সেদিন অপমানিত হয়েছিলেন সুচিত্রা

সুচিত্রা সেন অহংকারী ছিলেন। সবার সঙ্গে বর্বর ব্যবহার করতেন। নিজের শর্তে চলতেন। এমনটাই শোনা যায়। লোকে বলেন, এজন্য সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গেও কাজ করা হয়নি তার।

কিন্তু কেউ কি এর গভীরে ঢুকে কারণ অনুসন্ধান করেছি কেন এই কঠিন খোলসে নিজেকে আবৃত রাখতেন মিসেস সেন?

আজ বলব এমন এক কাহিনী যাতে রীতিমতো সুচিত্রা কে অপমান করেছিলেন এক একদল অভিনেতা পরিচালক।

নবদ্বীপ হালদার। কদিন আগেই ১৬ ডিসেম্বর পেরিয়ে এলাম নবদ্বীপ হালদারের জন্মদিন। নিঃসন্দেহে ভালো অভিনেতা ওনার ট্রেডমার্ক কন্ঠ আজও বাংলাছবিতে চিরভাস্বর। কৌতুক শিল্পী হিসেবেই জনপ্রিয় নবদ্বীপ হালদার।

কিন্তু উনি নিজেকে বিশাল কিছু মনে করতেন এবং অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন নবদ্বীপ হালদার। না বললে অনেকেরই অজানা রয়ে যাবে সেদিনের ঘটনা।

১৯৫০-৫১ সালের কথা। সুচিত্রা সেনকে যে কি সংগ্রাম করতে হয়েছে তার একটি নমুনা এই ঘটনা। তখন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে।

একজন শিল্পপতির পুত্রবধূ তবু স্বামীর ব্যবসা ডাউন হওয়ায় আর চেহারায় অপরুপ লাবন্য থাকায় (সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ সেন চাইতেন সুন্দরী বউ সিনেমায় নেমে তাঁর মুখোজ্জ্বল করুক যদিও পরে বউ নাম করলে তাঁর পুরষত্বে লাগে আর অশান্তি) ছবির জগতে এসেছেন সুচিত্রা।কিন্তু তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত নায়িকা নন।

এক গ্রীষ্মের দুপুরের দাবদাহে ঘমার্ক্ত অবস্থায় সুচিত্রা কাজের দরকারে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে যান কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়ি গিয়ে শোনেন প্রেমেন্দ্র বাবু নবদ্বীপ হালদারের বাড়ি গেছেন। ওখানেই তাকে পাওয়া যাবে। কাজের তাগিদে এক গৃহবধূ সেদিন স্বামী সংসার বাঁচাতে ছুটে যান ফের নবদ্বীপ হালদারের বাড়ি ঐ গ্রীষ্মের দুপুরে।

সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯৫৩ সালে ‘ময়লা কাগজ’ ছবিটি পরিচালনার পরিকল্পনা করেছিলেন। ঐ সময় প্রেমেন মিত্তির ও ধীরাজ ভট্টাচার্য-র সঙ্গে নবদ্বীপ হালদারের খুবই হৃদ্যতা ছিল। নবদ্বীপ হালদার-র বাড়িতে এক আড্ডায় সুশীল চক্রবর্তীও ছিলেন। এক সময় কাজের লোক এসে খবর দিল এক ভদ্রমহিলা প্রেমেন বাবুকে খুঁজছেন।

কথাটা শুনে নবদ্বীপ বলে উঠলেন- প্রেমেন তুমি কি দুনিয়ার মেয়েকে আমার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে এসেছো যে, এখানেও তোমাকে খুঁজতে আসছে? এই সুশীল দেখ তো কে এসেছে। তেমন বুঝলে হটিয়ে দিবি।

সুশীল বাবু এসে দেখলেন সুচিত্রা সেনকে। কয়েকটি ছবির সুবাদে সুচিত্রা সেনের মুখটি তখন মোটামুটি পরিচিত।কিন্তু শুরুর দিক তখন সুচিত্রার। সুশীল বাবুকে দেখে সুচিত্রা সেন বললেন- ‘এখানে প্রেমেনবাবু আছেন?’ সুশীল বাবু বললেন- হ্যাঁ আছেন। কিন্তু তিনি তো এখন ব্যস্ত।

সুচিত্রা সেন বললেন- ‘আমি ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে শুনলাম উনি এখানে এসেছেন। ওনার সঙ্গে আমার একটু দেখা করা দরকার।’

