যোগাযোগে দক্ষতাই খুলে দেবে সাফল্যের দুয়ার

১.

জীবনে সফল হতে কে না চায়! কিন্তু সফলতা সবার কাছে সহজে ধরা দেয় না। সফলতার জন্য আপাত দৃষ্টিতে সাধারণ কিন্তু তলিয়ে দেখলে মাথা ঘুরে যায় এমন অনেক বিষয় রয়েছে। এমনই এক বিষয় হচ্ছে আন্তঃব্যক্তিক যোগাযোগ বা ইন্টার-পারসোনাল কমিউনিকেশন। সহজ ভাষায় ইন্টার-পারসোনাল কমিউনিকেশন বলতে বোঝায় ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির যোগাযোগ।

যোগাযোগ বলতে সাধারণত আমরা বুঝি অন্যের সাথে ভাববিনিময়। আপনি হয়ত ভাবছেন এ আর এমন কি ব্যাপার! কিন্তু যোগাযোগের বিস্তৃত অর্থ আছে। শুধু কথা বলা বা লেখা ছাড়াও অন্য অনেকভাবেই যোগাযোগ করা যায় এবং সেই যোগাযোগগুলো অন্যের মনে গভীর ছাপও ফেলে যায়! তাহলে চলুন দেখে নিই এখানে যোগাযোগ বলতে আমরা কি বোঝাতে চাচ্ছি।

ব্যক্তির ব্যবহার, বডি ল্যাঙ্গুয়েজ, দেহের আউটফিট, অন্যের মতামতের প্রতি সহনশীলতা এবং ভাষাগত দক্ষতার ব্যবহার করে নিজের বক্তব্য বা চিন্তা একদম পরিষ্কারভাবে অন্যকে বুঝিয়ে দিয়ে তার মনে ছাপ ফেলে যাওয়াকেই এখানে যোগাযোগ বলা হচ্ছে। কি, চমকে যাচ্ছেন যোগাযোগের ব্যাখ্যা দেখে? আমরা যোগাযোগ বলতে যা ভাবি তার সাথে অনেক অমিল, তাই না? বোঝাই যাচ্ছে এটা একেবারে সহজ কোন ব্যাপার নয়। কিন্তু ঠিকভাবে চর্চা করলে এইসব ব্যাপারে দক্ষতা অর্জন কঠিন কিছুও নয়!

২.

প্রথম দর্শনেই কারো মনে পজিটিভ ছাপ ফেলে যাওয়ার মোক্ষম অস্ত্র হচ্ছে সুরুচিপূর্ণ ব্যবহার। অতি সাধারণ কিছু এটিকেট ও ম্যানার অনুসরণ করলেই এটা সম্ভব।

এটিকেট হচ্ছে ভদ্রতা এবং ম্যানার অর্থ পদ্ধতি বা রীতিনীতি। ধরুন আপনি আপনার বান্ধবী বা কোন নারী আত্নীয় বা কোনো কলিগের সাথে বেরোচ্ছেন। বেরোনোর সময় দরজাটা খুলে ওনাকে আগে বেরোতে দিন, ঢোকার সময়ও তাই করুন। আর দরজায় নক করার সময় ধাম ধাম করে কিল দেবেন না, আঙুলের গাঁট দিয়ে টোকা দিন। গাড়িতে ওঠার সময় সাথেরজনকে আগে উঠতে দিন। মনে রাখবেন সবসময়ই ‘লেডিস ফার্স্ট’। আরো একটা কথা, উগ্র ঘ্রাণের পারফিউম বা বডি-স্প্রে ব্যবহার করবেন না। মাঝে মাঝে কিছু লোকের থেকে এমন কিছু বডি স্প্রের ঘ্রাণ পাই যা পাওয়ার সাথে সাথেই নাক কুচঁকে ওঠে। আপনার কখনো এমন মনে হয় নি? হয়ে থাকলে সেই মুহূর্তে আপনার কতটা বিরক্তি লেগে ছিল একবার ভাবুন!

