মানুষের চিড়িয়াখানা: সভ্য সমাজের অসভ্য-অমানবিক উপাখ্যান

খুব বেশিদিন আগের কথা নয়, যখন ফ্রান্স, বেলজিয়াম কিংবা জার্মানির মত আধুনিক পশ্চিমা দেশে মানুষদের খাঁচায় আটকে রাখা হত স্থানীয়দের প্রদর্শণীর জন্য। চিড়িয়াখানায় যেমন বন্য জন্তুদের আটকে রাখা হত, ঠিক একই ভাবেই আটকে রাখা হত মানুষদের। আবার তাদেরই দেখতে আসতো তথাকথিত সভ্য মানুষরা।

শুনতে ভুতুড়ে শোনালেও এটাই সত্যি। মানুষের চিড়িয়াখানা ছিল আঠারো শতকের শেষভাগের ইউরোপিয়ানদের পছন্দের বিনোদন কেন্দ্রগুলোর একটি। ১৮৮৯ সালে প্যারিসে একটা বৃহৎ মেলার আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে আসে প্রায় ১৮ মিলিয়ন মানুষ। প্রদর্শণীর জন্য রাখা হয় চারশতাধিক আফ্রিকান ও অস্ট্রেলিয়ান-এশিয়ান আদিবাসী মানুষকে। নগ্ন কিংবা অর্ধনগ্ন অবস্থায় তাদের রাখা হত খাঁচায়। বলাই বাহুল্য, তাদের সাথে ঠিক পশুর মত ব্যবহারই করা হত।

১৮ শতকের শেষ ভাগ থেকে ১৯ শতকের মধ্যভাগ অবধি মানুষের চিড়িয়াখানা গোটা ইউরোপজুড়ে খুব বিখ্যাত ছিল। এমনকি এই চর্চাটা ছড়িয়ে পড়েছিল উত্তর আমেরিকাতেও।

ওটা বেঙ্গা

১৯০৬ সালে নিউ ইয়র্ক শহরের ব্রঙ্কস চিড়িয়াখানায় ওটা বেঙ্গা নামের এক কঙ্গোলিজ নারীর প্রদর্শণী হয়। সেখানে বেঙ্গাকে পশুদের সাথে খাঁচায় ছুড়ে ফেলা হয়। এমনকি তাকে উল্লুক ও ওরাংওটাংয়ের সাথে লড়াই করতেও বাধ্য করা হয়। যখন তার সাথে কোনো জন্তু থাকতো না, তখন তীর-ধনুক নিয়ে কসরত করতে দেখা যেত তাকে। রীতিমত অমানবিক এক কাজ!

এই বিষয়টা সে আমলে নিগ্র জনগোষ্ঠীর ভেতরে খুব সমালোচিত হয়েছিল। আফ্রিকানরাও ক্ষেপে গিয়েছিলেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবরে বলা হয়, ‘মানুষকে প্রদর্শণীর জন্য খাঁচায় আটকে রাখা, বানরের সাথে থাকতে দেওয়ার কড়া সমালোচনা করেছেন কেউ কেউ।’

যদিও, সাধারণ মানুষের কোনো আপত্তি ছিল না এতে। আজকের মানুষ যেমন শুনেই আঁৎকে উঠেছেন, তেমনটা ঘটেনি ওই সময়। বরং, তারা খুব স্বাভাবিক ভাবেই নিয়েছিলেন বিষয়টাকে। তবে, লন্ডনে কালো মানুষদের এমন একটি প্রদর্শণী বাতিল হয়ে গিয়েছিল বর্ণবাদের অভিযোগে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর আস্তে আস্তে মানুষের চিড়িয়াখানাগুলো বন্ধ হয়ে যেতে শুরু করে। শুনতে হাস্যকর শোনালেও এটাই সত্যি যে পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে নৃশংস শাসকদের একজন জার্মানির অ্যাডলফ হিটলার ছিলেন মানুষের চিরিয়াখানা নিষিদ্ধ করাদের একজন।

মানুষের চিড়িয়াখানায় দর্শনার্থীদের ভিড়

এত কিছুর পরও বেলজিয়ারের সিরকায় ১৯৫৮ সালে সর্বশেষ মানুষের প্রদর্শণী হয়েছিল। খুব বেশিদিন আগের কথা কি? সভ্য সমাজের বাসিন্দারাই তাদের দৃষ্টিতে অসভ্যদের চিড়িয়াখানায় এনে রাখতেন নিজেদের বিনোদনের জন্য। এতেই প্রমাণিত হয় নিজেদের সভ্য বলে দাবি করলেও আসলে তারা মোটেও তা ছিলেন না!

– বিবিসি, ডেইলি মেইল ও এক্সপোজিং ট্রুথ অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com