লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশন সুচিত্রা সেন

বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের সামনে দিয়ে গেলে এখনও যখন যাই বুকের ভিতরটা ধড়াস করে ওঠে। মনে পড়ে যায় এইখানেই আঁধার অভিসারিকা অসূর্যম্পশ্যা-র বর্তমান ছবি বেআব্রু হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।

ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজ,এখনও যেখানে সেন পরিবারের ভোট দেবার সিট পড়ে। নব্বই দশকে যখন সব নাগরিকের ভোটার পরিচয় পত্র-র ছবি তোলার জন্য হিড়িক পড়ে তখন তাঁর কাছেও সেটি গুরত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যিনি সব ছেড়ে দিয়েছেন তাঁর কি দরকার নাগরিকত্বের। কি দরকার ছবি তোলার ভোটার কার্ডের জন্য। এইরকম প্রশ্ন অনেকেই করেন।

কিন্তু সুচিত্রা সেন-এর থেকে বেরিয়ে এসছিলেন তিনি। রমা দাশগুপ্তের থেকে নয়। রূপালি পর্দার সুচিত্রা সেন কে তিনি যৌবন সরসী রূপে দর্শকের কাছে দর্শকের মনের মনিকোঠায় রেখে দিতে চেয়েছেন দশকের পর দশক। তাই কোন পাবলিক অ্যাপিয়ারেন্সে আসেননি তিনি। সাংবাদিক ও দর্শক দের কাছে ১৯৭৮’র পর ধরা দেননি তিনি।

কিন্তু তাঁর পরিবারের লোকজনদের কাছে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুবান্ধবদের মধ্যে তাঁর অবাধ যাতায়াত ছিল।কারোও বান্ধবী সুচিত্রা, কারো সুচিত্রা পিসি, কারও মা, আম্মা, কারও সুচিত্রা মাসি। তিনি ‘মেশো কিন্তু মিশে যেওনা’-তে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই যাদের সঙ্গে মিশতেন সেখানেও একটা লক্ষঢরেখা টেনে রাখতেন। কারণ যারা তাঁর সংস্পর্শে যেতেন তাঁরাও জানতেন তাঁরা কতটা সৌভাগ্যবান। তাঁরাও জানতেন রমাদি সুচিত্রার সঙ্গে বেশি মিশলে সম্পর্ক জ্বলে যাবে। একটা আড়াল রাখতেন মিসেস সেন। সুচিত্রা সেন-কে রূপালি পর্দায় ছেড়ে এলেও তার মেজাজ মর্জি ছেড়ে দেননি তিনি।

কোনো অবসাদ, কোনো রোগ, কোনো বিকার নয়। সবকিছুর থেকেই রিটায়ারমেন্ট আছে তারপর সেখানে থাকলে সেই সিংহাসনের সম্মান পাওয়া যায়না তাই তিনি সরে যান। সুচিত্রা নিজের সেরা সময়টা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। সুচিত্রা সেন তিরিশ চল্লিশ পঞ্চাশ পরও হেডলাইনে থেকে যাবেন তাঁকে নিয়ে এই রহস্য রোমাঞ্চ বাস্তব পরাবাস্তব কথার জন্য।

তাঁকে নিয়ে যুগেযুগে গোলটেবিল বৈঠক হবে তাঁকে স্পর্শ করা যায়না বলে। যে জিনিস নিষিদ্ধ সবটা জানা যায়না মানুষ সেটা নিয়েই উৎসুক হয়। এত এত হিট গান, সুপার ডুপার হিট ছবি, এত রূপ শুধু আজও সুচিত্রা সেন-কে বাঁচিয়ে রাখেনি। বাঁচিয়ে রেখেছে তাঁর রহস্যময়তা। যেদিন সুচিত্রা রূপালি পর্দা থেকে সরে গেলেন সেদিন থেকেই তাঁর নতুন লড়াই শুরু হয়েছিল।