আবার কোথাও বসার সময় সাথীকে আগে বসতে বলুন। মোবাইল টেবিলে বা হাতে না রেখে পকেটে রাখুন। হঠাৎ হাঁচি বা কাশি দেয়ার সময় মুখের সামনে হাত নিয়ে আসুন। কথোপকথনের মাঝখানে যদি এমন হয় তাহলে সরি বা এক্সকিউজ মি বলুন। যদি সর্দি থাকে তাহলে বারবার নাক টানবেন না, সাথে সবসময় রুমাল রাখুন। মুখে যাতে দুর্গন্ধ না হয়ে সেদিকে লক্ষ্য রাখবেন। সহজ সমাধান হচ্ছে ঘন ঘন পানি খাওয়া, অনেকক্ষণ কিছু না খেলে বা মুখের ভেতরটা শুকিয়ে থাকলে সহজেই মুখে দুর্গন্ধ হয়।

আমাদের আশেপাশে আমরা সবসময়ই এমন কিছু লোক দেখি যারা কচমচ শব্দ করে দুনিয়ার সবাইকে শুনিয়ে খাওয়া-দাওয়া করে। এই আওয়াজ যে কতটা বিরক্তিকর তা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। খাওয়ার সময় সবসময় নিঃশব্দে খাবেন। কঠিন কিছুই নয়, শুধু খাবার চিবোনোর সময় ঠোঁট বন্ধ করে চিবোবেন তাহলেই আর কোন বাড়তি শব্দ হবে না।

৩.

এ তো গেল ব্যবহারের প্রথম পাঠ। এবার চলুন দ্বিতীয় ভাগে প্রবেশ করি। এভাগে রয়েছে বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা শরীরী ভাষা। শরীরী ভাষা শব্দটা নতুন লাগছে? যেহেতু এখানে শরীরকে ভাষা বলা হয়েছে তারমানে  শরীর দিয়েও কথা বলা যায়! তাহলে চলুন শিখে নিই শরীর ভাষার বর্ণমালাগুলো।

শরীরী ভাষার বর্ণমালায় প্রথমেই শিখতে হবে জেসচার এবং পোসচার। পোস্টার শুনে আবার ভেবে বসবেন না দেয়ালে লাগাবার পোস্টার এখানে এল কিভাবে! এই পোস্টার বলতে বোঝানো হয় ব্যক্তির বসার ভঙ্গিমা, দাঁড়াবার ভঙ্গিমা এসব। আর যেসচার বলতে বোঝানো হয় হাত-পায়ের অঙ্গভঙ্গি, মানে হাত-পা নাড়ার ব্যাপারগুলো আর কি!

ভাবছেন কি যন্ত্রণা ! এখন হাত-পা নাড়া বা দাঁড়ানো-বসাও শিখতে হবে! দাঁড়ান, উদাহরণ দিচ্ছি এখনি। ধরুন আপনি কারো ইন্টারভিউ নিচ্ছেন।আপনার সামনে যে বসে আছে সে কাত হয়ে বসেছে। বসার ভঙ্গি দেখেই মনে হচ্ছে তার দেহে কোন শক্তি অবশিষ্ট নেই। মুখ দেখেই মনে হচ্ছে তার খুব দুঃখ বা খুব বিরক্তিতে আছে। তার ওপর  আবার কথা বলার সময় দুর্বলভাবে অকারণে হাত নাড়ছে,পা নাচাচ্ছে বা মেঝেতে পা ঠুকছে। এগুলি দেখে ওই চাকরিপ্রার্থী সম্পর্কে আপনার কি ধারণা হবে? একটা কথা সবসময় মনে রাখবেন, প্রথম দর্শনে কারো সম্পর্কে যে ধারণা মনে গেঁথে যায় তা পরে পরিবর্তন করা খুবই মুশকিল।

তাহলে কি করা যায়? বসার সময় সবসময় সোজা হয়ে বসবেন। শিরদাঁড়া টান করে বসবেন। মুখে সবসময় একটা স্মিত হাসি ধরে রাখুন। আনুষ্ঠানিক কোন জায়গায় কখনোই পা নাচাবেন না বা বারবার পা ঠুকবেন না। যখন কারো সাথে কথা বলবেন তখন কখনোই বারবার মুখের সামনে হাত নাড়বেন না। বারবার এদিক ওদিক মোচড়া-মোচড়ি করবেন না। এতে বক্তা ভাববেন আপনি তার প্রতি মনোযোগ দিচ্ছেন না। তাহলে এগুলি একটু দেখে নেয়াই ভালো। কে বলতে পারে হয়ত গোমড়া মুখ বা অতিরিক্ত হাত নাড়ার কারণে কোন মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানির চাকরিই হয়ত ফসকে গেল!

৪.