কথাটা শুনে সুশীল চক্রবর্তী বললেন- ‘আপনি একটু বসুন। আমি ভেতরে গিয়ে খবর দিচ্ছি।’ সুশীল বাবু ভেতরে এসে খবরটা দিতেই নবদ্বীপ হালদার বলে উঠলেন- নিশ্চয়ই পার্ট চাইতে এসেছে। তুই গিয়ে বলে দেগা, আমাদের সব পার্ট দেয়া হয়ে গেছে। আপনি যেতে পারেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র বললেন- ‘না না অত কড়া কথা বলার দরকার নেই। তুমি বরং গিয়ে বলগে উনি যেন পরে আমার বাড়িতে দেখা করেন। আজ আমি ব্যস্ত। এখন দেখা করা যাবে না।’

ব্যস্ত মানে নিছক আড্ডা দিচ্ছেন।

সুশীল বাবু বাইরের ঘরে গিয়ে সংবাদটি দিলেন। শুনে সুচিত্রা সেনের মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেল। ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে কপালের ঘাম মুছে নিলেন। তারপর ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে গেলেন নবদ্বীপ হালদারের বাড়ি থেকে।’

‘কি ক্ষমাহীন ধৃষ্টতা। হয়ত এটাই সমাজের নিয়ম। মানুষকে একটা জায়গায় পৌঁছানোর আগে সীমাহীন অপমান সইতে হয়। সুচিত্রা সেনের মতো শত বছরের অতুলনীয় অভিনয় শিল্পীকেও অভিনয় জগতে প্রবেশের জন্য এমনি অপমান সইতে হয়েছে। তাও কার কাছে, নবদ্বীপ হালদার র কাছে।

এই নবদ্বীপ হালদারই পরে এমন ছবিতে অভিনয় করেছেন যাতে উনি ছোটো রোলে কোথাও পরিচারকের চরিত্রে সেই ছবিতেই নায়িকা সুচিত্রা সেন।কাজের মাধ্যমে জবাবটা দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ই তো নবদ্বীপ হালদার পরিচারক মেস বাড়ির সুচিত্রা নায়িকা।

যদিও সেখানে সুচিত্রার অভিনয় উন্নত নয় উত্তম সুচিত্রা নয় তুলসী মলিনাই ওখানে সেরা। তবু উত্তম সুচিত্রা জুটির সুপার ডুপার হিট ছবি তো ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। রামপ্রীতি উত্তম ও রমলা সুচিত্রা প্রেমে পড়ে যায় এবং মদন চাকর – নবদ্বীপ হালদার মারফত চিঠি চালাচালি শুরু করে তারা। অসম্ভব মজার ছবি।

যে সীমাহীন অপমান সয়েছিলেন সুচিত্রা সেগুলোর থেকে উত্তীর্ণ হতে নিজেকে কঠিন মোড়কে মোড়েন। নবদ্বীপ হালদার এতটাই অহংকারী বিলাসী ছিলেন যে স্টুডিও থেকে বাড়ি ফেরার পথে রোজ রাস্তা দিয়ে যে পথে বাড়ি যেতেন সেখানে উপার্জিত পয়সা খুচরো করে রাস্তায় ছুড়তে ছুড়তে যেতেন অনেক অভাবী মানুষ এসে সেই পয়সা যদি কুড়োতো নবদ্বীপ হালদার খুব মজা পেতেন।

সাড়ে চুয়াত্তর ছবির দৃশ্য

এতটাই লোকদেখানো হিংস্র আচরন ছিল তাঁর। নিজের এসব বদ খেয়ালের জন্য শেষজীবনে অর্থকষ্টে ভোগেন।

যেকোনো শিল্পী যেকোনো মানুষ যত উপরেই উঠুন তার তো মাটিতে পা রেখে সবসময় চলা উচিৎ। নিউকামারদের অপমান তাচ্ছিল্য করতেন কিংবা এই পথে পয়সা বিলোনো যেটা সাহায্য নয় ভালোবেসে লোকদেখানো হিংস্রতা।

বহু আগে আমার জন্মের বহু আগে শনিবার দুপুরে রেডিয়োতে কুড়ি মিনিটের একটি অনুষ্ঠান ছিল কৌতুক নক্সা ও কৌতুক গান। এই অনুষ্ঠানের অতি পরিচিত ও জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন নবদ্বীপ হালদার। হাজরা রোড-হরিশ মুখার্জী রোডের মোড়ে সেখানে দমকলের একটি ডিপোর ঠিক বিপরীতে একটি বাড়িতে নবদ্বীপ হালদার থাকতেন। বাড়ীতে কমেডি শিক্ষার একটি স্কুলও তিনি পরিচালনা করতেন। তাঁর বেশ কয়েকটি কৌতুক নক্সা রেকর্ডে প্রকাশিত। সেগুলি এখন দুস্প্রাপ্য।

https://www.mega888cuci.com