তাঁর সমসাময়িক নায়ক নায়িকারা ভাবতেও পারেননা এ জিনিস কি করে রপ্ত করা যায়। কিন্তু সেই কঠিন কাজটা সুচিত্রা করে দেখিয়েছেন তাই তিনি বাঙালির গ্রেটা গার্বো। গ্রেটা গার্বো আর সুচিত্রা দু’জনের জীবননাট্য অনেকটাই এক। শরীরে সময়ের পদধ্বনি টের পাচ্ছিলেন৷ নিজেকে সরিয়ে নিলেন লাইট-ক্যামেরা-অ্যাকশনের বাইরে৷ জীবন যৌবনে গ্রেটা গার্বো অনেক একাকিনী ছিলেন। সুচিত্রা সে অর্থে অতটা একা ছিলেননা। গার্বোর স্বেচ্ছা নির্বাসন, সঙ্গ-নিঃসঙ্গতা নিয়ে চর্চা অব্যাহত আছে৷

গ্রেটা গার্বো-কে এক সময় নিয়মিত হাঁটতে দেখা যেত নিউ ইয়র্কের রাস্তায়৷ সেই ছবি ক্যামেরাবন্দি করার জন্য হুড়োহুড়ি করতেন চিত্রসাংবাদিকরা৷ তবে ব্যক্তি জীবনের বৃত্তে ঢুকে মহানায়িকাকে কেউ উত্ত্যক্ত করতে যাননি৷তাই কলকাতার নিভৃতচারিণীকে নিয়ে দর্শন-ক্ষুধার রহস্য-কুয়াশা আরও ঘনীভূত করেছে৷ সঙ্গে একাধিক প্রজন্মের বেড়া টপকানো মুগ্ধতা তো ছিলই সুচিত্রার রূপে অভিনয়ে গ্ল্যামারে৷

আজকের টুইটার, ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইন্সন্ট্রাগ্রাম, শপিং মল, মাল্টিপ্লেক্স-এর বাঙালিদের কাছে আজও ‘মুখোমুখি বসিবার’ জন্য থেকে যাবেন সুচিত্রা সেন৷ মিসেস সেন৷ এমন দেশটি কোথায় খুঁজে পাবেন গার্বো?টলিউডের গার্বো অনেক সৌভাগ্যবতী তিনি অন্তরালে থেকেও যে বিপুল ভালোবাসা পেয়েছেন ফ্যানদের থেকে তা ক’জন পেয়েছেন?

কিন্তু ১৯৯৫ সালে ভোটার আইডেন্টি কার্ডের ফোটো তোলার দরকারে টলিউডের গার্বোর অন্তরাল সরে গেল। তিনি রূপালি পর্দা থেকে সরে দাড়িয়েছিলেন কিন্তু জীবন থেকে তো নয় তাই তাঁর হয়তো মনে হয়েছিল ভোটার আইডেন্টি কার্ড জীবনে চলতে গেলে সব কাজে দরকার তাই ছবি তোলা আবশ্যক।

ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে আগে থেকেই খবর ছিল তিনি আসবেন। তাঁর বাড়ির কাছেই। বিভিন্ন কাগজের সাংবাদিকরা আগের দিন রাত থেকে ঐখানে ঘাঁটি গেড়ে লুকিয়ে থাকলেন কেউ আবার ছদ্মবেশে থাকলেন গোপনোচারিণীকে ফ্রেমবন্দী করতে।

কতটা সিনেম্যাটিক ভাবুন। যেন একটা সিনেমার প্লট। তিনি ছবি করা ছেড়েছিলেন সত্তরের শেষ দিকে আর নব্বই দশকেও তাঁকে একবার দেখবার জন্য এত প্রস্তুতি। এই হেভি ডিমান্ড, ট্যক অফ দি টাউন হয়ে থাকতে হয় কিভাবে সেই মোহিনীবিদ্যা সুচিত্রা জানতেন। কিন্তু ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজে আগে থেকেই নোটিশ দেওয়া ছিল তাঁকে যেন বিরক্ত করা না হয়।

স্বামী দিবানাথ ও মেয়ে মুনমুনের সাথে

ভোটার পরিচয় পত্রে ছবি তোলার সময় সকাল দশটা থেকে। তার আগে তো তিনি আসবেননা। কিন্তু টলিউডের রাজেন্দ্রাণীর জন্য সে নিয়মও ভাঙতে পারে। তাই সকাল হতেই তাক ক্যামেরা। শেষ অবধি তাঁর সবসময় সহকারী দু’জন ব্যক্তির সঙ্গে গাড়ি করে এলেন তিনি। দুই যমজ যুবক— শুভঙ্কর এবং তীর্থঙ্কর দাস।যারা সব দরকারে সুচিত্রা’র বিশ্বস্ত লোক।

