুল। সুন্দর অবকাঠামো বা টুরিস্টদের জন্য আকর্ষণীয়ও কিছু নয়। ভৌগলিক ভাবেও এটা যাওয়ার জন্য মোক্ষম কোনো জায়গা নয়। এমনকি অনেক এয়ারলাইন্সেরই ওখানে কোনো ফ্লাইট।

তবে, এই ব্যাপারগুলো মেনে নেওয়া যায়। সত্যি বলতে আমি ঢাকার সময়টা উপভোগ করেছি। আশা করি লেখাটা যারা পড়ছেন তারাও ওখানে যেতে আগ্রহী হয়ে উঠবেন। আপনি যদি ব্যতিক্রম ঘরাণার কোনো ভ্রমণকারী হন, তাহলে ঢাকার ব্যাপারে আগ্রহী হবেন। কারণ, আমি হলফ করে বলতে পারি আপনার পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের অধিকাংশই কখনো ঢাকা যায়নি।

ঢাকা গিয়ে আমার যেসব অভিজ্ঞতা হয়েছে সেখান থেকে আলাদা ১০ ব্যাপার উল্লেখ করা যায়। এগুলোর সবই আমার একান্ত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। আর এগুলো কেবলই ঢাকার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, বাংলাদেশের অন্য কোনো এলাকার ক্ষেত্রে নয়। যা লিখবো, যা মন্তব্য করবো তার সবই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া।

  • অসহ্যকর ট্র্যাফিক জ্যাম

ম্যানিলা, ব্যাংকক, মুম্বাই ও দিল্লীর সাথে ঢাকা হল বিশ্বের সবচেয়ে বাজে ধরণের ট্র্যাফিক জ্যামের নগরী। এখানে কোনো নড়াচড়া ছাড়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে হতে পারে। ব্যাপারটা খুবই হতাশাজনক। তবে, এটা আপনাকে মেনে নিতেই হবে, কারণ এটাই ঢাকার জীবন।

  • আপনিই আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু

আপনি যদি অন্যদের চেয়ে একটু অন্যরকম (গায়ের সাদা রং, সোনালী চুল, বিশেষ করে লাল চুল) হন তাহলে আপনি বাংলাদেশের যেখানেই যাবেন, লোকে আপনার দিকে তাকিয়ে থাকবে। আমি ব্যাপারটাতে অভ্যস্ত। কারণ আগেই আমি ভারত গিয়েছি, কোরিয়ার প্রত্যন্ত এক গ্রামে গিয়েছি। আপনি যদি অভ্যস্ত না হন, তাহলে অভ্যস্ত হয়ে যেতে হবে। না, ওরা হিংস্র বা খারাপ কোনো দৃষ্টিতে আপনার দিকে তাকাবে না। ওরা তাকাবে বিস্ময়ের দৃষ্টি, হাসিমুখে মাথা নাড়বে।

কতবার যে রাস্তার মাঝে লোকে আমার সাথে সেলফি তুলতে চেয়েছে, সেটা আমি গুনে শেষ করতে পারিনি। আমি অবশ্য হাসিমুখেই ওদের সাথে ছবি তুলেছি।

  • মানুষগুলো বেশ বন্ধুত্বপরায়ন

বাংলাদেশ ভ্রমণের সবচেয়ে ভাল দিক হল ওখানকার মানুষ। মোটামুটি সবাই ওখানে বেশ বন্ধুপরায়ন। সাহায্য করতে ওরা সব সময় মুখিয়ে থাকবে। আমি প্রায়ই রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষদের এটা ওটা প্রয়োজনীয় ব্যাপার জানতে চাইতাম, ওরা আমাকে বুঝিয়ে দিতে চেষ্টার কমতি রাখতো না। কেউ কেউ আমাকে বাড়ির ভেতর এসে চা-নাস্তার প্রস্তাবও দিয়েছে। আমি যদি রাস্তার কোনো একটা কোনায় দাঁড়িয়ে থাকতাম, তাহলে কেউ একজন এসে জিজ্ঞেস করতো যে আমি কিছু খুঁজছি কি না। মনে হত, ওরা আমার সাথে পরিচিত হতে আগ্রহ প্রকাশ করছে।

এখানে অবশ্যই যোগ করা উচিৎ যে, ওখানে আমি কখনোই নিজেকে অনিরাপদ বোধ করিনি। আমার কোনোরকম হ্যারাজমেন্টও হয়নি। বরং, বাংলাদেশের মানুষের আতিথেয়তায় আমি মুগ্ধ।

  • প্রচণ্ড দূষণ

ছবিগুলো দেখে নিশ্চয়ই আর বলে দেওয়া লাগে না যে – ঢাকায় দূষণের মাত্রা তীব্র। মনে হয়, এত দূষিত শহর আমি আর দেখিনি। তাই কেউ যদি ওখানে গিয়ে রাস্তায় হাঁটেন, মুখে অবশ্যই মাস্ক ব্যবহার করবেন, তাতে আপনি মানুষ, গাড়ি ও কারখানার রাসায়নিক ও আবর্জনা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারবেন।

