সেদিন আর্জেন্টিনা হারিয়েছিল ইংল্যান্ডকে; ক্রিকেটে!

ক্রিকেট আর আর্জেন্টিনা – এ যেন তেল আর পানি। ফুটবলে অনেক নাম ডাক শোনা গেলেও ক্রিকেট আর আর্জেন্টিনার মেলামেশা আছে খুব সামান্যই। অথচ, সেই আর্জেন্টিনা ক্রিকেট দলই ১৯৩৭ সালে অতিমানবীয় কীর্তিকেও হার মানানোর মত এক কাণ্ড ঘটায়। সেবার ১৭ জানুয়ারি তারা রীতিমত হারিয়ে দেয় ইংল্যান্ডকে।

ইংল্যান্ড সেদিন তিন দিনের ম্যাচে হেরেছিল ২৯ রানে। চলুন সেই ইতিহাসটা এবার বিস্তারিত জেনে আসা যাক। নি:সন্দেহে ম্যাচটাকে ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে ভুতুড়ে অঘটন হিসেবে ধরা হয়।

আনকোরা বুয়েন্স এয়ার্স ক্লাব ও এমসিসি

ক্রিকেটের সঙ্গে আর্জেন্টিনা দলের পরিচয় হয় সেই ১৮০৬-১৮০৭ মৌসুমের দিকে। সে সময় এখনকার মতো দল ভিত্তিক খেলা হত না। তখনকার সময় ক্রিকেট ছিল ক্লাব ভিত্তিক। তখন একটি দেশের সবথেকে ভালো ক্লাবের সাথে অন্য দেশের ক্লাবগুলোর খেলা হত। আর সে সময়ে আর্জেন্টিনার  সব থেকে ভালো ক্লাবটি ছিল বুয়েন্স এয়ার্স ক্রিকেট ক্লাব।

১৮৬৪ সালে ক্লাবটির জন্ম হয়। ধারণা করা হয় এই ক্লাবটিই আর্জেন্টিনার সবথেকে প্রাচীন ক্রিকেট ক্লাব। পরবর্তীতে ১৮৯৭-৯৮ সালের দিকে ক্লাবটি প্রিমিয়ার ডিভিশান খেলা শুরু করে। অন্যদিকে ইংলিশদের  মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের (এমসিসি) সাথে  পুরো ক্রিকেট বিশ্বই তখন পরিচিত ছিল।  কেননা সে সময় এই ক্লাবটিই ছিল বিশ্বসেরা।

এমসিসির দক্ষিণ আমেরিকা সফর

১৯৩৬-৩৭ সালে এমসিসি যখন দক্ষিণ আমেরিকায় সফরে আসে তখন কাকতালীয় ভাবে ১০ টি ম্যাচের মাঝে সাতটি ম্যাচই আর্জেন্টিনায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। আর সেই সাতটি ম্যাচের একটি ম্যাচ ছিল আর্জেন্টিনা এবং ইংল্যান্ডের মধ্যে। সফরের বাকি তিনটি ম্যাচ উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

তিনদিনের একটি টেস্ট ম্যাচ খেলতে সেবার বুয়েন্স এয়ার্স সিসি গ্রাউন্ডে সেবার ইংলিশদের মেলবোর্ন ক্রিকেট ক্লাবের বিপক্ষে মাঠে নেমেছিল আর্জেন্টিনার বুয়েন্স এয়ার্স ক্রিকেট ক্লাবটি। শক্তিমত্তার দিক থেকে ইংলিশরা অনেক বেশিই এগিয়েছিল আর্জেন্টাইনদের থেকে।

প্রথম দিন: জ্যাক হোয়াইটের দিন

প্রথম ইনিংসে সেবার ব্যাট করতে নেমেছিল আর্জেন্টাইনরা। ওপেনার হেনরি মার্শাল এবং জন নক্সের সূচনাটা শক্তিশালী ইংলিশদের বিরুদ্ধে বেশ ভালোই ছিল বলা যায়। তবে দলের রান  ৩১ পেরুতে না পেরুতেই ইংলিশ ফাস্ট বোলার জ্যাক হোয়াইটের পেসের কাছে পরাস্ত হন জন নক্স। প্রথম উইকেট হারানোর পর পুরো দলই যেন নিজেদের হারিয়ে ফেলেছিল জ্যাক হোয়াইটের পেস তাণ্ডবেই।

মাত্র ৬৫ রান দিয়ে সেদিন এই পেসার নিয়েছিলেন পাঁচটি উইকেট। আর  হোয়াইটের এই বোলিং তাণ্ডবে আর্জেন্টাইন ব্যাটসম্যানরাও মাত্র ৬৫ ওভার ২ বলে মাত্র ১৩৪ রানে নিজেদেরকে গুটিয়ে নিয়েছিল। তবে আর্জেন্টাইনদের হয়ে দলের জন্য সর্বোচ্চ ৩২ রানের ইনিংসটি খেলেছিল কেনিথ হেন্ডারসন।

