সাধু মার্টিনের মায়াবী দ্বীপে

ভার্সিটি থেকে ট্যুর। স্বপ্নের রাজ্য সেন্ট মার্টিন। কিন্তু, যাবো কি যাবোনা নাকি যাওয়াই হবেনা এমন অনেক চিন্তা শেষে যাওয়ার সিদ্ধান্তই টিকলো। ঢাকার সুর্য যখন ডুব দিয়ে প্রকৃতিতে আঁধার নেমেছে তখন আমরা ঢাকা ছেড়ে যাচ্ছি।

যান্ত্রিক শহর ছেড়ে বাস যখন কুমিল্লা হাইওয়েতে তখন পথ হয়ে গেছিলো স্বপ্নরাজ্য। কুয়াশার ধোঁয়াটে মেঘের মাঝে যেন বাসটা বারবার হারাতে যাচ্ছিলো! অন্যরা ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়লেও আমার চোখে মুখে রাজ্যের উত্তেজনা। কুয়াশা, রাত, আলো আর আমার স্বপ্ন পূরণের মিলবন্ধনে জীবনটা যেন খুব বেশি উপভোগ্য হয়ে দাঁড়িয়েছিলো।

শীতে কাঁপতে কাঁপতে কফি মগে চুমুক, শেষরাতের দিকে কর্ণফুলীর কালো জলে নানা রঙের আলোর খেলা দেখে আর চট্টগ্রামের পাহাড়ের সারির উষ্ণ অভ্যর্থনায় সকাল বেলা পৌঁছে গেলাম টেকনাফ।

নিশীতা মিতু

এবার আশা যাক শিপের কথায়। ১৯৯৮ সালের পর এই প্রথম শিপে উঠলাম। সিটগুলো খামাখাই নেয়া হয়েছে কারন আমরা সবাই ডেকেই ছিলাম পুরো পথ। হঠাৎ করে গাংচিলের দল আসা শুরু করলো। খাবার ক্যাচ ধরাতে তারা এক একজন পুরাই সাব্বির!

অসাধারণ সব দৃশ্য দেখে, নাফ নদী আর পাহাড়ের ভালোবাসা দেখে মুগ্ধ আমরা সবাই। আমাদের দেখে মুগ্ধ সুর্য। তাই পরম ভালোবাসায় আমাদের পুড়িয়ে দিচ্ছিলো।

চারপাশে অথৈ পানি শেষ বহু দূরে একটু সবুজ দেখা দিলো। যেন কোন শিল্পী পুরো ক্যানভাসে নীল দিয়ে মাঝে একটা সবুজ রঙের আঁচড় কেটেছেন! শিপের এক লোক বলল ওটাই সেন্ট মার্টিন।

হার্ট বিট কেমন যেন বেড়ে গেছে। আসলেই! সত্যিই চলে এসেছি স্বপ্নের ভুমির কাছাকাছি! সত্যিই আল্লাহ্‌ পূরণ করছেন এই স্বপ্ন! শিপ থেকে নামার সময় বারবার মনে মনে বরিশাইল্ল্যাদের জন্য আফসোস করছিলাম। বেচারারা কত কষ্ট করে! 

পা দিলাম উষ্ণ বালিকা ভুমিতে। আমার স্বপ্নের ভুমি, স্বপ্নের রাজ্য। কেয়া গাছ গুলো নুয়ে যেন অভ্যর্থনা জানাচ্ছে আর বলছে, দূর দ্বীপ বাসিনী, চিনি তোমারে চিনি।

রিসোর্টের অন্ধকার ঘরে ঢুকে কোন রকমে সবাই ফ্রেশ হলাম। এবার সমুদ্রে যাবো। সবাই মিলে সেন্ট মার্টিনের একাবাকা গলি দিয়ে হাটা শুরু করলাম। ২/৩ টা পথের বাঁক শেষে চোখের সামনে ধরা দিলো এক বিশাআআআআআল সমুদ্র আর বিশাল আকাশ। হাত পা যেন কাঁপা শুরু হল!

