ক্রিকেটার সাইফ হাসান: বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা না সৌদি আরবের?

২০১৬ সাল। অনূর্ধ্ব-১৯ এশিয়া কাপের খেলা চলছে শ্রীলঙ্কায়। কিছুদিন আগে ইংল্যান্ড সিরিজ দিয়ে জাতীয় দলে ঢুকেছেন দলটির সাবেক অধিনায়ক মেহেদি হাসান মিরাজ। নতুন দ্বায়িত্ব পেয়েছেন সাইফ হাসান।

অধিনায়ক হিসেবে যাত্রা ভালোই শুরু করেছেন, রান পাচ্ছেন ব্যাট হাতে। কিন্তু খেলার বাইরের একটা বিষয় নিয়ে বেশ চিন্তিত তিনি। ঢাকা থেকে মা ফোন দিয়ে জানিয়েছেন শ্রীলঙ্কার একটি পরিবারের সদস্যরা তার সাথে দেখা করতে আসছেন। তিন বছর আগেও বয়সভিত্তিক দলের হয়ে শ্রীলঙ্কা এসেছিলেন তখনতো এরা আসেনি! আজ হঠ্যাৎ!

সাইফ আরো ভড়কে গেলেন যখন একজন দু’জন না পঁচিশজন আসে টিম হোটেলে। সাইফ বয়সভিত্তিক দলের প্রধান নির্বাচক, জাতীয় দলের সাবেক ক্রিকেটার এহসানুল হককে বললেন ‘ভাইয়া এবার মনে হয় সত্যি সত্যি কিডন্যাপ করে রেখে দিবে শ্রীলঙ্কায়!’

বিশাল মানুষের বহর দেখে এহসানুল নিজেই চিন্তিত! কি না কি হয়! সাইফের সাথে এদের কখনো কথা হয়নি, দেখা হওয়া আরো দূরের বিষয়! বিচলিত অধিনায়কের সাথে যখন তাদের দেখা হয় তখন সব শঙ্কাকে দূর করে দিয়ে তারা জড়িয়ে ধরলেন সাইফকে!

কান্নায় ভেঙে পড়লেন পরিবারের এক বৃদ্ধা। তাদের সবচেয়ে ছোট মেয়ের একমাত্র ছেলে এই সাইফ! সেই মেয়ে যার সাথে পরিবারের দেখা হয়নি বিগত ২২ বছর! সাইফ যে তাদের পরিবারেরই অংশ!

ভাগ্যের সন্ধানে সৌদি আরবে পাড়ি জমিয়েছিলেন জনাব হাসান রেজা। সেখানেই পরিচয়, প্রেম এবং বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এক শ্রীলঙ্কান তরুনীর সাথে। সেটা ১৯৯৫ সালের কথা। ১৯৯৮ সালে তাদের কোল আলো করে আসেন মোহাম্মদ সাইফ হাসান।

পরিবারের অমতে বিয়ে, বাবা মা মেনে নেয়নি ফলে সাইফের মায়ের আর কখনোই শ্রীলঙ্কা যাওয়া হয়নি, সাইফেরও কখনোই যাওয়া হয়নি নানা বাড়ি। কথাও হয়নি কখনো। কেবল গল্প শুনেছেন। তবে সাইফের নানা নানি অনেকবার মেয়েকে বলেছেন শ্রীলঙ্কা ফিরে যেতে, সাইফকে সহ তারা মেয়েকে ফিরিয়ে নিতে আগ্রহী ছিলেন।

পঁচিশজনের বিশাল বহর দেখে সাইফ তাই ভেবেছিলেন এইবার বুঝি নানাবাড়ির লোকজন রেখেই দেয় তাকে শ্রীলংকায়! ছেলের টানে মা যদি ঘরে ফেরেন!

