হাসিমুখে ফাঁসি পরা ক্ষুদে ক্ষুদিরাম

১৯০৮ সালের ১১ আগষ্ট। ভোর ৪টা।

১৮ বছরের এক তরতাজা যুবকের ফাঁসি কার্যকর করা হবে আজ। সকল আয়োজন শেষে ফাঁসিকাষ্ঠে তোলা হলো যুবকটিতে, কারাফটকের বাইরে তখন হাজারো জনতার কণ্ঠে ধ্বনিত হচ্ছে ‘বন্দেমাতরম’ স্লোগান। ফাঁসিতে ঝোলানোর আগে কারা কর্তৃপক্ষ যুবকটির কাছে জানতে চাইল, মৃত্যুর আগে তাঁর শেষ ইচ্ছা কী?

স্মিত হাসলেন তিনি, নিঃশঙ্কচিত্তে উত্তর দিলেন, ‘আমি দারুণ বোমা বানাতে পারি, মৃত্যুর আগে সারা ভারতবাসীকে সেটা শিখিয়ে দিয়ে যেতে চাই।’ যুবকটির মানসিক দৃঢ়তা এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রতি তীব্র ঘৃণাবোধ দেখে শিহরিত হয়েছিলেন উপস্থিত সবাই। ওই যুবকের পক্ষের আইনজীবী উপেন্দ্রনাথ সেন এর বর্ণনা অনুযায়ী, ‘তাঁর মধ্যে কোন ভয় বা অনুশোচনা কাজ করছিল না। এদেশের নবীন যৌবনের প্রতীক হয়ে হাসিমুখে তিনি উঠে যান ফাঁসির মঞ্চে।’

মহাত্মা গান্ধীর ভারতে প্রত্যাবর্তনেরও আগে অনেকেই ব্রিটিশ শাসনের বিপক্ষে মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছে, শত শত মানুষ সেই লক্ষ্যে নিজের জীবন দান করতেও প্রস্তুত ছিলেন। এমন কতশত নাম না জানা শহীদ যে নিঃস্বার্থে নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়ে গেছেন দেশের তরে, তার হিসেব নেই।

এমনই এক নির্ভীক দেশপ্রেমিকের নাম ছিলো ক্ষুদিরাম, ক্ষুদিরাম বসু। দেশের স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখে মাত্র ১৮ বছর বয়সে যে নিজেকে উৎসর্গ করার সাহস দেখিয়েছিলো!

১৮৮৯ সালের ৩ ডিসেম্বর অবিভক্ত বাংলার মেদিনিপুর জেলার বহুভাইনি গ্রামে জন্ম নিয়েছিলেন এই ক্ষণজন্মা বিপ্লবী। শৈশব থেকেই জনমদুঃখী এই মানুষটি খুব ছোটবেলাতেই মা-বাবাকে হারিয়ে দিদি অপরূপা দেবীর সংসারেই বেড়ে ওঠেন। তাঁর নামকরণ নিয়েও প্রচলিত রয়েছে বেশমজার একটি গল্প।

শোনা যায়, তখনকার দিনে পরপর কয়েকটি ছেলেসন্তান মারা গেলে নাকি মা তাঁর কোলের ছেলের সমস্ত লৌকিক অধিকার ত্যাগ করে বিক্রি করার ভান করেন। তখন যে কেউ তাঁকে কড়ি অথবা ক্ষুদ দিয়ে কিনে নেয়। দিদি অপরূপা দেবী তিন মুঠ ক্ষুদ দিয়ে কিনে নিয়েছিলেন বলে সেই থেকে ভাইটির নাম হলো ক্ষুদিরাম।