তাহলে এবার চলুন দেখে নিই যোগাযোগে দেহের আউটফিট কেমন হওয়া উচিত। আউটফিট বলতে এখানে বোঝাচ্ছে ড্রেস-আপ এবং গেট-আপ। পরিপাটি ড্রেস-আপ সবসময়ই আপনার কনফিডেন্স বাড়াতে বন্ধুর মত সহায়তা করবে। তাহলে কোন আনুষ্ঠানিক জায়গায় ড্রেস-আপ এবং গেট-আপ কেমন প্রয়োজন?

আমরা সবাই একটা প্রবাদ শুনেছি ,‘আগে দর্শনধারী ,পরে গুণবিচারী।’ প্রথমে সবাই আপনার ড্রেস-আপ এবং গেট-আপটাই দেখবে, তারপর বিচার করবে আপনার কি কি গুণ আছে। তাহলে বোঝাই যাচ্ছে ড্রেস-আপ এবং গেট-আপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবার ভেবে বসবেন না যে অনেক দামি ড্রেস পড়লেই গেট-আপ সুন্দর হয়ে যাবে। এটা সম্পূর্ণই রুচির ব্যাপার। একটু চিন্তাভাবনা করে বুদ্ধি খাটিয়ে কেনাকাটা করলেই সম্ভব।

চেষ্টা করুন সলিড কালারের পোশাক পরতে। যাদের গায়ের রঙ একটু কালো ধরনের তারা একটু হালকা রং পড়ার চেষ্টা করুন, গাড়ো রঙের চেয়ে অনেক ভালো লাগবে। আর ড্রেস কম্বিনেশনটাও ঠিকঠাক হওয়া চাই। ফর্মাল ড্রেসের একটা বেসিক কোড হচ্ছে বেল্ট ও জুতা একই রঙের পড়া। যে কালারই পড়ুন না কেন খেয়াল রাখবেন বেল্ট আর জুতার কালার যেন একই হয়। আবার কোন অনুষ্ঠানে পাঞ্জাবির সাথে যদি জ্যাকেট বা ব্লেজার পড়েন তাহলে কতটা বিসদৃশ লাগবে ভাবুন! পাঞ্জাবির সাথে সোয়েটার এবং চাদর পড়লে আবার দেখবেন কতটা মানিয়ে গেছে! আনুষ্ঠানিক কোন জায়গায় যদি পাঞ্জাবি না পড়েন তাহলে চাদরটাও বাদ দিন। অন্যদিকে শাড়ির সাথে একদম ফ্ল্যাট স্যান্ডেল কিন্তু মানায় না, একটু উঁচু হিল বেশ ভালো লাগে। তো কম্বিনেশনগুলো মাথায় রাখা জরুরি।

চেষ্টা করুন ঘড়ি পড়তে। তবে বেশি ঢিলেঢালা করে ঘড়ি পড়বেন না। চুল ব্যাকব্রাশ করলে কিন্তু যেকোন জায়গায় মানিয়ে যায়। চেষ্টা করুন ব্যাকব্রাশের অভ্যাস করার। হাত ও পায়ের আঙুলের ফাঁকগুলো যদি সাদা হয়ে যায় তাহলে লোশন ব্যবহার করুন।

একটা উদাহরণ দিই। আপনার শিক্ষক যদি ক্লাসে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, এলোমেলো চুল নিয়ে দুই ফিতার স্যান্ডেল ও টি-শার্ট পড়ে আসেন তাহলে আপনিই বাইরে বেরিয়ে বলবেন শিক্ষক হিসেবে ড্রেস-আপটা মানানসই হয়নি। তাহলে ভাবুন আপনি যদি কোথাও বিসদৃশ ড্রেস পরেন তাহলে অন্যরা কি ভাববে?

এই অভ্যাসগুলোর চর্চা শুরু করতে পারেন ছাত্রজীবন থেকেই। সবসময়ই মনে রাখবেন আপনি কি পারেন না পারেন দেখার আগে লোকে আপনার বাইরেটাই দেখবে।

৫.

এবারে যেটা বলব সেটার ভুক্তভোগী আমরা সবাই।আমরা সবাই শুধু বলতে চাই। কেউই অন্যের কথা শুনতে চাই না। এই কাজটায় মানুষের মনে খুব খারাপ প্রভাব পড়ে। মনে করুন আপনি খুব আগ্রহ নিয়ে কাউকে কিছু বলছেন। কিন্তু শ্রোতা মোবাইলে ম্যাসেঞ্জার চালাচ্ছে, বারবার টুংটং আওয়াজ হচ্ছে, আপনার কথা শুনতে শুনতেই আবার অন্যকে মেসেজ পাঠাচ্ছে। তার মানে সে একই সাথে অন্য কাজ করছে, আপনার কথায় কোন মনোযোগই দিচ্ছে না। কেমন লাগবে আপনার?