আর্জেন্টাইনদের এত দ্রুত গুটিয়ে যাওয়ায় প্রথমদিনেই ব্যাট করতে নামে ইংলিশরা।  ব্যাটিং এ নামতেই  যেন উইকেটে ধস নামে ইংলিশদের। প্রথম দিনেই মাত্র ২৬ রানের মাথায় তিন তিনটি উইকেট হারিয়ে বসে এমসিসি যা এক প্রকার অকল্পনীয়ই  ছিল।

দ্বিতীয় দিন: এমসিসির বিপদ

প্রথম দিনে মাত্র ২৬ রানে তিন উইকেট হারানো ইংলিশরা দ্বিতীয় দিনে ব্যাট করতে নেমে যেন আরো বিপদে পরে যায়। আর্জেন্টাইন পেসার ডর্নিং এর দুর্দান্ত বোলিং এ যেন রীতিমতো  মরীচিকা দেখছিল ব্যাটসম্যানরা। মাত্র ৩৮ রান দিয়ে সেবার এক ইনিংসেই ৭ টি উইকেট নিয়েছিলেন এই আর্জেন্টাইন পেসার। ফলাফল স্বরুপ মাত্র  ৮৯ রানেই গুড়িয়ে যায় এমসিসি। আর এতে ৪৫ রানের লিড পায় আর্জেন্টিনার বুয়েন্স এয়ার্স ক্রিকেট ক্লাব। যা দর্শকদের জন্য সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিতই ছিল। এমসিসির পক্ষে সর্বোচ্চ ২৮ রান করেন ওয়ার্নার।

একই দিনেই  আর্জেন্টাইন ক্লাব বুয়েন্স এয়ার্স ব্যাট করতে নামলে এমসিসির বোলাররা বেশ শক্ত করেই চেপে ধরেন ব্যাটসম্যানদের। তাছাড়া ব্যাটসম্যানদের খাম খেয়ালিপনা শট দেখে মনে হচ্ছিল যেন  উইকেট বিলিয়ে দেবার প্রতিযোগীতাতেই নেমেছিলেন সবাই। তাই মাত্র ৬৩ রানেই অল আউট হতে হয় আর্জেন্টাইনদের। প্রথম ইনিংসে ৪৫ রানের লিড পাওয়ায় ইংলিশদের জন্য টার্গেট দাঁড়ায় ১০৯ রানের।  তবে বলতেই হবে ইংলিশদের ভাগ্য সেদিন খারাপ ছিল। কেননা দিনের শেষভাগে এসে ব্যাট করতে নেমে ২৪ রানের মাথায় হারিয়ে ফেলে ২ টি উইকেট। আর এর ফলে টেস্ট ম্যাচে এক দিনের মাথায় ১৯ উইকেটের পতন দেখেছিল ক্রিকেট বিশ্ব।

তৃতীয় দিন: আর্জেন্টাইনদের ইতিহাস

আগের দিন ২৪ রান করায় টেস্টের তৃতীয় অর্থাৎ শেষ দিনে ইংলিশদের প্রয়োজন ছিল মাত্র ৮৫ রান। হাতে তখনো আট উইকেট ছিল কিন্তু শেষদিনে অফ স্পিনের জাদুতে ইংলিশদের ভড়কে দেয় ডেনেট আইলিং।  মাত্র ৩২ রান দিয়ে ইংলিশদের ৬টি উইকেট নিয়েছিল এই অফ ব্রেকার।

ম্যাচ খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছিল।এক পর্যায় ৫১ রানে ৯ উইকেট হারিয়ে বসে এমসিসি। তবে গ্যারি উইগ্যাল এবং লর্ড ডাংলেসের শেষ উইকেট জুটিতে কিছুটা আশার আলো দেখেছিল ইংলিশরা। তবে ২৮ রান যোগ করতেই সেই আলোও নিভে গিয়েছিল ইংলিশদের জন্য। দ্বিতীয় ইনিংসে তাই মাত্র ৭৯ রানেই অল আউট হতে হয় ইংলিশদের  এবং ২৯ রানের লজ্জাজনক হার নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের।

সংক্ষিপ্ত স্কোর:

আর্জেন্টিনা প্রথম ইনিংস: ১৩৪ (কেনিথ হেন্ডারসন ৩২; জ্যাক হোয়াইট ৫/৬৫, টম জেমসন ৩/২৪)

ও দ্বিতীয় ইনিংস: ৬৩ (জ্যাক হোয়াইট ৪/২১, গাবি অ্যালেন ৩/৩২)

এমসিসি প্রথম ইনিংস: ৮৯ ( হারবার্ট ডোর্নিং ৭/৩৮)

ও দ্বিতীয় ইনিংস ৭৯ (ডেনেট আইলিং ৬/৩২, হারবার্ট ডোর্নিং ৩/২৯)

ফলাফল: আর্জেন্টিনা ২৯ রানে জয়ী।

ক্রিকেট কান্ট্রি অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com