হাতুরুসিংহের ইগো ও মুমিনুলের ‘সিস্টেম’

কর্নিয়ার এই ইনফেকশনের কারণে চট্টগ্রামে প্রস্তুতি কাম্পে ছিলেন না মোসাদ্দেক। এই ধরণের ইনফেকশন সাধারণত ৩ সপ্তাহে সেরে যায়। মোসাদ্দেকের কপাল খারাপ, বেশি সময় লেগে যাচ্ছে…

গত বৃহস্পতিবার মিরপুরে ম্যাচ সিচুয়েশনে প্র্যাকটিস করেছে দল, সেখানে খেলেছেন মোসাদ্দেক। ব্যাটিং করেছেন। তবে ফিল্ডিংয়ের সময় চোখে বেশ জ্বালা অনুভব করেন। চোখে অস্বস্তির কারণে কাছাকাছি ফিল্ডিং না করে পরে সীমানায় ফিল্ডিং করেন। পরদিন শুক্রবার অনুশীলনে থাকলেও মাঠে নামেননি চোখের কারণেই।

তার সমস্যা হচ্ছে মূলত রোদে গেলে। ইনডোরে অনুশীলনে সমস্যা নেই। বাইরে ছায়াতে থাকলেও অসুবিধা নেই। তবে চোখে রোদ লাগলে ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রোববার রাতে ধানমণ্ডির একটি চোখের ক্লিনিকে আরেক দফা পরীক্ষা হওয়ার কথা মোসাদ্দেকের। তিন সপ্তাহ পেরিয়ে গেলে এই ধরণের সমস্যা কতদিনে ঠিক হতে পারে, সেটি নিশ্চিত করে বলা মুশকিল। অনেক সময় কয়েক মাস, এমনকি ৬ থেকে ৯ মাস লেগে যেতে পারে। আবার দ্রুতও ঠিক হতে পারে। আমরা আশা করতে পারি, দ্রুতই সুস্থ হবেন মোসাদ্দেক।

মোসাদ্দেক যে সহসাই সেরে উঠছেন না, সেটি শুক্রবারই মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। তার পরও কেন রাখা হলো স্কোয়াডে? একটিই কারণ হতে পারে, কোচের জেদ। ইগো। মুমিনুল বাদ যেতে পারেন, এই গুঞ্জণের পর থেকেই সংবাদমাধ্যমে যে ধরণের লেখালেখি হেয়েছে, তাতে কোচ আরও ক্ষেপে গিযেছিলেন বলে শোনা যায়। যদিও সেই ইগোর কারণেই মুমিনুলকে সত্যিই বাদ দেওয়া হবে, এটা আমরা ভাবতে পারিনি। কিন্তু এখন হিসাব মেলাতে বসলে, ইগো ছাড়া আর কারণ দেখি না!

সমান দায় নির্বাচকদেরও। যেহেতু তারা যথেষ্ট প্রতিবাদ করতে পারেননি, নিজেরা একাধিক জন হয়েও নিজেদের দাবী প্রতিষ্ঠা করতে পারেননি একজনের ওপর, বা সেই চেষ্টা্ও করেননি, কাজেই নির্বাচকদেরও ইগো বা জেদের কথা বলতেই পারি। হোক সেটা ঠিক বা ঠিক নয়। তারা তো পারেননি!

আজ বোর্ড প্রধান বললেন, “এত বিতর্কে যাব কেন, ১৫ জনের স্কোয়াড দিলেই তো হতো!” খুবই ঠিক কথা। টেস্টের জন্য ১৫ জন তো বটেই, ১৬ জনের স্কোয়াডও আমরা দেখেছি আগে। যদিও দেশের মাটিতে খেলা, তবু ব্যাক আপ কিপার (নির্বাচকদের ভাষ্য মতেই) রাখা হয়েছে ১৪ জনের দলে। তাহলে ১৫ জনের দল হলে সমস্যা কোথায় ছিল? সমস্যা ওই “ইগো” ছাড়া আরি কিছু দেখি না…

আর সত্যিই যদি ইগো সমস্যাই হয়ে থাকে, তাহলে মুমিনুলের জন্য সেটা ভয়ঙ্কর ব্যাপার। এমন বৈরি পরিবেশে একটা ছেলে নিজেকে কিভাবে মেলে ধরবে? আমি যদি জানি আমার কর্তাব্যক্তিরা আমার ভুল বা খুঁত ধরার জন্য বসে আছে, তাহলে আমার প্রতি পদে পদে ভুল হবে। কারণ আমি স্বাভাবিক আমি থাকতে পারব না! আমি ঠিক জানি না, কোনো হিসেবে মেলে না, দলের সবচেয়ে নিরীহ, সবার মতে সবচেয়ে ভালো ছেলেটিই কেন ইগোর শিকার হবেন। অনেক কোচেরই ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রবল থাকে। এটি ছাড়া আর কোনো ব্যখ্যা নেই। স্রেফ দেখতে পারে না, কোনো কারণ ছাড়াই হয়ত।