  • ভোজনরসিকদের স্বর্গ

ঢাকায় যে খাওয়ার এত কিছু পাওয়া যাবে সেটা আমি কখনোই ভাবিনি। আমি সত্যিই বিস্মিত। শুধু বাংলাদেশি খাবার নয় কেএফসি ও বার্গার কিংয়ের মত আমেরিকান ফুড চেইনও আছে। এর সাথে কোরিয়ান, জাপানিজ ও থাই রেস্টুরেন্টও আছে।

বাংলাদেশি খাবারের সাথে ভারতীয় খাবারের মিল আছে। তরকারী জাতীয় রান্না, সুপ, সবজি, রুটি বা চা হয়। ভারতের সাথে পার্থক্য হল বাংলাদেশিরা মাংস (খাসি, মুরগি, গরু) বেশি খায়। ঢাকায় খাওয়া আমার প্রিয় খাবার হল খাসির লেগ রোস্ট।

এমনকি আমি বাংলাদেশি-চাইনিজ ফিউশন রেস্টুরেন্টগুলোতেও খেয়েছি। সেই অভিজ্ঞতাও এতটা ভাল যে তা বর্ণনার অতীত।

  • সম্ভবত এশিয়ার সবচেয়ে ‘সস্তা’ দেশ

একদম হলফ করে বলতে পারি না, কারণ এশিয়ার সবগুলো শহরে আমি এখনো যায়নি। তবে, তারপরও আমি মনে করি বাংলাদেশ এশিয়ার তো বটেই বিশ্বেরও অন্যতম ‘সস্তা’ দেশগুলোর একটি। এমনকি এখানকার খরচ ভারত, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনের চেয়েও কম।

এটা কম ঝক্কিপূর্ণ একটা ব্যাপার। কারণ, বাজেট নিয়ে কখনোই আমাকে ভাবতে হয়নি। বরং, ভরপেট ডিনার করতে কখনোই দু’বার ভাবতে হয়নি।

  • নানারকম যানবাহন

 

টুকটুক, বাইসাইকেল, ট্যাক্সি, বাস, প্রাইভেট কার, তিন চাকার রিকশা, আরও কত কি – ঢাকায় ঘুরতে বের হলে অনেকরকম যানবাহন পেয়ে যাবেন আপনি। আমি মোটামুটি সবগুলোই ব্যবহার করেছি। তবে, সবচেয়ে মজা পেয়েছি রিকশায় ঘুরে। এটায় ঘুরলে শহরটাকে ভালভাবে দেখা যায়।

তবে, যখন তাড়াহুড়োয় থাকবেন, তখন পায়ে হেঁটে যাওয়াই ভাল। কেন খামোখা ট্র্যাফিক জ্যামে বসে থাকবেন!

  • কেবল ‘ক্যাশ’ই চলে

অধিকাংশ ঝলমলে রেস্টরেন্ট বা হোটেলগুলোকে কার্ড (ভিসা ও মাস্টারকার্ড) দিয়ে পেমেন্ট করা যায়। এর বাইরে বাংলাদেশে ক্যাশের কোনো বিকল্প নেই। আমাকে আগেই বলে দেওয়া হয়েছিল যে, বিমানবন্দরে পৌঁছানো মাত্রই এটিএম মেশিন থেকে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি অর্থ তুলে রাখতে। বাংলাদেশ থেকে ফেরার সময় বাড়তি অর্থটা সহজেই ভাঙানো যায়।

  • ইংলিশ সমঝদার

আমি খুবই বিস্মিত হয়েছি যে, মোটামুটি সবাই ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। নিদেনপক্ষে বুঝতে পারে। এটা সাংস্কৃতিক পার্থক্যটা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। এর ফলে দৈনন্দিন কাজ করা, রেস্টুরেন্টে খাবার অর্ডার করা, ট্যাক্সি ডাকা – সবই বেশ সহজ হয়ে গেছে। আমি যখন এই ছবির জায়গাটায় (লালবাগ কেল্লা) গিয়েছিলাম তখন এই তরুণীরা আমার সাথে এসে কিছুক্ষণ কথা বলেছে, ছবি তুলেছে।

সবাই এখানে এসে কথা বলতে চেয়েছে, আলাপ জমাতে চেয়েছে। সাহায্য করার জন্য ওরা মুখিয়ে ছিল।

  • কোনো কিছুই সময় মত হয় না

এটার মূল কারণ হল বিভৎষকর ট্র্যাফিক জ্যাম। ওখানে গিয়ে সময়মত কিছু করার পরিকল্পনা করবেন না। যদি, আপনার সাতটার সময় কারো সাথে ডিনার করার কথা থাকে, তাহলে সেটা আটটায় গিয়ে করতে পারবেন। এর আগে হবে না।

  • শেষ ভাবনা

বাংলাদেশ অভিনব একটা দেশ। আমি বলবো, দক্ষিণ এশিয়ায় গেলে বাংলাদেশে একবার ঘুরে আসতে পারেন। আমার পরামর্শ হল – ওখানে গেলে একদম খোলা মন নিয়ে যাবেন, একদম নতুন একটা অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে আসতে পারবেন।

 

https://www.mega888cuci.com