মিরপুর যেভাবে হয়েছিল ‘হোম অব ক্রিকেট’

মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস করতে নামলেন শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের দুই অধিনায়ক অ্যাঞ্জেলো ম্যাথুস ও গ্রায়েম ক্রেমার। সংগঠিত হলো টস যেখানে ম্যাথুস জয় লাভ করে ফিল্ডিংয়ের সিদ্ধান্ত নিলেন।

ব্যস, ইতিহাস গড়ার একেবারে দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল স্টেডিয়ামটি।

আর ম্যাচে সুরঙ্গ লাকমাল প্রথম বলটি করার সাথে সাথে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়ে বসে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। কারণ চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজে শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার ম্যাচটি মাঠে গড়ানোর মাধ্যমেই যে সবচেয়ে কম সময়ে ১০০টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করার মাইলফলক স্পর্শ করে ফেলে বাংলাদেশের ‘হোম অব ক্রিকেট’ খ্যাত এই স্টেডিয়াম।

২০০৬ সালের ৮ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক ভেন্যু হিসেবে প্রথম আত্মপ্রকাশ করে শেরে বাংলা স্টেডিয়াম। বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার একদিনের ম্যাচ দিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পথচলা শুরু এই ক্রিকেট স্টেডিয়ামের। সেই শুরুর দিন থেকে অদ্যাবধি কেটে গেল এগারোটি বছর। এ সময়টাতে দেশি-বিদেশি কতই না ব্যাটসম্যানের ব্যাটিং দাপট দেখেছে স্টেডিয়ামটি! ৩৫ জন ব্যাটসম্যানের ৪৬টি শতক হাকানো ইনিংসের সাক্ষী হয়ে আছে মিরপুরের এই স্টেডিয়াম। ব্যাটসম্যানদের শতকের সাক্ষী হতে হতে এবার ‘শতকে’র হাতছানি দাঁড়ায় খোদ স্টেডিয়ামটির সামনে যা কিছুক্ষণ আগে পূরণ হয় শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচটির খেলা শুরু হওয়ার মাধ্যমে।

বর্তমানে ১০০টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করা স্টেডিয়ামের সংখ্যা ৬, যার মধ্যে সবচেয়ে কম সময়ে ‘শতক’ হাকানোর কীর্তি শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামের। এ কৃতিত্ব অর্জন করতে স্টেডিয়ামটির সময় লাগে ১১ বছর। এর আগে ১০০ বা তারও বেশি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজন করা স্টেডিয়ামগুলো হচ্ছে শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়াম (দুবাই), মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (মেলবোর্ন), সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড (সিডনি), আর. প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম (কলম্বো) ও হারারে স্পোর্টস ক্লাব (হারারে)।

এর মধ্যে ‘শতক’ হাকাতে সবচেয়ে বেশি ২৮ বছর সময় নেয় অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এমসিজি)। ২৩ বছর সময় নিয়ে প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম, ২০ বছর সময় নিয়ে সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড (এসসিজি), ১৮ বছর সময় নিয়ে হারারে স্পোর্টস ক্লাব ও ১২ বছর সময় নিয়ে শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়াম আছে এর পরের স্থানগুলোতে। এই স্টেডিয়ামগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ আয়োজন করার রেকর্ড সংযুক্ত আরব আমিরাতে অবস্থিত শারজাহ ক্রিকেট স্টেডিয়ামের। বিশ্বের একমাত্র ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে ‘দ্বিশতক’ হাকানো এই স্টেডিয়ামটি এখন পর্যন্ত ম্যাচ আয়োজন করেছে ২৩১টি। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ১৫৪টি ম্যাচ আয়োজন করেছে অস্ট্রেলিয়ার এসসিজি। পরের তিনটি স্থান দখল করে আছে যথাক্রমে এমসিজি (১৫০), হারারে স্পোর্টস ক্লাব (১৪০) ও আর. প্রেমাদাসা স্টেডিয়াম (১৩১)।

দ্রুততম ‘শতক’ হাকিয়ে ইতিহাসে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের জায়গা করে নেয়ার কীর্তিতে অবশ্য দেশের ক্রিকেটপ্রেমিদের মাঝে আনন্দের চেয়ে হতাশা বেশি কাজ করছে। এ স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ খেলা জিম্বাবুয়ে শততম ম্যাচেও খেলার সুযোগ পেয়েছে। কিন্তু প্রথম ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ ও স্বাগতিক বাংলাদেশ আজ এই ইতিহাসের সাক্ষী হওয়া থেকে বঞ্চিত যা হতাশার পাশাপাশি ক্ষোভ সৃষ্টি করছে দেশের লক্ষ-কোটি ক্রিকেটভক্তের মাঝে। তাদের এই ক্ষোভ সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) ওপর এবং সেটা সঙ্গত কারণেই। শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের মাইলফলকে পৌঁছে যাওয়ার  দিনে বাংলাদেশের মাঠে না নামার পেছনে দায়টা পুরোপুরি বিসিবির।