দৌড়ে গেলাম সমুদ্রে। এরপর ঘন্টাখানেক নিজের মাঝে আর নিজে ছিলাম না। পাগলামি, ধাপাধাপি, পানি ছোড়া, লাফানো, চিল্লানো… ওহ জীবন! সমুদ্রের পানি লোনা জানতাম এত্ত লোনা তা জানা ছিলো না।

বেশ অনেকক্ষণ স্বপ্নের ভুমির স্বপ্নজলে ভেসে, ঢেউয়ের সাথে এক্কাদোক্কা খেলে শান্ত হলাম। এর রাশ বালিকা নিজের দেহে নিয়ে রিসোর্টে ফিরলাম। ৬ জনের জন্য বরাদ্ধ একটা ওয়াশরুম। লাইন ধরে কোন রকমে গোসলটা সেরে নিলাম।

দুপুরের খাবার খেতে গেলাম পাশের রিসোর্ট ব্লু মেরিনে। প্রথম দিনের আলুর ভর্তাটার স্বাদ আমি কখনই ভুলবোনা। আর ছাদ থেকে সমুদ্র দেখতে দেখতে খাবার খাওয়ার অনুভূতিটাই অন্য রকম ছিলো!

রিসোর্টে ফিরে ক্লান্ত দেহ একটু এলিয়ে দিতে চেয়েছি। বড়জোর আধঘন্টা ঘুমালাম। ৫টায় উঠে ঘুম চোখে রুম থেকে বের হয়ে দেখি হাসনাত স্যার। বলল, ‘চলো সূর্যাস্ত দেখবো। জলদি রেডি হও।’ আমি যেন এমন কিছু শোনার অপেক্ষাতেই ছিলাম।

সূর্যাস্ত দেখতে গেলেও আমরা যাওয়ার আগেই সূর্য মামা টাটা বলে চলে গেছেন। তবুও গোধূলি বেলা দেখার সুযোগ পেলাম। কি অপুর্ব দৃশ্য! প্রকৃতি যেন এক একটা রং দিয়ে নিজেকে সাজিয়ে নিচ্ছে অবিরত!

বেলাভূমি ধরে অনেকটা সময় হাটলাম। প্রকৃতির স্বাদ একটু একটু করে নিজের অভ্যন্তরে নিচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে আঁধার ঘনিয়ে আসলো দারুচিনি দ্বীপে।

স্যারদের সাথে ডাবিয় আড্ডা শেষে হাটলাম কিছুক্ষণ। এরপর কিভাবে জানি চলে গেলাম জেটিতে। জেটির ব্রিজের উপর দেখা মিললো কিছু ছোট ভাইদের। তাদের বেশ অনেকক্ষণ প্রেম ভালোবাসা বিষয়ক জ্ঞান বিতরণ করে, চরম আড্ডা দিয়ে রাতের খাবার খেতে গেলাম।

রিফাত জানালো পুর্ব দিকের বিচে ক্যাম্প ফায়ার করা হবে! অয়ে ডিশটিং ডিশটিং মুডে চলে গেলাম সেখানে। বালুর উপরই বসে গেলাম সবাই। অন্যকে মিমিক্রি করে দেখানোর চমৎকার এক খেলা হল সবাই মিলে। কিভাবে জানি সেই খেলায় ১ম ও হয়ে গেলাম!

এরপর আসলো ফানুশ উড়ানোর কাজ! বাতাসের সাথে পাল্লা দিয়ে কোনভাবেই ফানুশ আর ওড়ানো যাচ্ছিলো না। একটাতে যা আগুন ধরানো গেলো তাও পুড়ে গেলো!

পরের ফানুশ উড়লো তো ঠিকই কিন্তু পাশে যে খানিকটা ছেঁড়া। আরিফ স্যার যেন বাংলা সিনেমার হিরো হয়ে গেলেন! আগুনের তোয়াক্কা না করেই ছেঁড়া অংশে হাত দিয়ে ফানুশ উড়ালেনই উড়ালেন!