জন্মের পর প্রথম দশ বছর সাইফের কেটেছে সৌদিতেই। আরবের জল হাওয়াতেই বড় হয়ে উঠেছেন। ক্রিকেট ভালোবাসতেন একদম ছোট বেলা থেকেই। দেয়ালে বল মেরে ব্যাট দিয়ে সেই বল খেলতেন, একা একা ঘন্টার পর ঘন্টা। কখনো কখনো বাবার সাথে পাশের দেশের শারজাহতে খেলা দেখতে যেতেন।

আর বাবাকে বলতেন ‘বাংলাদেশ শুধু হারে কেন?’ বাবা উত্তর দিতেন ‘তুমি যেদিন বাংলাদেশের হয়ে খেলবা সেদিন জিতবে বাংলাদেশ।’ সাইফের মারাত্মক ক্রিকেট আগ্রহ দেখে প্রবাসীর বলতেন ওকে আরব আমিরাতের আইসিসি একাডেমিতে পাঠিয়ে দেয়ার জন্য। সেখানে আরব দেশের ছেলেদের জন্য ক্রিকেট অনুশীলন হতো।

কেউ কেউ বলতেন সাইফ হয়তো আরব আমিরাত দলে খেলতেও পারেন! কিন্তু বাবা হাসান রেজা নিলেন কঠিন এক সিদ্ধান্ত, দশ বছরের সাইফকে নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। ছেলেকে ভর্তি করান ধানমন্ডির ক্রিকেট কোচিং স্কুলে, আবাহনীর মাঠে বেড়ে উঠেন সাইফ রণজিৎ স্যারের অধীনে।

সেদিন শ্রীলঙ্কার গলে যারা এসেছিলেন তারা ছিলেন সাইফের নানা নানি, মামা, খালারা। পুরা বাংলাদেশ দলকে দাওয়াত করে নিয়ে যান সাইফের নানা বাড়ি। নাতির সূত্রে সাইফের বাবা মায়ের সাথে জমে থাকা বরফ গলতে শুরু করে। তারা গর্বিত সাইফকে নিয়ে।

সাইফের বড় মামা সেদিন সাইফকে বলেন ‘তুমিও শ্রীলঙ্কার ঘরের সন্তান, তুমিও একদিন দিলশান, জয়াবর্ধনের মত বড় ক্রিকেটার হয়ে বাংলাদেশের জাতীয় দলে খেলে সুনাম করে আমাদের গর্বিত করবে এটাই আমরা চাই।’

সাইফ কিন্তু সেদিকেই এগোচ্ছেন। বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে উঠে আসা তরুণদের ভেতর ওপেনার হিসেবে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় এই সাইফ হাসান। তার সবচেয়ে বড়গুন এই বয়সেই তার সলিড টেকনিক আর টেম্পারমেন্ট। টেস্ট ক্রিকেটের জন্য আদর্শ ব্যাটসম্যান।

এই বছরের জানুয়ারী মাসে সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে জাতীয় লিগে করেন ডাবল সেঞ্চুরি (২০৪), আগের ম্যাচেই করেছিলেন সেঞ্চুরি। এবারের জাতীয় লিগেও প্রথম ম্যাচে করেছেন সেঞ্চুরি। লম্বা ফরম্যাটে আদর্শ মানা হলেও পঞ্চাশ ওভারের ম্যাচেও ভালো খেলেছেন। আবাহনীর হয়ে তিন নাম্বারে খেলেছেন এই বছর।

সাইফ হাসান কিন্তু একই সাথে শ্রীলঙ্কা এবং বাংলাদেশের নাগরিক! আবার জন্মস্থানসূত্রে সৌদি আরবের| প্রথম শ্রেনীর সকল সুযোগ সুবিধা পাবেন যদি কখনো সেখানে স্থায়ী হন।

অনূর্ধ্ব-১৯ দল শেষে তিনি যখন জাতীয় দলে আসবেন, বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাথে জড়িত সবাই প্রত্যাশা করে তখন তিনি লম্বা সময় দলকে সার্ভিস দিবেন। আশাকরি সেটাই হবে, অগ্রীম শুভকামনা এই ভবিষ্যৎ তারকার জন্য!

https://www.mega888cuci.com