চলমান ত্রিদেশীয় সিরিজের সূচী তৈরি করেছে বিসিবি। অথচ স্টেডিয়ামটির শততম ম্যাচের দিন বাংলাদেশের খেলা রাখেননি তাঁরা। এতে করে ক্রিকেট আর্কাইভ সংরক্ষণে বিসিবির কর্মকাণ্ড হচ্ছে প্রশ্নবিদ্ধ। শ্রীলঙ্কা ও জিম্বাবুয়ের মধ্যকার আজকের ম্যাচটি যে মিরপুর স্টেডিয়ামের শততম ম্যাচ হতে যাচ্ছে তা সূচী তৈরি করার সময় হয়ত মাথায়ই ছিল না বিসিবি কর্মকর্তাদের। অন্যথায় এমন একটি সাফল্যমণ্ডিত ও আন্দনঘন উপলক্ষ্য বাংলাদেশকে উদযাপন করার সুযোগ করে দিতেন তাঁরা। মূলত বিসিবির অদূরদর্শিতাই শেরে বাংলার ‘শতক’ হাকানোর দিনটাকে নিজেদের রঙে রাঙিয়ে তোলা  থেকে দূরে ঠেলে দিয়েছে মাশরাফি-সাকিবদের।

২০০০ সালে টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ঢাকায় বাংলাদেশের সব ম্যাচই অনুষ্ঠিত হতো বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে। শুধু তাই নয়। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যাত্রালগ্ন থেকেই সকল ম্যাচ আয়োজিত হতে থাকে ঐতিহ্যবাহী এ স্টেডিয়ামে। তখন ফুটবল, ক্রিকেট দুই-ই খেলা হতো বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। গ্রীষ্মকালে ফুটবল আর শীতকালে ক্রিকেট নিয়মকরে আয়োজন করা হতো। ১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জেতার পর থেকে এ দেশে ক্রিকেটের জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশ ইতিহাসের প্রথম টেস্ট ম্যাচ খেললে দেশে জনপ্রিয়তার তুঙ্গে ওঠে যায় ক্রিকেট।

তখন বেশকিছু ক্রিকেট টুর্নামেন্ট আয়োজন করার প্রয়োজন অনুভব করে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড। কিন্তু একই ভেন্যুতে বছরের একটা সময়জুড়ে ফুটবল ও আরেকটা সময় ক্রিকেট আয়োজন করার প্রথার দরুন তা প্রায় অসম্ভব হয়ে ওঠে। এজন্য একটা সময় ক্রিকেট বোর্ড ও ফুটবল ফেডারেশনের মধ্যে বেশ দ্বন্দ্বেরও সৃষ্টি হয়। অতঃপর ২০০৪ সালে সরকারের হস্তক্ষেপে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামকে একমাত্র ক্রিকেট খেলার জন্য ব্যবহার করার সবুজ সংকেত পায় বিসিবি। এর আগে মূলত অ্যাথলেটিকস ও ফুটবল খেলা হতো সেখানে।

১৯৮০ সালে ফুটবলের জন্য নির্মিত হয় তৎকালীন মিরপুর স্টেডিয়াম যা পরবর্তীতে দেশের প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নামে নামাঙ্কিত করা হয়। তারপর ২০০৪ সালে সরকারের নির্দেশে একে ক্রিকেটের জন্য ব্যবহারযোগ্য করে গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। স্টেডিয়াম পুনঃনির্মাণের সময় তিনফুট মাটি খুড়ে অ্যাথলেটিকস ট্র্যাক ওঠিয়ে ফেলা হয়, মূল উইকেট থেকে বাউন্ডারি লাইন পর্যন্ত আউটফিল্ড ২৯ ইঞ্চি ঢালু করা হয়, বৃষ্টির পানি বাইরে সরিয়ে দেয়ার জন্য মাটির গভীরে পিভিসি পাইপ বসানো হয় এবং ফ্ল্যাডলাইট স্থাপন করা হয়।

এরপর ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপকে সামনে রেখে পুনরায় ঢেলে সাজানো হয় এই স্টেডিয়ামকে। ২৬ হাজার দর্শক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন গ্যালারিতে বসানো হয় প্লাস্টিকের সিট ও গ্যালারির ওপর ছাউনি, প্রেসবক্সের আসনসংখ্যা বাড়ানো হয়, উন্নত ফ্ল্যাডলাইট বসানোর পাশাপাশি একটি ইলেকট্রিক স্কোরবোর্ড এবং একটি দানবীয় পর্দা স্থাপন করা হয় স্টেডিয়ামটিতে। সেসময় শেরে বাংলা স্টেডিয়ামকে বিশ্বের অন্যতম উন্নত ক্রিকেট স্টেডিয়াম হিসেবে দাঁড় করায় বিসিবি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান কার্যালয়ও এই স্টেডিয়ামেই অবস্থিত। তাছাড়া এখানে রয়েছে একটি জিমনেশিয়াম, একটি অ্যাকাডেমি মাঠ, একটি ইনডোর এবং দুটি বড় ও অত্যাধুনিক ড্রেসিংরুম।

