হাতুরুসিংহের ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্ত ও ‘আবেগী’ আমরা

রাত থেকেই মৃদু গুঞ্জন কানে আসছিলো, একাদশে নাসির-সাব্বির দু’জনই আছেন, মুমিনুল নেই। আমার মাথায় সাথে সাথে একটা প্রশ্ন চলে এলো, সাব্বির খেলবেটা কোন পজিশনে?

(১) সাব্বির যদি ছয় নম্বরে নামে, এই পজিশনে লিটন কেন না? সে নিজেকে এইখানে প্রুভ করে নাই?

(২) সাব্বির যদি চার নম্বরে নামে, মুমিনুল কেন না? সে এই পজিশনে নিঃসন্দেহে দেশের সেরা ব্যাটসম্যান না?

আরও বেশ কিছু কম্বিনেশন চটজলদি ভেবে ফেললাম। নাহ, কোনো কম্বিনেশনেই আসেন না সাব্বির। তাহলে একদম স্টার্টিং ইলেভেনে কোন বিবেচনায় ঢুকলেন তিনি? পরিষ্কার হলো, যখন হাতুরুসিংহের টুইটটা চোখে এলো। তিনি আমাদেরকে ‘ইমোশনাল সাপোর্টার’ আখ্যা দিয়েছেন এবং বলেছেন ইমোশনাল এই কম্বিনেশনটা বেস্ট কম্বিনেশন নয়। পেছনের গল্পটা আর ধরতে তেমন বেগ পেতে হয়নি, হাতুরুসিংহের ইগোটাই একমাত্র কারণ। মেসেজটা স্পষ্ট, ‘আমাকে টপকে ওকে দলে ঢুকিয়েছো, আমি দেখাবো কে বস! সাব্বির খেলবেই, মুমিনুলকে দ্বাদশ খেলোয়াড়ই বানাবো!’

সাব্বিরের বিপক্ষে কথা বলছি কিনা? একদম নয়! আমি যে তাঁর কত বড় ফ্যান, সেটা অনেকেই জানে। তবে সেটার সাথে একটা পাদটীকাও থাকে বৈকি, শর্টার ভার্সন ক্রিকেটে।

প্রশ্নটা এখানে একজন মুমিনুল হক কিংবা একজন লিটন দাসের ছিলো না, ছিলো একটা সিস্টেমের। মুমিনুল হক এমন একজন ব্যাটসম্যান, যিনি স্রেফ নিজের দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জোরে একটি একটি করে ধাপ পার হয়ে এখানে পৌঁছাতে পেরেছেন। যখন যেই লেভেলের ক্রিকেট খেলেছেন, টপ ক্লাস পারফর্ম করেছেন। আমাদের ‘ভাঙাচোরা’ একটা ক্রিকেটকাঠামোর মধ্য থেকে একজন মুমিনুল যে উঠে এসেছেন, সেটাই আমাদের সৌভাগ্য! অন্তত আমি তাই ভাবতাম, এখনও ভাবি। সেখানে স্রেফ দুই টেস্টের ‘ব্যর্থতা’কে পুঁজি করে একাদশের বাইরে তাঁকে ছুঁড়ে ফেলার মানে লিটারেলি আমাদের পুরো ক্রিকেটকাঠামোর প্রতি অনাস্থাজ্ঞাপন করা!

হ্যা, আমরা বাড়াবাড়ি করেছিলাম তাঁকে উপমা দিতে গিয়ে। স্রেফ ১৪টি টেস্টের মধ্যেই তাঁর গায়ে ‘ব্র‍্যাডম্যান’ তকমা লাগিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু তাতে যতটা না প্রভাব পড়েছে তাঁর পারফরম্যান্সে, তার চেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে খুব সম্ভবত হাতুরুসিংহে কোচ হয়ে আসাটা। কোনও এক অদ্ভুত কারণে মুমিনুল কোচের গুড বুকে নেই, আছেন সাব্বির-সৌম্য! স্ট্যাটের দিকে যাবো না, যদিও সেদিকেও মুমিনুল তেমন পিছিয়ে নেই। কিন্তু যখন কথা হচ্ছে টেস্ট নিয়ে, সেখানে ইনভেস্ট করতে হবে ফিউচার প্রসপেক্ট নিয়ে, বাজি খেলার সুযোগ এখানে সামান্যই! হ্যা, সৌম্য কিংবা সাব্বির আমাদের ফিউচার প্রসপেক্ট, সেটা নিয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা হচ্ছে তাঁরা কি এখনও টেস্ট ক্রিকেটের টেম্পারামেন্ট অর্জন করতে পেরেছেন?

ম্যাচ শুরুর আগে অনেকটা আশা নিয়ে বসে ছিলাম, হাতুরুসিংহে’র এই ‘হঠকারী’ সিদ্ধান্ত হয়তো কোনোভাবে আমাদের ভুল প্রমাণ করবে। আফটার অল, তাঁর ভাষ্যমতে, আমরা স্রেফ ‘ইমোশনাল’ একটা জাতি! তাঁর তীক্ষ্ণ বিচারবুদ্ধি দিয়ে গড়া এই একাদশ নিশ্চয়ই কোনো যুক্তির উপর দাঁড় করিয়েছেন!

ধুর, কিসের কি! আমি অবাক বিস্ময়ে চার নম্বরে সাব্বিরকে নামতে দেখলাম। বাইরে বসে আছে সাকিব, মুশি, নাসির; লঙ্গার ভার্সনে যেকোনো দিক থেকে তাঁর থেকে যথেষ্ট পরীক্ষিত তিনজন সৈন্য! দুইজনের মধ্যে একজনের সেঞ্চুরি আছে, আর দুইজনের রয়েছে মহাকাব্যিক দুইটি ডাবল সেঞ্চুরি! তাঁদেরকে টপকে সাব্বিরকে যখন নামতে দেখলাম, নিঃসন্দেহ হলাম হাতুরুসিংহের ইগোসেন্ট্রিক চিন্তা নিয়ে, তিনি চান মুমিনুলের জায়গাতেই সাব্বিরকে খেলাতে! কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখলাম, কামিন্সের ওই বলটা বিন্দুমাত্র না বুঝে ব্যাট চালিয়ে ফিরে যাচ্ছেন সাব্বির, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েও কি দিলেন না নিজের ব্যাটিং-দৈন্যটা?

একটা খেলায় যুক্তি, বিশ্লেষণ কিংবা পারফরম্যান্স থেকে যখন ব্যক্তি-ইগো বড় হয়ে ওঠে, খেলাটা আর শুধু খেলা থাকে না। চান্দিকা হাতুরুসিংহে হয়তো দারুণ কোচ, হয়তো তিনি টেকনিক্যালি দারুণ। কিন্তু তিনি লং টার্মের জন্য আর এই পজিশনে বিবেচ্য হতে পারেন কিনা, এই ঘটনার পর সেটা ভেবে দেখাটা উচিত বৈকি!

https://www.mega888cuci.com