ছোটবেলা থেকেই ক্ষুদিরাম ছিলেন দারুণ চঞ্চলমতি, দুঃসাহসিক সব কাজের জন্য তিনি সর্বদা ছটফট করতেন। মেদিনীপুর কলেজিয়েট স্কুলে পড়ার সময় এক বন্ধুর মাধ্যমে পরিচয় হয় আরেক বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সঙ্গে। দেশের জন্য নিজের জীবন অকাতরে বিলিয়ে দেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা প্রত্যক্ষ করে সত্যেন্দ্রনাথ তাঁকে সে যুগের ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সশস্ত্র সংগঠন ‘যুগান্তর’ দলের সদস্য করে নেন।এই দলটি সুসংগঠিত করার লক্ষ্যে সত্যেন্দ্রনাথ এক তাঁতশালা স্থাপন করেছিলেন। তাঁতশালার আড়ালে তিনি তাঁর শিষ্যদের লাঠিখেলা, অসি চালনা, বোমা ফাটানো, পিস্তল, বন্দুক ছোড়া ইত্যাদিও শিক্ষা দিতেন।

গ্রেফতার হওয়ার পর ক্ষুদিরাম

অচিরেই এই তাঁতশালার দক্ষ সদস্য হয়ে উঠলেন ক্ষুদিরাম। ততদিনে দিদির বাড়ির সঙ্গে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যায় চিরদিনের জন্য। ফলে কোনো পিছুটান না থাকাতে ক্ষুদিরাম হয়ে ওঠেন আরও বেপরোয়া। ১৯০৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মেদিনীপুরের মারাঠা কেল্লাতে এক বিশাল শিল্প প্রদর্শনী হয়। সেখানে সেই যুগের বিখ্যাত রাজদ্রোহমূলক পত্রিকা ‘সোনার বাংলা’ বিলি করার জন্য মারাঠা কেল্লায় প্রবেশ দ্বারে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম বই হাতে বলতে শুরু করেন, ‘আসুন পড়ুন। দেশের দুর্দশার খবর জানুন। অত্যাচারী রাজশক্তির নির্মমতার নজির – এই বই আপনাদের জন্য।’

হঠাৎ একজন হাবিলদার এসে ক্ষুদিরামের হাত চেপে ধরলো। শক্তি ও বয়সে তাঁর চেয়ে অনেক বেশি হলেও শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে হাবিলদারের মুখে মেরে বসলেন এক ঘুষি, এরপর পালিয়ে গেলেন।কিন্তু আত্মগোপন করে থাকাটা তাঁর রক্তে ঠিক ছিলো না, তাই সিদ্ধান্ত নিলেন যে পুলিশের কাছে ধরা দেবেন। সে লক্ষ্যেই আলীগড়ের তাঁতশালায় ফিরে এলেন, আত্মসমর্পন করলেন পুলিশের কাছে। তাঁর বয়স অল্প হওয়ায় পুলিশ সে যাত্রায় মামলা প্রত্যাহার করে নেয়।

ক্ষুদিরাম এবার গুপ্ত সমিতির কাজে উঠেপড়ে লাগলেন। ইতোমধ্যে বিলেতি পণ্য বর্জনের পালা শুরু হলো, বিলেতী পণ্য নৌকায় দেখলেই ক্ষুদিরামসহ বাংলার অসংখ্য ক্ষুদিরাম-বাহিনী তা ডুবিয়ে দিত। তাঁর সততা, নিষ্ঠা, সাহসিকতা ও বিচক্ষণতার কারণে ধীরে ধীরে গুপ্ত সংগঠনের ভেতরে তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি পায়।

১৯০৭ সালে দলের অর্থের প্রয়োজনে ক্ষুদিরাম এক ডাক-হরকরার কাছ থেকে মেইলব্যাগ ছিনিয়ে নেন। সারাদেশে চলতে থাকে ব্রিটিশ শাসক আর সশস্ত্র বিপ্লববাদীদের সংঘর্ষ, ধড়পাকড় আর নির্যাতন। এমন সময় বিপ্লবীদের রাজদ্রোহ মামলায় কঠোর শাস্তি দেওয়ার জন্য কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট কিংসফোর্ড মরিয়া হয়ে ওঠেন।

১৩ বছরের বালক সুশীল সেন পুলিশ সার্জেন্টকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেয়াতে সুশীল সেনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়। বিচারে ধার্য করা হয়, ১৫টি বেত্রাঘাত করা হবে সুশীলকে। বিচারক সেই কিংসফোর্ড। বেত্রাঘাতে রক্তাক্ত হলেন সুশীল, দুঃসহ যন্ত্রণাতে কাতরাতে কাতরাতেই অচেতন হয়ে পড়লেন।