আকাশে এত্ত এত্ত তারা একসাথে আমি আগে কখনো দেখিনি। যেন শিল্পীর আঁকা কোন ক্যানভাস!  ক্লান্ত দেহে রিসোর্টে ফিরে ঘুমিয়ে গেলাম শান্ত হয়ে। 

দ্বিতীয় দিন

আগের রাতে ক্লান্ত দেহে ঘুমানোর পর ঘুম ভাঙলো বোধহয় সকাল ৮টার দিকে। ২য় দিনটা আমাদের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। কারন এই একটা দিনই দ্বীপটা পুরোপুরি আমাদের। অমিত স্যার আগের রাতের ক্যাম্প ফায়ারের সময়ই পুরো দিনের প্ল্যান বলে দিয়েছিলেন।

ব্লু মেরিন রিসোর্টে খিচুড়ি দিয়ে সকালের নাস্তা শেষে সবাই চলে গেলাম বীচে। নানাধরনের ইভেন্টের আয়োজন করা হয়েছিলো। ব্যাগে গিফট নেওয়ার জায়গা নেই বলে আমি সেসব থেকে দূরেই ছিলাম। খেলা চলতে চলতেই তাই ঢং ভং করে অনেকগুলো ছবি তোলা হল।

সমুদ্রের নোলা জল কেন জানি আমাকে স্যুট করছিলোনা। তাই আর গোসল করতে নামিনি। পুরো ডিপার্টমেন্টের সবার জুতা, ব্যাগ, মোবাইল, মানিব্যাগ, চশমা, হ্যাট, ঘড়ি সবকিছু দেখভাল করার দায়িত্ব ছিলো আমার।

স্নান পর্ব শেষ করতে বেশ অনেকটা সময়ই চলে গেছে। রিসোর্টে ফিরে ফ্রেশ হয়ে দুপুরের খাবার যখন খেতে গেছি সময় তখন ৪ এর ঘরে। অমিত স্যার বললেন, সূর্যাস্ত দেখতে চাইলে জলদি খাওয়া শেষ করেন। উফফ, কিভাবে যে খাওয়া শেষ করেছি ২/৩ মিনিটে তা কেবল আমিই জানি!

স্যারেরা হাটা শুরু করলেন পশ্চিমের বিচের উদ্দেশ্যে। আসিফের ক্যামেরার অপেক্ষা করায় আমাদের খানিকটা দেরী হল। পশ্চিমের বীচ ধরে হাটছি আর সূর্য মামা আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। ডুবে গেলাম কিন্তু!

সব ছেলের মাঝে আমি একাই মেয়ে। তাদের সাথে পাল্লা দিয়ে পা চালানোটা খুব কঠিন ছিলো। তার উপর পরনে গাউন। শেষ বেলায় না পেরে গাউন পরেই ভো দৌড়!

প্রবালের উপর বসে গেলাম সবাই। প্রকৃতির প্রোজেক্টরে চলছে অসাধারণ এক দৃশ্য। জলে নয়, মেঘেদের রাজ্যে সূর্য রাজা হারিয়ে গেলেন ৩/৪ মিনিট সময় নিয়ে। সোনালী, কমলা আর লালচে আবীর ছড়িয়ে দিলো প্রকৃতিতে। 

আসিফকে দিয়ে ছবি তোলানোর পর পশ্চিমের বীচে হাটলাম সবার শেষে। হুমায়ূন আহমেদের সমুদ্র বিলাসএর সামনে গিয়েও ছবি তোলা হল। এবার আবার রিসোর্টের দিকে ফেরার পালা। জোয়ার আসায় পানি বেশ অনেকখানি উপরে চলে এসেছে। পথের এক জায়গায় পার হতে হল ধারালো প্রবাল পাহাড়ের উপর দিয়ে।