অথবা ভাবুন কাউকে কোন সিরিয়াস কথা বলছেন।এর মাঝে শ্রোতার ফোনে একটা ফোন এল।সে কিচ্ছুক্ষণ ফোনে খেজুরে আলাপ করে বলল, ‘আরে আমার এক বন্ধু এমনিই কল দিয়েছিল, আপনি কি যেন বলছিলেন?’ তখন কি অনুভূতি হবে আপনার?

আবার ভাবুন আপনিই কারো সাথে কথা বলছেন। কথার মাঝখানেই তৃতীয় একজন বারবার আপনাকে কিছু বলছে। সত্যি করে বলুন তো এমন হলে মেজাজ খারাপ হয় কি না? হ্যাঁ,মেজাজ খারাপ হয়। আপনার যেমন হয় তেমনি অন্য কারো সাথে আপনি এমন করলে তাঁরও মেজাজ খারাপ হয়।

সবসময় অন্যকে কথা বলার সুযোগ দিন এবং কথা শেষ করার সুযোগ দিন।অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুন দেখবেন বক্তা খুশি হবে। মোট কথা সহনশীল হোন।

৬.

অবশেষে আমরা ভাষাগত দক্ষতা নিয়ে আলাপ করতে যাচ্ছি। ভাষাগত দক্ষতা বলতে শুদ্ধভাবে গুছিয়ে কথা বলা এবং গুছিয়ে লেখা দুটোই বোঝায়। এর জন্য দরকার স্রেফ চর্চা এবং ইচ্ছা।

কেন দরকার ভাষাগত দক্ষতা? কারণ গুছিয়ে কথা বলতে না পারলে আপনি কখনোই অন্যকে অল্প কথায় নিজের মনের ভাব বোঝাতে পারবেন না। প্রতিদিন আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে পাঁচ মিনিট নিজের সাথে কথা বলুন। প্রথম দিন হয়ত কোন কথাই বেরোবে না মুখ দিয়ে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকুন, আবার পরেরদিন চেষ্টা করুন। এভাবেই হবে। ধীরে ধীরে নিজের আত্নবিশ্বাস বাড়বে।

আর শুদ্ধ উচ্চারণে কথা বলতে না পারলে কেউ আপনার কথায় গুরুত্ব দেবে না। মনে মনে বলবে, ও তো কথায়ই বলতে পারে না, ওর কথা শুনব কেন! সুতরাং শুদ্ধ উচ্চারণে যা বলতে চান তা গুছিয়ে বলুন। এজন্য বাংলা এবং ইংরেজি দু’টি ভাষাই শুদ্ধ উচ্চারণে বলা  শিখুন। শুদ্ধ উচ্চারণ শেখায় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে বাংলাদেশে, বেশিরভাগই তিনমাসের কোর্স করায়, কোর্স ফিও এক হাজারের আশেপাশে। অনেক সময় তো বন্ধুদের আড্ডায় দিলেন এবার নিজেকে কিছু সময় দিন, তাহলেই চলার পথ সুগম হবে।

৭.

তাহলে বোঝাই যাচ্ছে এখানে যোগাযোগ বলতে শুধু কথা বলা বা পরিচিত হওয়া বা ভাববিনিময়কে বোঝাচ্ছে না। ব্যক্তির সাথে ব্যক্তির যোগাযোগের ক্ষেত্রে উপরোক্ত বিষয়গুলো মাথায় রাখা জরুরি। যেকোন প্রাতিষ্ঠানিক কাজে বা গ্রুপ ওয়ার্ক বা ব্যক্তিগত জীবনে কাঙ্খিত সফলতা প্রাপ্তির পূর্বশর্তই হচ্ছে প্রথমে সঠিকভাবে সবার সাথে যোগাযোগ করার দক্ষতা অর্জন করা।

তথ্যসূত্র:

১. ফাউন্ডেশন অব হিউম্যান কমিউনিকেশন – শেখ এন্ড শাহ ।অনন্যধারা প্রকাশনী।

২. আত্নউন্নয়ন – বিদ্যুৎ মিত্র । সেবা প্রকাশনী।

https://www.mega888cuci.com