আজ বোর্ড প্রধান বললেন, মুমিনুল দেশের সম্পদ। অনেক বড় ক্যারিয়ার পড়ে আছে। অমুক-তমুক। তাহলে সেই সম্পদ কাজে না লাগিয়ে কেন ছুঁড়ে ফেলা হলো? কেন তাকে প্রস্ফুটিত হ্ওয়ার সুযোগ দেওয়া হলো না? এই যে বারবার নানা তকমা দেওয়া হয়, শর্ট বল খেলতে পারে না বা অফ স্পিনে সমস্যা বলা হয়, এসব করলে কারও স্বাভাবিক খেলা ঠিক থাকে? গল টেস্টে দুই ইনিংসে যে অফ স্পিনে আউট হয়েছেন মুমিনুল, কোনোটাই টেকনিক্যাল সমস্যার কারণে ছিল না। ছিল বুঝতে না পারায়। কারণ তার মনের মধ্যে ডাউট সৃষ্টি হয়েছিল। নিজেকে নিয়ে ডাউট। যে ডাউট তার জাতীয় দলের কোচই তার মাঝে ঢুকিয়েছেন! একজনকে যদি ক্রমাগত বলা হয় ‘তুমি অমুক পারে না, তমুক পারো না’, তাহলে নিজেকে নিয়ে তার সংশয় জাগবেই।

এই যে ছেলেটা যেভাবে বাদ পড়ল ও ফিরল, তার পর সে নিজের সহজাত খেলা খেলতে পারবে? এতটা অনাহূত চাপ তাকে কেন বইতে হবে? ক্রিকেটের মত সাইকোলজিক্যাল খেলা আর নেই। মুমিনুলের মনোজগতের তোলপাড় কি ব্যাটিংয়ে প্রভাব ফেলবে না? ব্যাটিংয়ের সময় প্রয়োজন ফাঁকা মাথা। আমরা মুমিনুলের মাথায় গিজগিজ ভাবনার খোরাক দিযে দিয়েছি।

কালকে খবরটি শোনার দলের একজন সিনিয়র ক্রিকেটার বলছিলেন, ‘আজকের দিনটি আমাদের ক্রিকেটের একটি কালো দিন।’ রাতে আরেকজন সিনিয়র আক্ষেপ করে বলছিলেন, ‘ভাই, ছেলেটা কি আর নিজের মত খেলতে পারবে? ওর মাথায় তো এখন কত কিছু খেলা করবে, কত কিছু ভাববে। খেরতেই পারবে না। নিজেদের সম্পদটাকে এভাবে আমরা নষ্ট করছি।’ ফোনে যা বলেছেন তারা, হুবুহু লিখে দিলাম।

কদিন আগে লিখেছিলাম, মুমিনুল দলের সবচেয়ে মেধাবী ও সবচেয়ে পরিশ্রমীদের একজন। ফেরার পথ সে ঠিকই বের করে নেবে। কিন্তু আমরা তার চলার পথকে করছি বন্ধুর। সে নিজের প্রক্রিয়া ঠিক রেখেছে। কোচ কাল এতকিছুর মধ্যে্ও বলতে বাধ্য হযেছেন, ‘সম্ভব সবকিছুই মুমিনুল করছে।’ কিন্তু টিম ম্যানেজমেন্ট আর সংশ্লিষ্টরা কি প্রক্রিয়া ঠিক রাখতে পারছে?

তবু পারতে হবে। এছাড়া উপায় নেই। এছাড়া জবাব নেই। এছাড়া পথ নেই। পথ যত বন্ধুর, ততই শক্ত হতে হবে। মুমিনুল সেই চেষ্টা অবশ্যই করবেন। সম্ভব সব কিছু করে যাচ্ছেন, এরপর হয়ত অসম্ভবকেও সম্ভব করতে চাইবেন। কিন্তু দেশের ক্রিকেট কি পারবে তাকে ধারণ করতে? একজন মুমিনুল ব্যর্থ হলে যতটা ক্ষতি তার নিজের, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি দেশের ক্রিকেটের।

আজ বোর্ড প্রধান বললেন, মুমিনুল পরিস্থিতির শিকার, দলে মুমিনুলের না থাকার কারণ নেই।তো পরিস্থিতিটা কিভাবে সৃস্টি হলো? কে সৃষ্টি করল? দায়টা যে স্বয়ং বোর্ড প্রধানকেই নিতে হয়! এমনিতেই প্রবল ক্ষমতাধর কোচকে যখন নির্বাচক কমিটিতে যখন রেখে আরও ক্ষমতাধর করা হলো, নজীরবিহীন ভাবে ৬ সদস্য নিয়ে যখন ক্রিকেট বিশ্বের সবচেয়ে বড় নির্বাচক প্যানেল গড়া হলো, তখন আমরা বলেছি-লিখেছি-প্রতিবাদ করেছি। শোনা হয়নি। আজ ফলটা দেখা যাচ্ছে তো? তখন বোর্ড প্রধান যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে তিনি নিজে দল নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করতে চান না বলেই এই ব্যবস্থা। অথচ মাহমুদউল্লাহ-মিরাজ-মুমিনুল… বারবার হস্তক্ষেপ তাকে করতেই হচ্ছে! দৃশ্যমান লাভ এখনো কিছু মেলেনি ৬ সদস্যের বাহিনী থেকে, ক্ষতি-বিতর্ক হরহামেশা মিলেছে।

মুমিনুল লড়াই করবেন। কাজ কঠিন হযে গেছে ভীষণ, তবু চেষ্টা করবেন। ৪ ফুট ৭ ইঞ্চি উচ্চতার কারণে বিকেএসপিতে চান্স পাননি প্রথমবার। সাইকেল কিনে চালিয়ে, নানা কসরত করে, ছোট্ট মুমিনুল পরের বছর বিকেএসপিতে চান্স পেয়েছেন ৫ ফুট উচ্চতা নিয়ে। লড়াই তার সিস্টেমে আছে…

কিন্তু দেশের ক্রিকেটের সিস্টেমটাই যে নষ্ট!

– ফেসবুক থেকে

https://www.mega888cuci.com