খবরটি ছড়িয়ে পড়লো আলোর বেগে, ক্ষুব্ধ-ক্ষিপ্ত বিপ্লবীরাসিদ্ধান্ত নেন, আর চুপচাপ বসে থাকার সুযোগ নেই। ব্রিটিশ শাসনের ভিত্তিমূলে কাঁপন ধরাতে প্রথমেই কিংসফোর্ডকে হত্যা করতে হবে।মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ কাজের দায়িত্ব দেয়া হল প্রফুল্লচাকী আর ক্ষুদিরাম বসুকে।

ক্ষুদিরামের অভিভাবক সত্যেন বসুর কাছে চিঠি লিখে পাঠানো হলো। চিঠি অনুযায়ী, ১৯০৮ সালের ২৫ এপ্রিল ক্ষুদিরাম কলকাতায় এসে পৌছালেন। কলকাতার গোপীমোহন দত্তের ১৫ নম্বর বাড়ি ছিলো বিপ্লবীদের মূল ডেরা। এখানে বসেই হেমচন্দ্র ও উল্লাসকর শক্তিশালী ‘পুস্তকবোমা’তৈরী করলেন, বেশ কৌশলেইবইটিপাঠানো হলো কিংসফোর্ডের কাছে। কিন্তু কিংসফোর্ড বই না খোলার কারণে সে যাত্রায় বেঁচে গেলেন।

শুরু হলো আবার নতুন প্রস্তুতি। প্রফুল্ল চাকী ও ক্ষুদিরাম দু’জনে প্রথমবারেরমতো মিলিত হলেন রেলস্টেশনে। এর আগে কেউ কাউকে চিনতেন না, তবু বৃহত্তর স্বার্থে কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য দৃঢ়সংকল্প করলেন তাঁরা। দু’জনেই কলকাতা রেলস্টেশনে পৌঁছানোর পর বারীণ ঘোষ তাঁদের কাছে কিংসফোর্ডকে মারার জন্য বোমা পৌঁছে দিলেন। বোমার সঙ্গে রিভলবার কেনার জন্য কিছু টাকা ও মোজাফফরপুরে যাওয়ার জন্য একটি মানচিত্রও দেয়া হলো তাঁদেরকে। গোয়েন্দা সূত্রে কিংসফোর্ডকে হত্যার পরিকল্পনা জানার পর নিরাপত্তার স্বার্থে সেখানেই বদলি করা হয়েছিলো কিংসফোর্ডকে।

প্রতিদিন ক্লাব হাউজ থেকে সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়িতে করে নিয়মিত বাড়ি ফিরে আসে কিংসফোর্ড। পাঁচ দিন অতিবাহিত হলো, কিন্তু তাঁকে হত্যা করার উপযুক্ত সুযোগ পেলেন না তাঁরা। অবশেষে সুযোগ এলো, ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল, রাত ৮টায়। পথের মাঝখানে ঝোপ-ঝাড়ে ঢাকা একটি জায়গায় ওঁত পেতে ছিলেন তাঁরা। সন্ধ্যার পর সাদা ফিটন গাড়িটি তাঁদের কাছে পৌঁছামাত্র গাড়িটি লক্ষ্য করে ছুড়ে দিলেন বোমা, প্রচণ্ড শব্দে বিস্ফোরিত হলো বোমাটি। হামলার নায়ক ক্ষুদিরাম আর প্রফুল্ল কাজ শেষ করে ছুটতে থাকে। কিন্তু তখনও তাঁরা জানে না, ভুলবশতঃ বোমাটি গিয়ে যে গাড়িতে পড়েছে সেই ফিটন গাড়িতে কিংসফোর্ড ছিলেন না। বরং নিহত হলেন দুই বিদেশিনী।

