মার্বেল প্যালেস: গোপন প্রাসাদের গুপ্ত রহস্য

‘সাহেব বিবি গোলাম’-এ ভূতনাথ এই প্রাসাদ বাড়ির সামনে ছ’ঘন্টা অপেক্ষা করে প্রবেশাধিকারের অনুমতি পেয়েছিল। কলকাতার সেরা গ্ল্যামারাস ঐতিহাসিক স্থান। যেখানে এখনও প্রবেশাধিকার আমজনতার জন্য নয়।

উত্তমকুমার এই বাড়িতেই দিনের পর দিন শ্যুট করেছিলেন। উত্তম সুমিত্রা দেবী ছবি বিশ্বাস ছায়া দেবী অভিনীত ‘সাহেব বিবি গোলাম’ ছবির শ্যুট এই বাড়িতেই হয়।স্বর্ণযুগের বাংলা ছবি যেগুলো রাজা জমিদারদের নিয়ে সেগুলোর অনেক শ্যুটিং এই বাড়িতে হয়েছে।

আমার ‘মার্বেল প্যালেস’ দেখার অভিজ্ঞতা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আক্ষরিক অর্থেই অর্নিবচনীয় মহিমা।

গাইড যা বললো তাই লিখছি – ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের রাজধানী কলকাতা একসময় পরিচিত ছিল প্রাসাদ-নগরী হিসেবে। সপ্তদশ শতকে ইংরেজ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির উদ্যোগে হুগলী নদীর তীরে গড়ে ওঠে কলকাতা শহর। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনামলে রাজধানী কলকাতায় ধনী জমিদার ও অভিজাত বাঙালিরা গড়ে তোলেন অসংখ্য সুরম্য ভবন, প্রাসাদ ও বাগান বাড়ি।

এমনি একটি সুরম্য প্রাসাদ হলো মার্বেল প্যালেস।  বিখ্যাত বাঙালি ব্যবসায়ী ও জমিদার নীলমণি মল্লিকের দত্তকপুত্র ছিলেন রাজেন্দ্র। নীলমণি মল্লিক উত্তর কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রিটে তাঁর বসতবাড়িতে জগন্নাথদেবের মন্দির নির্মাণ করেন। মার্বেল প্যালেসের অন্দর মহলের প্রাঙ্গণে মন্দিরটি এখনো রয়েছে।

এই ৪৬ নম্বর মুক্তারামবাবু স্ট্রিটেই রাজেন্দ্র মল্লিক গড়ে তোলেন অসাধারণ সৌন্দর্যমন্ডিত মার্বেল প্যালেস। ১৮৩৫ সালে এই প্যালেস নির্মিত হয়। তিনিও আসলে জমিদার ছিলেন। বিপুল সম্পত্তি ও আভিজাত্যর জন্য রানী ভিক্টোরিয়া তাকে রাজা উপাধি দেন। ঊনবিংশ শতাব্দীতে কলকাতায় গড়ে ওঠা ভবনগুলোর মধ্যে মার্বেল প্যালেস তার সৌন্দর্য ও শিল্প সম্ভারের জন্য অত্যন্ত বিখ্যাত।

আরেকটি কারণে এই প্রাসাদ বিখ্যাত। এই মল্লিক বাড়ির উদ্যানেই গড়ে উঠেছিল কলকাতার প্রথম চিড়িয়াখানা। আলিপুর চিড়িয়াখানারও আগে। রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক তাঁর স্ত্রীর আবদারে এই চিড়িয়াখানা তৈরী করেন। এখানকার বহু পাখি আলিপুর চিড়িয়াখানাকে দান করা হয় যখন আলিপুর চিরিয়াখানা প্রথম হয়।

চিড়িয়াখানা বলতে মনে পড়ল, মিঠু মুখার্জ্জী, রঞ্জিত মল্লিক অভিনীত ‘স্বয়ংসিদ্ধা’ ছবির শ্যুট এই বাড়ির চিড়িয়াখানায় হয়। মান্না দে-র একটা গান ছিল ‘কিচিমিচি কিচিমিচি’ রঞ্জিত মল্লিকের লিপে পাখি হরিন ময়ূর দের সঙ্গে গানটা ছিল। সঙ্গে ছিলেন ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় রত্না ঘোষালরা।

সিনেমায় দেখানো চিড়িয়াখানা আসলে মার্বেল প্যালেস-এর এই চিড়িয়াখানা। এছাড়াও মিঠু মুখার্জ্জী যখন বিয়ের পর ঘোড়ার গাড়ী করে এসে যে বিশাল দরজা দিয়ে ঢুকবেন সেটাও এই বাড়িতেও শ্যুট আরও অনেক দৃশ্য।

রক গার্ডেন, কৃত্রিম হ্রদও দেখলাম। চোখ ঝলসানো অন্দরমহল, নাচঘর (বাঈ নাচ/বল ড্যান্স রুম আলাদা আলাদা), সঙ্গীত মহল, অজস্র বিদেশি পাখি, ভারতের প্রথম পিয়ানো, বেলজিয়াম আয়না মহল, ঝাড় দেখে আমি এখনও ঘোরের মধ্যে আছি। রানী ভিক্টোরিয়ার যৌবনরূপী বৃদ্ধারূপী মুর্তি দেখলাম।

মল্লিক বাড়ি নামে সর্বসাধারণের কাছে পরিচিত এই মার্বেল প্যালেস কিন্তু এখনো ব্যক্তিগত সম্পত্তি । রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক বাহাদুরের উত্তরাধিকারীরা এখনো এই প্রাসাদে বাস করছেন । দর্শনার্থীরা শুধু ভবনটির একটি অংশেই ঢুকতে পারেন ।প্রাসাদের অন্দরমহলে এবং প্রসাদের ভিতরে অবস্থিত জগন্নাথদেবের মন্দিরে ঢোকার অধিকার তাদের নেই।

দর্শনার্থীদের সেখানে যাওয়ার উপায়টাও সহজ নয়। যেতে হলে ২৪ ঘণ্টা আগে পশ্চিম বঙ্গের ট্যুরিজম ইনফরমেশন ব্যুরোর অনুমতি লাগবে। যাওয়া যাবে কেবল সকাল দশটা থেকে বিকাল তিনটার মধ্যে, সোমবার ও বৃহস্পতিবার ছাড়া। গেলেও ভেতরের ছবি তোলা বারণ!

https://www.mega888cuci.com