সুচিত্রা ভট্টাচার্য ও তাঁর তিন সৃষ্টি

সূচিত্রা ভট্টাচার্য – অসম্ভব রকমের নারীবাদী লেখক। তবে এরপরেও তার লেখা আমাকে আকৃষ্ট করেছে। জন্মদিন উপলক্ষে তার লেখা অনেক বই থেকে বাছাইকৃত তিনটি উপন্যাসের ব্যাপারে বলছি।

নীল ঘূর্ণী

জন্মদিনে উপহার পেতে কার ভালো না লাগে। খুব সম্ভবত ২০০৩ সালের কোন এক জন্মদিনে এক বন্ধুর কাছে থেকে উপহার পেলাম ‘নীল ঘূর্ণী’ বইটা। এর আগে সুচিত্রা ভট্টাচার্যের কোন বই পড়া হয় নি। বইটা মন্ত্রমুগ্ধের মতো পড়ে উনার ভক্ত হয়ে গেলাম। ২০০৬ সাল পর্যন্ত তাঁর বের হওয়া প্রায় প্রতিটা বই’ই পড়া হয়ে গেছে। পরবর্তীতে পড়া অনেক বই এই বই এর চেয়ে ভালোও লেগেছে। কিন্তু প্রথম প্রেমের প্রতি তো একটু আলাদা সহানুভুতি থাকে।

অসম বয়সের প্রেম আমাদের এই সমাজ কোনদিনও মানতে চায় না। তবে তাই বলে ভালোবাসা তো আর কোন বাধা মানে না। তাই তো ইউনিভার্সিটিতে পড়ুয়া দয়িতা পরিবার আর সমাজের সবাইকে উপেক্ষা করে পৌঢ় শিক্ষক বোধিসত্বের বাড়িতে উঠে পড়ে। বোধিসত্বও স্ত্রী রাখী আর ২১ বছর বয়সের পুত্র ত্যাগ করে নতুন ভাবে সংসার শুরু করেন। প্রতিভাবান লোকেরা সাধারণত একটু খেয়ালী হয়। কিন্তু সহজ সরল রাখী এটা কিভাবে মেনে নিবে? এত দিনের সাজানো সংসার ভেঙ্গে গেলে পরিবারকেই বা কিভাবে মুখ দেখাবে? অন্যদিকে পারিবারিক ভাবে বিয়ে ঠিক হওয়া সৌমিকও উপেক্ষিত হওয়ার পরেও কেন দয়িতাকে এত সাপোর্ট দেয়?

‘নীল ঘূর্ণী’ একটা জটিল প্রেমের উপন্যাস। প্রেমের মাঝেও খুব সূক্ষ ভাবে দেখানো হয়েছে মধ্যবিত্ত সমাজের মূল্যবোধ। তাই বইটা পড়লে কোন চরিত্রের সাথে নিজের কোন মিল পেলে একটুও অবাক হবেন না।

অন্যবসন্ত

অসম্ভব রোমান্টিক একটা বই। কাহিনীটা খুবই সাধারণ, কোন নতুনত্ব নেই। কিন্তু সাধারণের মাঝেই হয়তো নিজেকে খুজে পাবেন। ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’- কথাটি না বলেও যে প্রেমের উপন্যাস লেখা যায়, সুচিত্রা ভট্টাচার্য তা খুব সুন্দরভাবে দেখিয়েছেন। বইটা পড়ার পর আমার কাছে একটা কথাই মনে হয়েছে, মেয়েরা প্রেমিক হিসেবে অভিমন্যু কে পছন্দ করবে কিন্তু স্বামী হিসেবে শৌনক কে আশা করবে।

উচ্চাকাঙ্খী, ক্যারিয়ার সচেতন সুপুরুষ শৌনক আর তনিষ্ঠা অনেকদিনের বন্ধু, পারিবারিকভাবে তাদের বিয়েও ঠিক হয়ে আছে। ঠিক এরই মধ্যে পরিচয় অভিমন্যুর সাথে। এই প্রজন্মের ছেলে হয়েও অভিমন্যু ঠিক আর পাচজনের মতো নয়। অভিমন্যু স্বপ্নবিলাসী কিন্তু উচ্চাকাঙ্খী নয়, আটটা পাচটা অফিস করতে ভালো লাগে না বিধায় নিজেই পারফিউমের ব্যবসা করে। তীব্র খরার পর জঙ্গলে প্রথম বৃষ্টি নামলে বুনো লতায় যে গন্ধ উঠে, সেই সুঘ্রান সৃষ্টি করার স্বপ্ন নিয়ে বেচে আছে সে।

