যশোর রোডের আর্তনাদ শুনবে কে!

দুই হাজার তিনশোরও বেশি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেগুলার বয়স একশো বছরেরও বেশি। যদিও, সর্বশেষ খবর হল, একটি রিট আবেদনের প্রেক্ষাপটে ছয় মাসের জন্য গাছ কাটার ওপর এ স্থগিতাদেশ দিয়েছে হাইকোর্ট।

সারা বাংলাদেশে এত প্রাচীন গাছ খুবই কম আছে। আর একসাথে এতগুলো শতবর্ষী গাছ আর কোথাও খুজে পাওয়া যাবেনা। বিশাল বিশাল আকাশ ছোয়া গাছগুলো কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভারতের সাথে যোগাযোগ এর জন্য চার লেন এর আধুনিক রাস্তা করার জন্য।

উন্নয়ন বলতে আসলে কি বোঝানো হয়? ঝকঝকে চকচকে ইট, টাইলস, গ্লাস, দামি লাইট? এগুলাই উন্নত? উন্নত মানেকি গাছ গাছালি কেটে পরিস্কার করে ফেলা? আমাদের সরকারি কর্মকর্তাগন উন্নত বলতে আসলে এটাই বুঝেন। যার মেধায় যতটুকু জোড় আরকি।

যশোর রোডের দুই হাজারেরও বেশি গাছ কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হয়েছে শুধু মাত্র চার লেনের রোড করার জন্য। গাছগুলোর বয়স শতবর্ষর বেশি। যে গাছগুলো পরিবেশ রক্ষায় বিশাল ভুমিকা রেখে চলেছে। ফারাক্কা বাধের ফলে দেশের এই অঞ্চলে যে পরিমান পরিবেশ বিপর্যয় হওয়ার কথা ছিলো তার অনেকটাই ঠেকিয়ে দিয়েছে এই গাছগুলো। কোনো প্রকার পরিবেশিক পরীক্ষা ও সমীক্ষা না করেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে কি কারণ?

এর চেয়ে বড় কথা এ রাস্তাটার সাথে আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধের অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে। বুক উচু করে সাক্ষি দেয় প্রতিটি ছোট, বড় ঘটনার। গাছগুলো হয়তো আজও সে রক্তের ঘ্রাণ পায়। অনেক মুক্তিযোদ্ধা ও তৎকালিক সময়ের মানুষ যারা মুক্তিযুদ্ধ সচক্ষে দেখেছেন তাদের বেশিরভাগই বেচে নেই। হয়তো আরও দশ বিশ বছর পর তারাও থাকবেনা। কিন্তু এই গাছগুলো সাক্ষী হয়ে থাকবে।

এই পথটা সে পথ যেখান দিয়ে হেঁটে হেঁটে লাখ লাখ মানুষ ভারতে গেছে আশ্রয়ের আশায়। এখান দিয়ে হেটে গেছে জীবন বাচানোর তাগিদে। হেটে যাওয়ার পথে এলোপাথাড়ি গুলির মাঝে কেউ দৌড়ে পালাতে পেড়েছে, কেউ গুলি খেয়ে মাটিতে পড়ে গিয়ে বাঁচার আর্তনাদ করেছে। কেউ গুলি খাওয়া অবস্থায় টেনে টেনে হেটেছে। বেচে থাকার শেষ চেষ্টা করেছে। কারও মাথায় গুলি লেগে মগজ ছিটকে ছিলো এই পথটাতেই। হাজার রক্তের দাগ। হাজার লাশ।

এ পথ দিয়েই শরণার্থী শিবিরে পৌছে দেওয়া হতো খাদ্য, বস্ত্র, ঔষধ। এ পথ ধরেই পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে আসতো বিদেশী প্রতিনিধিরা। এই পথ দিয়েই চলাচল করে বিদেশি সাংবাদিকরা রিপোর্ট করতেন। এই রাস্তা নিয়েই কবিতা হয়েছে। মার্কিন বিখ্যাত কবি অ্যালেন্স গিন্সবার্গ এই রাস্তা দিয়ে এসে আমাদের দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে তাঁর বুক কেপেছে।

এরপর দেশে ফিরেই এই নিয়েই কবিতা লিখেছেন। সে কিবতাকেই বিখ্যাত গায়ক বব ডিলান গানে রুপান্তরিত করে বাংলাদেশের পক্ষে কনসার্ট করে সারা বিশ্বর সমর্থন চেয়েছে আমাদের স্বাধীনতার জন্য। এ সব ঘটনার সাক্ষী এই গাছগুলো। বেশিরভাগই একশত সত্তর বছরের আগে। তখনকার জমিদার এর লাগানো গাছ। বৃটিশ আমল থেকে শুরু করে এখন পর্জন্ত হাজার হাজার ঘটনার সাক্ষী এই গাছগুলো।

আমি উন্নয়নের বিরোধী নই। কিন্তু এ কেমন উন্নয়ন? খুন কিভাবে উন্নয়ন হতে পারে? দুই হাজারেরও বেশি গাছ খুন করা হচ্ছে। শুধু মাত্র চার লেন এর রাস্তা করার জন্য। এ গাছগুলো না কেটে কি কোনো বিকল্প উপায় বের করা যেত না? যেত তো। কলকাতায় তো করা হয়েছে। এক পাশের গাছগুলোকে তারা মাঝখানে রেখে আরেক পাশ দিয়ে নতুন রাস্তা করে দুই দুই চার লেনের রাস্তা করেছে। তবে আমাদের দেশে গাছগুলো কেনো কাটতে হবে? বরং আমাদেরতো উচিৎ ছিলো এই রাস্তার দুই পাশেই আলাদা নতুন দুটো রাস্তা করা। দুই দুই চার লাইনের রাস্তা। যাত্রিরা যাওয়া আসার সময় দুই পাশ থেকে এই রাস্তা ও গাছগুলোকে দেখতো। ইতিহাস জানতো।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মুক্তিযুদ্ধ ও বড় ঘটনাগুলোর সাক্ষী এমন গাছগুলো কে তারা বিভিন্ন নাম দিয়ে যত্ন করে বাচিয়ে রাখছে। আর আমাদের দেশে কেনো কেটে ফেলা হচ্ছে? আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া, তুরস্ক, মিশর সহ অনেক দেশে কোথাও উইটনেস অন্য নাম দিয়ে রাখছে গাছগুলোর সাথে। মানুষকে জানার আগ্রহ জাগিয়ে তুলছে। যত্ন করে বাচিয়ে রাখতে চেষ্টা করছে।

সাধারণ জনগণকে বলতে চাই গাছগুলো রক্ষায় এগিয়ে আসুন। গাছ আমাদের দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে চলেছে। ঝড়, বন্যা, বৃষ্টিসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাচিয়ে রাখছে এ গাছগুলো। আজ এগুলো রক্ষা করতে না পারলে আগামীতে নিজের মাথা নিজে ফাটিয়ে ফেললেও লাভ হবেনা।

https://www.mega888cuci.com