সুপার হিরো পাওয়ার নয়, স্রেফ দুর্লভ রোগ

টেলিভিশনের পর্দায় সুপার হিরোদের অদ্ভুত ক্ষমতা দেখলে আমাদের সবারই মনে হয়, ‘ইশ, সত্যিই যদি আমার এমন ক্ষমতা থাকতো! ’ কেউ হয়তো টেলিপ্যাথির জোরে কথোপকথন চালিয়ে যেতে পারে অবলীলায়, যা সাধারণ মানুষ বুঝতেই পারেনা। কারও আবার গুলি, বোমার আঘাতেও কিছুই হয়না, কেউ আবার নিজের শরীরকে বরফ বা অগ্নিপিণ্ডে রূপান্তরিত করতে পারে যখন তখন, এরকম আরো কত কী!

বাস্তবে সেরকম হওয়া সম্ভব না, সেটা আমরা সবাই জানি। তবে মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষের এমন কিছু রোগের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা, যা অনেকটা মার্ভেল কমিক্সের এক্স মেন এর সাথে মিলে যায়! এমনই কিছু অস্বাভাবিক রোগের ইতিবৃত্ত নিয়েই আমাদের এই আয়োজন।

অসাধারণ স্মৃতিশক্তি (হাইপারথিমেসিয়া)

ধরুন আপনার সাথে এমন কারো দেখা হলো, যে কিনা তার জীবনে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা গড়গড় করে বলে দিতে পারে! অবিশ্বাস্য হলেও বাস্তবে কিন্তু এমনটা হতেই পারে। বিজ্ঞানীদের গবেষণায় ‘হাইপারথিমেসিয়া’ নামক এমনই এক বিরল রোগের অস্তিত্ব প্রমাণিত হয়েছে। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা তাদের জীবনের ছোট বড় প্রায় সব অভিজ্ঞতা বা ঘটনা বিশদে মনে রাখতে পারেন, এমনকি শৈশবে ঘটে যাওয়া তুচ্ছ ঘটনাও তাদের মস্তিষ্কে থেকে যায়।

শুধু তাই নয়, বহুবছর আগে পড়া কোন বই থেকে অংশবিশেষ বা সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবরও হুবহু মুখস্থ বলে দিতে পারেন তারা, এবং নির্ভুলভাবে বলতে পারেন, সেই খবরটি কোন বছরের কত তারিখ প্রকাশিত হয়েছিল! বর্তমানে সারা পৃথিবীতে মাত্র ৬০ জন মানুষ এই বিরল রোগে আক্রান্ত।

হাইপারথিমেসিয়ার সবচেয়ে আশ্চর্যজনক উদাহরণ অস্ট্রেলীয় লেখিকা রেবেকা শ্যারক। বিবিসির এক রিপোর্ট এ তার অসাধারণ স্মৃতিশক্তির কথা প্রথম প্রকাশ পায়। তার বয়স যখন মাত্র ৭ দিন, তখন তাকে যে গোলাপি রঙের একটা চাদরে জড়িয়ে নেওয়া হয়েছিল, এটাও তার মনে আছে! তবে তিনি বলেছিলেন, রোগটা মোটেও সুখকর নয়, প্রায়শই নাকি তার ইনসমনিয়া, মাথাব্যথা, ক্লান্তিজনিত শারীরিক অসুস্থতা দেখা দিত।

ব্যাথার বোধহীনতা (কনজেনিটাল অ্যানালজিসা)

‘কনজেনিটাল অ্যানালজিসা’ বা ‘সহজাত ব্যথা বা বেদনাবোধ হীনতা’ এমন এক রোগ, যার ফলে মানুষ শরীরে কোন প্রকার আঘাত পেলেও ব্যথা অনুভব করেনা। অনেকেই ব্যাপারটাকে বেশ মজার ভাবতে পারেন, কিন্তু বাস্তবে তা মোটেও মজার নয়। আক্রান্ত ব্যক্তি শরীরে কোথাও আঘাত পেলেও ব্যথা বোধ না হওয়ায় তাতে গুরুত্ব দেবার প্রয়োজন মনে করেনা। এ রোগে আক্রান্ত শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। কারণ, খেলাধুলার সময় পড়ে গিয়ে হাত পা কেটে গেলে বা হাড় ভেঙে গেলেও বুঝতে পারেনা। ফলে অনেকসময় এসব আঘাত থেকে মারাত্মক কোন ক্ষতি হয়ে যেতে পারে, প্রাণসংশয়ও অস্বাভাবিক নয়।