এসময় আমার সঙ্গী ছিলো স্থানীয় পুচকা পাচকার দল। আমার গাউন, মাথায় দেয়া ফুলের ব্যান্ড, খোলা চুল সবকিছুতে ওদের চরম বিস্ময়! তোমার মাথার ঐটা অনেক সুন্দর’, ‘তুমি অনেক ভালো’… এরকম আরো কত কথা! আমাকে একটু ছুঁয়ে দেখে সে কি আনন্দ! আমার নাম কি জিজ্ঞেস করলো। বললাম, মিতু। সেটা উচ্চারণ করতে বেশ খানিকটা সময় লাগলো। ম্যাতু, মেতু, মিইত্যু…

আসমা, আশিক, নুরকলি এই বাচ্চাগুলোকে আমি সারাজীবনেও ভুলবোনা। প্রবাল দ্বীপ পার হবার সময় আমার ৪ পাশে ৪ জন থেকে কি পরম মমতায় আমাকে পার করে দিয়েছিলো! প্রবাল দ্বীপ পার হয়ে পেলাম একটা টঙের দোকান। সেখানে দুই ছোট ভাই সহ একটু ঝিরুতে চা পান করা হল।

রাতে বারবি-কিউ পার্টি অনেক কিউ দিয়ে শেষ হল। লবন বিহীন পরটার স্বাদ খুবই ভালো ছিলো।

রাতে ঘুমাবোনা। এই মর্মে রাতে ড্রেস চেঞ্জ করে বীচে গেলাম। প্রচন্ড বাতাস, সমুদ্রের গর্জন, মাথার উপর লাখো তারা আর স্থানীয় গায়েনের গান! ওহ জীবন! সম্ভবত জীবনের অন্যতম সেরা সময় ছিলো সেই ২/৩ ঘন্টা।

রাতের ২টার দিকে ফিরে এলাম রিসোর্টে। এরপর সবার সাথে শুরু হল গানের কলি খেলা। ভাঙা গলা দিয়ে সুর বের হয়না তাও চিল্লানো। 

ভোর সাড়ে ৫টার দিকে চলে গেলাম জেটির ব্রিজে। সূর্য রাজা আমাদের অপেক্ষমাণ রাখতে বেশ মজাই পাচ্ছিলেন বোধহয়। অবশেষে উনার ঘুম ভাঙলো। আর সেই সাথে আমাদের চোখ জুড়ালো।

সাড়ে ছয়টার দিকে রিসোর্টে ফিরে এসে একটুখানি ঘুমালাম।

শেষ দিন

২ ঘন্টা ঘুমের পর উঠলাম। সকালের নাস্তা শেষে বড় ভাইয়া আপুদের সাথে চলে গেলাম সেন্ট মার্টিনের অলি গলিতে। দুপুরে শীপ। সব গোছগাছ করার তাড়া। তবুও একটু খানি প্রবাল দ্বীপে গিয়ে ছবি তোলার উছিলায় আরো কিছুটা সময় স্বপ্নরাজ্যকে আলিঙ্গন করলাম।

এবার মন খারাপের পালা। সব মায়া কাটিয়ে এবার ফিরতে হবে যে। ৩ স্যার শিপ মিস করে মন খারাপের সময়টাতেও আনন্দ দিলো। আসার পথে বাড়তি পাওয়া হিসেবে যোগ হল ১ ঘন্টা কক্সবাজার থাকার সুযোগ। যাক ট্যুরের ১৬ আনাটা পূর্ণ হল তবে।

সম্ভবত সুগন্ধা বীচে গিয়েছিলাম আমরা। সমুদ্র দেবতার হুঙ্কারে কিছুটা ভয়ই পেয়েছি বলা চলে। কক্সবাজার ঘোরা শেষে আবার ফেরার পালা। এবার আর কোন আনন্দ, আমেজ, হাসি নেই। ক্লান্ত আর অবসাদময় চোখ এলিয়ে ঘুমোতে ঘুমোতে চলে এলাম আবার এই যান্ত্রিক শহরের বুকে।

https://www.mega888cuci.com