প্রিমিয়ার পদ্মিনী গাড়ি থেকে নেমে ঘরে ঢুকে গেলেন তিনি কলেজের ভিতর। পরনে চিকনের কাজকরা সাদা চুড়িদার হাতা গোটানো, এলো কাঁচাপাকা সদ্য শ্যাম্পু করা লম্বা চুল, লিপগ্লস মাখানো ঠোঁট, মুখে অনন্ত স্নিগ্ধতা, কখনও দর্পের অহংকার কখনও নিজের অন্তরাল সরে যাবার ভয় সব অভিব্যক্তি খেলত তাঁর মুখে। চোখে সানগ্লাস সম চশমা। হাতে রিস্ট ওয়াচ ও ছোটো ব্যাগ। বসলেন একতলার একটি ঘরে। খুলে রাখলেন চশমা সামনের টেবিলে।

ভেতরেও রয়ে গেছে সাংবাদিকরা। তিনি জানতেন না তাঁর এতদিনের সাধনা আজ বেআব্রু হবে। সুচিত্রার দু’চোখ ভরে তখন অদ্ভুত শাসনের ছবি। গাছের ছায়ার মতো স্থিতধী মুখ। ‘প্রণয় পাশা’-র বাসবদত্তার মতো যার তেজ , ‘প্রিয় বান্ধবী’ মতো যার চলাফেরা। বাইরে তখন সচিত্র পরিচয়পত্র করাতে আসা লোকজনের ভিড়। চিৎকার, চেঁচামেচি।

এবার ঐ নিচের ঘর থেকে দোতলায় উঠলে ছবি তোলার ঘর। সুচিত্রা চোখে সানগ্লাস সম চশমা দিয়ে উঠলেন।এক হাতে মুখের একাংশ ঢেকে চলতে শুরু করলেন। সবসময় নিজের মুখ ঢেকে চলার চেষ্টা করে গেছেন সুচিত্রা। কোনো ক্যামেরার ফ্ল্যাশ তাকে ধরতে না পারে। তবু তখন একটা বড় সুবিধে ছিল নব্বই দশকে লোকের হাতেহাতে মোবাইল ক্যামেরা ছিলনা।

উপরে ছবি তোলার ঘরে ঢুকে গেলেন সুচিত্রা। তাকালেন অতলস্পর্শী চোখে ক্যামেরার দিকে। কত যুগ পর রিনা ব্রাউন আবার ক্যামেরা’র সামনে। ঝলসে উঠল ক্যামেরার ফ্ল্যাশ। সুচিত্রা সেন যেন বেরিয়ে এলেন খোলস ছেড়ে ঐ ফ্ল্যাশের ঝলকানিতে। আলোয় আলোকিত বিপাশা ইন্দ্রাণী সাগরিকা অর্চনা রত্নমালা’র সেই মুখ।
এরইমধ্যে চিত্র সাংবাদিকের ফ্ল্যাশ ঝলসে উঠতে লাগল ঘনঘন। বিরক্ত সুচিত্রা আদেশ করলেন, ‘স্টপ ইট। স্টপ ইট।’

বৃদ্ধ বয়সে

তিনি বুঝে গেছেন, তিনি চিত্র সাংবাদিকদের ঘেরাটোপে পড়ে গেছেন। কিন্তু ফ্ল্যাশ এদিক ওদিক দিয়ে হয়েই চলল। কাজ সারা হতেই আর এক মূহুর্ত সময় নষ্ট করলেননা সুচিত্রা। ততক্ষণে গাড়িতে তাঁর এক সহকারী যুবক বসে গেছে আরেক জন ম্যাডামকে তাঁদের মা-কে লোক এড়িয়ে নিচে নামাতে তৎপর। সিঁড়ি ভেঙে গেটের মুখে চিত্রসাংবাদিকদের ছবি তোলায় বাধা দিতে ওড়না খুলে মুখের সামনে দোলাতে লাগলেন স্কুল বালিকার মতো। ততক্ষণে সবাই জেনে গেছে সুচিত্রা সেন ওখানে এসছেন।