ঘটনার পরে ক্ষুদিরাম রেল লাইনের পাশ ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে পাড়ি দেন প্রায় ২৪ মাইল পথ। সারা রাত এভাবেই ছুটে চলার পর ভোর অবধি পৌঁছে যান ভেইনি রেল ষ্টেশনের কাছে। ক্ষুদিরাম ভাবলেন, বিপদ কেটে গেছে, এবার কিছুটা খাওয়াদাওয়া প্রয়োজন। সেজন্যই ঢুকলেন এক রেস্তোরায়, সেখানেই কয়েকজন পুলিশের খপ্পরে পড়ে যান ক্ষুদিরাম। পিস্তল দিয়ে নিজেকে গুলি করার আগেই ধরা পড়ে যান তিনি।

কারাগারের এই ঘরে থাকতেন ক্ষুদিরাম

এদিকে ক্লান্ত শ্রান্ত প্রফুল্ল চাকী ট্রেনে উঠলেন কলকাতা যাবার জন্য। ধরা পড়ে গেলেন তিনিও, তবে তাঁকে গ্রেফতার করার পূর্বেই নিজের গলায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করলেন তিনি। বাংলার স্বাধীনতা সংগ্রামে তিনিই তাই প্রথম শহীদ।

ধরা পড়ার পর বোমা নিক্ষেপের সমস্ত দায় নিজের ওপর নিয়ে নেন ক্ষুদিরাম, কোনোক্রমেই অন্য কোন সহযোগীর নাম বা কোন গোপন তথ্য প্রকাশ করেননি। মোজাফফরপুর আদালতে ক্ষুদিরামের বিচার কাজ শুরু হলো ১৯০৮ সালের আট জুন, তবে পশ্চিম বাংলার কোনো আইনজীবি তাঁর পক্ষে লড়তে রাজি হননি। তখন পূর্ব বঙ্গ থেকে উকিল সতীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, কুলকমল সেন ও নগেন্দ্রনাথ লাহিড়ী ক্ষুদিরামের পক্ষে মামলায় পরিচালনায় এগিয়ে আসেন। বিচারের শুরুতেই ক্ষুদিরাম স্বীকারোক্তি প্রদান করেন। কিন্তু বিচারক কর্নডফ এই স্বীকারোক্তিকে এড়িয়ে আদালতের প্রচলিত নিয়মেই বিচার করা হবে মর্মে ঘোষণা দিলেন।

রংপুর থেকে যাওয়া তিন আইনজীবী দুই দিন ধরে সরকারী সাক্ষীদের জেরা করলেন। তবে দেশের জন্য উৎসর্গীকৃতপ্রাণ ক্ষুদিরাম নিজেকে বাঁচানোর কোনোরকম চেষ্টাও করলেন না, নিঃশর্তে সব অপরাধ স্বীকার করে নিলেন নিস্পৃহচিত্তে। শুধু বললেন, ‘আমি একবার শুধু মেদিনীপুর দেখতে চাই, আমার দিদি আর তাঁর ছেলেপুলেদেরকে একবার শুধু দেখবো।’

নাহ, সে সুযোগটি আর পাননি তিনি; রায়ে তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করা হলো। ক্ষুদিরামকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে সেই রায় কার্যকর করা হয়েছিল ১৯০৮ সালের আজকের এই দিনে।

ক্ষুদিরাম আজ নেই, কিন্তু তিনি সারা ভারতের হৃদয়ে যে স্বাধীনতার চেতনাবোধ সৃষ্টি করে দিয়েছিলেন, তা শত চেষ্টা করেও নিভাতে পারেনি ব্রিটিশ সরকার। বিপ্লবী ক্ষুদিরামের আত্মত্যাগের চেতনাকে হৃদয়ে ধারণ করে বাঁকুড়ার লোককবি পীতাম্বর দাস রচনা করেন কালজয়ী এক সঙ্গীত, যা আজও আমরা প্রায়ই বাউল, সাধক ও কবিয়ালদের কণ্ঠে আচমকা শুনতে পাই।

“একবার বিদায় দে মা, ঘুরে আসি।

হাসি হাসি পরব ফাঁসি, দেখবে জগৎবাসী।”

– ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com