২০১১ ক্রিকেট বিশ্বকাপ, ২০১৪ টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ও ২০১২,২০১৪,২০১৫ সালে টানা তিনবার এশিয়া কাপ আয়োজনের মুন্সিয়ানা ইতোমধ্যে দেখিয়ে ফেলেছে শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়াম। ভিনদেশি শচিন টেন্ডুলকারের ক্যারিয়ারের শততম শতকটিরও সাক্ষী এ স্টেডিয়াম। ২০০৬ সালে যাত্রা শুরুর পর থেকে বহু আনন্দ-বেদনার কাব্য রচিত হয়েছে মিরপুরের সবুজ গালিচায়। এখানকার প্রতিটি ঘাস সাক্ষী হয়ে রয়েছে বাংলাদেশের এক-একটি বীরোচিত জয়ের। এ মাঠেই ২০১০ সালে বাংলাদেশ প্রথমবারের মত বড় কোন দল হিসেবে নিউজিল্যান্ডকে ধবলধোলাই করে, ২০১৩ সালে একই প্রতিপক্ষকে টানা দ্বিতীয়বারের মত ধবলধোলাই করার সিরিজের প্রথম দুটি জয় এখানেই পায় তাঁরা।

তাছাড়া ২০১২ ও ২০১৪ এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলা, ২০১৫ সালে পাকিস্তানকে ধবলধোলাই করার পাশাপাশি ভারত ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পাওয়া সিরিজ জয়ের সিংহভাগ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় মিরপুরের শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে। ২০১৪ সাল থেকে ঘরের মাঠে জেতা বাংলাদেশের টানা ৬টি ওয়ানডে সিরিজের অধিকাংশই অনুষ্ঠিত হয় এখানে। টেস্টের দিকে একটু তাকালে দেখা যায় এ মাঠেই ইংল্যান্ডকে হারিয়ে টেস্ট সাবালকত্বে বাংলাদেশের প্রবেশ ঘটে। পরবর্তীতে টেস্টে অস্ট্রেলিয়াবধও এখানেই মঞ্চায়িত হয়।

মিরপুরে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের অংশীদার হওয়া এইসব সাফল্য ও আনন্দের বিপরীতে অবশ্য রয়েছে কিছু লজ্জা ও হৃদয়ভাঙ্গার গল্প। ২০১১ বিশ্বকাপে এখানেই ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫৮ ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৭৮ রানে অলআউট হয়ে গ্রুপপর্ব থেকে বিদায় নেয় বাংলাদেশ। ২০১৪ সালে একই ভেন্যুতে ভারতের বিপক্ষে ১০৬ রান তাড়া করতে নেমে আবারো ৫৮ রানে অলআউট হওয়ার লজ্জায় পড়ে তাঁরা। আর ২০১২ সালের এশিয়া কাপ ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে মাত্র ২ রানের হারে মাঠে সাকিব-মুশফিক-বিজয়-নাসিরদের মত গ্যালারিতে থাকা অসংখ্য ক্রিকেটপাগল মানুষের কাঁদার হৃদয়বিদারক দৃশ্যেরও মঞ্চায়ন ঘটে এই স্টেডিয়ামেই।

বাংলাদেশ ক্রিকেটের আঁতুড়ঘর ও পয়মন্ত ভেন্যু হিসেবে পরিচিত শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে খেলা ৮৭টি একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের মধ্যে বাংলাদেশ জয় পেয়েছে ৪০টিতে, হেরেছে ৪৫টি ম্যাচ আর ২টি ম্যাচ অমীমাংসীত। আজ একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ আয়োজনে শতক হাকানোর তকমা লেগেছে শেরে বাংলা স্টেডিয়ামের গায়ে। সামনে আরো অসংখ্য ম্যাচ আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে অসংখ্য জয় উপহার দিতে নিশ্চয়ই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে এ স্টেডিয়াম।

বরাবরের মত এবারও স্টেডিয়ামটির সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। লক্ষ্য এখন ‘দ্বিশতক’ হাকানো। তবে এর জন্য প্রয়োজন মাঠটির সঠিক ও সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণ যার দায়িত্ব সম্পূর্ণ বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের। তাঁরা যদি এ দায়িত্ব সফলতার সাথে পালন করে যেতে পারেন তাহলে ‘দ্বিশতক’ কেন, একদিন হয়ত ‘ত্রিশতক’ও হাকাবে আমাদের সবার প্রিয় ‘হোম অব ক্রিকেট’।

https://www.mega888cuci.com