জনজোয়ার নামবার আগেই ওড়নায় মুখ ঢাকতে ঢাকতে সেই কালো প্রিমিয়ার পদ্মিনীতে গিয়ে উঠলেন সুচিত্রা। নিজের মুখ এক হাত দিয়ে সর্বক্ষণ ঢেকে রাখছেন তিনি। গাড়ির দরজা লক করেই গাড়ি চলতে শুরু করল। গাড়ি গিয়ে থামল ‘হালদার সুইটস’-এ। গাড়ি থেকে নামলেন সুচিত্রা। সেই দোকান থেকে দু’শো টাকার দু বাক্স মিষ্টি কিনে তুলে দিলেন শুভঙ্কর তীর্থঙ্কর-র হাতে। তাদের আপত্তি নাকচ করে দিয়ে বললেন, ‘তোর মা দিচ্ছে রে, নে।’

সেদিন সোজা গাড়ি নিয়ে চলে গেছিলেন মুনমুনের বাড়ি। যাতে চিত্রসাংবাদিকদের হাত থেকে বাঁচতে পারেন।

সপ্তপদী সিনেমার একটি দৃশ্য

পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকা, বর্তমান, স্টেটসম্যানসহ কলকাতার সব কাগজে বড় বড় করে বেরোলো তাঁর বর্তমান ছবি প্রথম পাতায় বিশাল করে। সেদিন সারা বাংলা উত্তাল হয়ে গেছিল এত যুগ পর সুচিত্রা সেন-কে দেখে। তখন আমি ছোটো তাও আমার বেশ মনে আছে, খবরের কাগজে সুচিত্রা সেন-এর ওই ছবি দেখে আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যাই।

আমার সময়ের নায়িকা তো উনি নন ।আমি টিভিতে ওনার ছবি দেখে ওনার ফ্যান। আমি সুচিত্রা সেনের ছবিটা দেখে তৎক্ষণাৎ আমার মেজ পিসি-কে কাগজটা দেখাই। তিনিও সুচিত্রা ফ্যান। ছোটথেকেই মেজপিসি’র মুখে সুচিত্রার গল্প শুনে শুনে আমি আরও সুচিত্রা-ফ্যান। যে নায়িকাকে ঘিরে এত রহস্য রোমাঞ্চ তাই তিনি আমায় আরও আকর্ষণ করতেন। আমি সেদিন সারাদিন এই ছবি গুলো দেখে গেছিলাম মুগ্ধ হয়ে।

ছবি তোলা হয়ত তাঁর ব্যাক্তি স্বাধীনতাকে হস্তক্ষেপ করা কিন্তু কজন সাংবাদিক যে দুঃসাহসিক কাজ করেন তাঁদের জন্য আমরা আমাদের গ্রেটা গার্বো-কে দেখতে পেলাম। বয়স অনুযায়ী রূপ পরিবর্তন হবে, যৌবন চলে যাবে কিন্তু ঐ ব্যাক্তিত্ব ঐ ক্যারিশমা একই। তাঁর যে সামনে হাত দুটো দিয়ে দাঁড়ানো দেখলেই বোঝা যায় তিনি সুচিত্রা সেন। ডেভিড হেয়ার ট্রেনিং কলেজের লন দিয়ে তিনি যখন হেঁটে যাচ্ছিলেন মনে হচ্ছিল ‘হসপিটাল’ ছবির ডঃ শর্বরী হেঁটে যাচ্ছেন। হাঁটার মধ্যেও একটা কি মোহনীয় স্টাইল।

শেষ দিকে সুচিত্রা আর হাঁটতে পারতেননা। তখন আর বেরোতেননা। হাঁটতেও তাঁর কারো না কারো সাহায্য লাগত। কিন্তু এসব বার্ধক্য জরা অতিক্রম তিনি অনেকদিনই করেছেন।

তিনি চিরকালের প্রনয়িনী।

https://www.mega888cuci.com