মিষ্টি হাসির সেই মেয়েটি

যার মেঘ কালো চুল, হরিণীর চোখ, কণ্ঠটি গানের বীনা – নব্বই দশকের অষ্টাদশী সেই মেয়েটি নাম লেখালেন চলচ্চিত্রে। প্রথম সিনেমাতেই বাজিমাৎ, চারিদিকে আলোড়ন তুললেন। এরপর শুধু এগিয়ে যাওয়া, বাংলা চলচ্চিত্রে নিজের একটা আলাদা সত্তা করে তোলেন।

সেলুলয়েডের পর্দায় তিনি যেমন স্নিগ্ধ ‘রেশমী’ হয়ে মুগ্ধ করেছেন, তেমন মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষায় নারী ‘সখিনা’ থেকে এইচ আই ভি আক্রান্ত ‘মেঘলা’ হয়ে নিজেকে পরিক্ষীত করেছেন। শরৎ বাবুর ‘চন্দ্রমুখী’ হউক কিংবা কবি নজরুলের ‘মেহেরনেগার’ সব চরিত্রেই নিজেকে মেলে ধরেছেন। গ্রাম বাংলায় তিনি খ্যাত খায়রুন সুন্দরী নামে, তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের অত্যন্ত জনপ্রিয় নায়িকা প্রিয়দর্শিনী ‘মৌসুমী’।

১৯৯১ সালে লাক্স ফটোজনিক সুন্দরী প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে ব্যাপক সাড়া জাগিয়ে, মডেলিং জগতে বেশ জনপ্রিয় হন আরিফা পারভিন জামান মৌসুমী। বলিউডের জনপ্রিয় সিনেমা কেয়ামত সে কেয়ামত তাক-এর অফিশিয়াল রিমেক ‘কেয়ামত থেকে কেয়ামত’ এ অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে নাম লেখান। সাথে ছিলেন সালমান শাহ। ছবিটির ব্যাপক সাফল্যের পর নিজের নামে একটি ছবিতে অভিনয় করেন, যা বাংলা চলচ্চিত্রে বিরল ঘটনা। একই বছর এই ছবি দুটির সাথে যুক্ত হয় আরেকটি সফল ছবি ‘দোলা’।

মৌসুমী পার করেছিলেন সুবর্ণ সময়, একে একে মুক্তি পায় বিদ্রোহী বধূ, আত্ম অহংকার, দেনমোহর, অন্তরে অন্তরে, বিশ্বপ্রেমিক, আত্বরক্ষা, হারানো প্রেম, লাট সাহেবের মেয়ে, লুটতরাজসহ বহু বাণিজ্যিক সফল ছবি। নব্বই দশকের শেষে ইতিহাস সৃষ্টিকারী ছবি ‘আম্মাজান’-এ অভিনয় করেন। বাংলা চলচ্চিত্রে জায়গা করে নেন শীর্ষ নায়িকার স্থান। বলিউডের অফার পেয়েও ফিরিয়ে দিয়েছিলেন বলে শোনা যায়।

নব্বই দশকের সাফল্যের রেশে পরের দশকে কষ্ট, মেঘলা আকাশ, ইতিহাস, আজ গায়ে হলুদ, দুই বধূ এক স্বামী, মুখোমুখির পর ‘খায়রুন সুন্দরী’র মত ব্যাপক সাড়া জাগানো ছবি, এর ঠিক পরের বছরেই ‘মোল্লা বাড়ির বউ’-এর মত আরেকটি বাণিজ্যিক সফল ছবি। অশ্লীলতার সময়ে এই ছবি দুটি ছিল সুবাতাস।

‘মাতৃত্ব’ ছবিতে অভিনয় করে বেশ প্রশংসিত হন। একই বছর অভিনয় করেন ‘মেহেরনেগার’ ছবিতে। এই দশকে তাঁর অন্যান্য ছবিগুলোর মধ্যে বিন্দুর ছেলে, মায়ের মর্যাদা, জীবনের গল্প, আমি জেল থেকে বলছি, শত্রু শত্রু খেলা, এক বুক জ্বালা, তুই যদি আমার হইতিরে, একজন সঙ্গে ছিল, স্বপ্নপূরন, সাহেব নামে গোলাম অন্যতম।

এই দশকে এসেও তিনি বেশ সমুজ্জ্বল। ‘গোলাপী এখন বিলেতে’র পর ‘প্রজাপতি’, ‘দেবদাস’ ও ‘এক কাপ চা’ ছবিতে অভিনয় করে বেশ আলোচিত হন। এখনো কাজ করে যাচ্ছেন, হাতে রয়েছে বেশ কয়েকটি ছবি।

অভিনয়ের বাইরে পরিচালনাতেও নিজেকে যুক্ত করেছেন। ‘কখনো মেঘ কখনো বৃষ্টি’ ও ‘মেহেরনেগার’ তাঁরই নির্মিত ছবি। প্রযোজনাও করেছেন একাধিক ছবি। মডেলিয়ের বাইরে বেশ সংখ্যক নাটকেও অভিনয় করেছেন এর মধ্যে আড়াল, এক জনমে, ভাগফল, নিম্নচাপ, দ্বিধা অন্যতম। গায়িকা হিসেবেও সুপরিচিত, গানের অ্যালব্যামও বেরিয়েছিল, জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ইত্যাদিতে গানও গেয়েছেন।

বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে পেয়েছেন তিনটি জাতীয় পুরস্কার,এছাড়া পেয়েছেন মেরিল প্রথম আলো পুরস্কার, বাচসাস পুরস্কারসহ বহু পুরস্কার। এই বর্নিল ক্যারিয়ারে কিছু দাগও রয়েছে,শুরুটা যেভাবে সমুজ্জ্বল হয়েছিল,পরবর্তীতে সেটা আর সেভাবে আর যায়নি, অশ্লীল সিনেমায় জড়িয়েছেন, জাতীয় পুরস্কারে নিজেকে বিতর্ক করেছেন, এখনো সুনির্বচনীয় হতে পারেননি।

তবে সব কিছু ছাপিয়ে নিজেকে আরো বর্ণিলতর করবেন এই আশা রাখি। ব্যক্তিজীবনে বিয়ে করেছেন নায়ক ওমর সানীকে, সংসারে রয়েছে দুই সন্তান। বিভিন্ন সমাজ সচেতনতা মূলক কাজেও যুক্ত হয়েছেন।

মৌসুমীর জন্ম ১৯৭৩ সালের তিন নভেম্বর। আজ এতগুলো বছর কেটে গেলেও তিনি আছেন একদম প্রথমদিনটার মতই চিরতরুণী। তাঁর জন্য রইলো শুভকামনা।

https://www.mega888cuci.com