স্যাভান্ট সিনড্রোম

বিরল প্রজাতির এই রোগ মূলত নিউরোডেভেলপমেন্ট ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। এসপার্জাস সিনড্রোম বা অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো স্যাভান্ট সিনড্রোম। স্যাভান্ট শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হলো ‘মহাপণ্ডিত’। নামটা যে আক্ষরিক অর্থেই সত্য,তা এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের অসাধারণ সব কার্যকলাপ দেখলেই বোঝা যায়।

যেমন,আপনি তিন অঙ্কের একাধিক সংখ্যার গুণফল হিসাব করতে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করবেন,এটাই স্বাভাবিক, কিন্তু এই অসম্ভব কাজটিই করতে পারে একজন স্যাভান্ট সিনড্রোম এর রোগী। যদি আপনি তাকে জিজ্ঞেস করেন, ৩০১৭ সালের ১১ নভেম্বর সপ্তাহের কোন দিনটিতে পড়বে, তাও সে হিসাব করে বলে দিতে পারবে।

তাছাড়াও স্মৃতিশক্তি ও ভিজুয়ালাইজেশনের দিক থেকেও এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এগিয়ে আছে, যা হতবাক করেছে বিজ্ঞানীদেরও। উদাহরণ হিসেবে স্টিফেন উইল্টশায়ারের কথা বলা যায়। তিনি লন্ডন শহরের ওপর দিয়ে মাত্র একবার বিমানে ভ্রমণ করেই পুরো লন্ডন শহরের নির্ভুল ম্যাপ তৈরি করে ফেলেছিলেন। অবাক হবার মতোই ব্যাপার!

শুধু অল্প বিদ্যাই নয়, মাঝে মধ্যে অতি-বিদ্যাও ভয়ংকর!

আইসম্যান

আইসক্রিম খেলে অনেকেরই দাঁত শিরশির করে, কেউ তো আবার ঠাণ্ডা খাবার খেতেই পারেননা, কিংবা খেলেও সর্দি জ্বর হয়ে একবারে নাজেহাল অবস্থা। অথচ উইম হফের কাছে ঠাণ্ডা বা শীত জিনিসটা যেন কিছুই নয়!  হল্যান্ডের এই ব্যক্তি প্রচণ্ড ঠাণ্ডার মধ্যেও খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিরল ক্ষমতা দেখিয়ে অবাক করে দিয়েছেন বিজ্ঞানীদের।

প্রায় দু ঘন্টা বরফজমা বাক্সতে ঢুকে বসে থাকা, খালিগায়ে বরফে আচ্ছাদিত পাহাড়ে চড়া, এমনকি বরফ জনে থাকা জলাশয়ের ভয়ানক ঠাণ্ডা পানিতেও সাঁতার কাটার মতন অবিশ্বাস্য কাজ করতে পারেন এই উইম হফ। বিশেষজ্ঞরা এটাকে ডিস অর্ডার বললেও হফের দাবি, ট্রেনিং এর মাধ্যমেই এই ক্ষমতা অর্জন করেছেন তিনি।

ভয়ডরহীনতা

সবচেয়ে সাহসী মানুষটিও অনেকসময় নানারকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে ভয়ের কাছে হার স্বীকার করতে বাধ্য হন। কিন্তু আর্বাক-উইদি নামক জেনেটিক ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে বোধহয় সেটা বলা ভুল হবে। কারণ এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের যে ভয়ডর বলতে কিছুই নেই! দক্ষিণ আফ্রিকাতে এই রোগে আক্রান্তদের সংখ্যা বেশি।

বিজ্ঞানীরা আর্বাক-উইদি আক্রান্ত রোগীদের নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই গবেষণা করে আসছেন। বিষাক্ত মাকড়সা, সাপের ভয় দেখানো, ভূতের ছবি দেখানো, এমনকি ভুতুড়ে বাড়িতে আটকে রাখার মতন এক্সপেরিমেন্টও করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও রোগীদের চেহারায় ভয়ের কোন চিহ্নই ছিলনা। দুঃসাহসী বললেও বোধহয় কম বলা হবে!

– ব্রাইট সাইড অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com