কয়েকদিনের পরিচয়েই তনিষ্ঠা বুঝতে পারল সে আসলে শৌনক কে নয়, অভিমন্যু কে ভালোবাসে। কিন্তু মানসিক ভারসাম্যহীন বড় ভাই আর মায়ের দায়িত্ব নিয়ে চলা অভিমন্যু তো তনিষ্ঠাকে একটি বারের জন্যও বিয়ে ভাঙ্গার কথা বলছে না। অন্যদিকে মাত্র ৫৩ বছর বয়সেই তনিষ্ঠার বাবা শুভেন্দুকে চাকরি থেকে সেচ্ছা অবসর নিতে বাধ্য করলো কোম্পানি। তনিষ্ঠার জীবনে দোলাচল শুরু হলো। প্রতিবেশীর চাপে পারফিউমের ব্যবসা বন্ধ করার চিন্তায় চিন্তিত অভিমন্যুর কাছে কি ভেঙ্গে পড়বে না কি শৌনক কে বিয়ে করে নিশ্চিত জীবন যাপন করবে?

উপন্যাস অবলম্বনে একটা সিনেমা নির্মিত হয়েছে, সেটাও অসাধারণ লেগেছে।

কাছের মানুষ

সম্ভবত সুচিত্রা ভট্টাচার্যের সবচেয়ে বড় উপন্যাস এবং সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস। কলেজে পড়ার সময় ফুটপাত থেকে অরিজিনাল ভারতীয় প্রিন্টের বইটা পেয়েছিলাম খুব কম মূল্যেই। পড়তে এতটুকুও সময় নেই নি। এটাই একমাত্র উপন্যাস যেটাতে কিনা আমি মাসে অন্তত একবার চোখ বুলাই। বাংলাদেশে এই উপন্যাস অবলম্বনে একটা টিভি সিরিয়াল নির্মিত হয়েছিল।

একান্নবর্তী পরিবারে চুড়ান্ত রকমের অসফল, মদ্যপ স্বামী আদিত্যর সংসারটাকে আটকে ধরে রেখেছে তার স্ত্রী ইন্দ্রানী। মূলত গল্পের প্রধান চরিত্র এই ইন্দ্রানীই। স্পষ্টভাষী, বুদ্ধিমতী, সাহসী – স্কুলে পড়ান আবার পারিবারিক ছাপাখানার ব্যবসাটাও তিনিই সামলে রাখেন। ছেলে বাপ্পা, মেয়ে তিতির। আরো আছে আদিত্যর বৃদ্ধ বাবা, দুই ভাই, ছোট ভাই কন্দর্প যিনি কিনা সিনেমায় প্রতিষ্ঠিত হবার জন্য চেষ্টা করে চলেছেন। এদের মাঝেই আছে ইন্দ্রানীর পুরোণ ডাক্তার বন্ধু শুভাশীষ, তার স্ত্রী ছন্দা আর ছেলে টোটো।

কিন্তু এত কিছু থাকার পরেও ইন্দ্রানী যেন সম্পূর্ণ একা। মেয়ে তিতির হয়েছে বাবা অন্তপ্রাণ। স্বামীর সাথেও সে ঠিক সহজ নয়। নিজের কথা বলার মতো কেউ নেই।

বই এর শেষ পর্যায়ে একটা কঠিন সত্য আবিষ্কৃত হবার পর ইন্দ্রানী বুঝতে পারে যে এই দুনিয়ায় সে আসলে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ।
নিজের মেয়ে তিতিরের কাছেও সে নিজের অব্যক্ত যন্ত্রণার কথা বলতে পারে না।

কাছের মানুষেরাও যে আসলে কত দূরে সেটা উপলব্ধি করার পর পৃথিবীটা আসলে খুব অর্থহীন মনে হয়।

https://www.mega888cuci.com