বিপিএল ও ‘গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল’ সমাচার

আগের আসরগুলোর মতো এবারও অসংখ্য প্রত্যাশার মোমবাতি জ্বালিয়ে শুরু হয়ে গেছে বিপিএল ২০১৭। নতুন মুখ, নতুন প্রতিভার আবির্ভাব বুঝি এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র! কিন্তু সময় বড্ড বেরসিক, অপেক্ষার প্রহর গুনতে গুনতে নতুন করে আপনাকে নামতা শিখিয়ে ছাড়বে, তবু নতুন মুখের সন্ধান আপনাকে দেবে না। কিন্তু কেন?

এই ‘কেন’ শব্দটা বাংলাদেশ ক্রিকেটকে ঘিরে রেখেছে সেই সূচনা লগ্ন থেকে। উত্তরটাও কিন্তু অজানা নয়, তবে সমাধানেই রাজ্যের সমস্যা। এই যে বিপিএল থেকে কোন নতুন খেলোয়াড় উঠে আসে না, সেটার দায় কি বিপিএলের? প্রশ্নটির সোজাসাপ্টা উত্তর হচ্ছে ‘না’। আপনি বিপিএলের সম্প্রচার, প্রচার অথবা মানসহ হাজারো বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেন, কিন্তু নতুন খেলোয়াড় উঠে না আসার পেছনে বিপিএলকে দায়ী করতে পারেন না। কিন্তু কেন দায়ী করতে পারেন না?

বাংলাদেশের ক্রিকেট কাঠামোকে যদি আপনি ষ্টেজ ওয়াইজ ভাগ করেন, তাহলে বিপিএল হচ্ছে লাস্ট ষ্টেজ বা শেষ ধাপ। এই ধাপে এসে আপনি কোন প্রতিভাকে নার্সার করতে পারবেন না। বরং নার্সার হয়ে আসা খেলোয়াড়রা এখানে তাদের প্রতিভা দেখাবে। কিন্তু তবুও কেন তেমন প্রতিভা উঠে আসছে না? কারণটা হচ্ছে, তেমন প্রতিভা আমাদের দেশে নেই! আই রিপিট, সর্বোচ্চ লেভেলের প্রতিভা আমাদের দেশে নেই! আপনি দ্বিমত পোষণ করতে পারেন, কিন্তু এতে সত্য উল্টে যাবে না।

জাতীয় দলের খেলোয়াড় বাদে, জেলা পর্যায় থেকে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট পর্যন্ত একটা খেলোয়াড়ের নাম বলুন যাকে আপনার বিশ্বমানের মনে হয়। উদাহরণ হিসেবে উপমহাদেশের কথাই টেনে আনি, ঋষাভ পান্ট নামে ভারতের তরুণ যে উইকেটরক্ষক আছেন, তার মানের একটা খেলোয়াড়ও কি আমাদের ঘরোয়া লিগে আছে? নিরপেক্ষ জায়গা থেকে দেখলে উত্তরটা নেগেটিভই হবে। ১৮ বছর টেস্ট ক্রিকেট খেলা একটি দেশে অন্য দেশের বি গ্রেড সমমানের ক্রিকেটার কেন থাকবে না সেটা মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন হয়ে গেল। কিন্তু কেন নেই?

নেই, কারণ চর্চা এবং লালনের অভাব। লোহা গরম থাকতে যদি শেপে না আনা হয়, তাহলে সেটা দিয়ে অস্ত্র তৈরি করা যায় না। আমাদের ক্রিকেটে প্রতিভা নামক লোহা ঠাণ্ডা অবস্থায় সর্বোচ্চ পর্যায়ে আসে, ফলে সেটাকে ঘষামাজা করে খুব বেশি হলে প্রস্তর যুগের ভোঁতা অস্ত্র বানানো যায়। উদাহরণ, তাসকিন আহমেদ! জেলা বা থানা পর্যায়ে যখন কোন কিশোর তার প্রতিভা নিয়ে আসে, তখন তাকে লালন করার জন্য বিশেষ কোন ফ্যাসিলিটি কি আছে? বিশেষ শব্দটা বাদ দিন, সাধারণ মানের কোন ক্রিকেট সুবিধাই তো নেই জেলা শহর গুলোতে। না আছে ভালো মানের কোচ, না আছে ভালো মাঠ। ম্যাট অথবা পাকা পিচের উপর নিজেদের টাকায় কেনা বল দিয়ে টুক টুক করলে কি আর বিরাট কোহলি বের হবে? মুস্তাফিজ, মিরাজরা উঠে এসেছে ভাগ্যক্রমে, এতেই তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলুন মশাই।

এই জেলা পর্যায় থেকে কোনক্রমে ৫ জন হয়ত আরও একধাপ উপরে উঠে বিভাগীয় পর্যায়ে চলে আসে এবং সাথে করে নিয়ে আসে অসংখ্য ভুল টেকনিক। বিভাগীয় পর্যায়ে নামকাওয়াস্তে কোচ আছেন, তারা ঘষামাজা করে কোনমতে প্রথম শ্রেনি খেলার মতো অবস্থায় তাদেরকে পৌঁছে দেয়। এরপর নিজেদের নিষ্ঠা, পরিশ্রম দিয়ে এরা সি গ্রেড অবধি পৌঁছায়।

আর এই সি গ্রেড (ম্যাক্সিমাম) ক্রিকেটার দিয়েই আমাদের প্রথম শ্রেণি, বিপিএল চলতে থাকে। বিপিএল যদি ৮/১০ দলের খেলা হত, আমি হলফ করে বলতে পারি আপনি সব দলের জন্য এমনকি সি গ্রেড ক্রিকেটারও সাপ্লাই দিতে পারতেন না। এবারের পাঁচ বিদেশী তত্ত্বও কিন্তু ক্রিকেটারের অভাবকে সাক্ষী দেয়। দোষ তো বিপিএলের না, দোষ তো আমাদের ক্রিকেট সিস্টেমে। হঠাৎ মাটি ফুঁড়ে বের হবার মতো করে একজন দুইজন সাকিব, মুস্তাফিজ, মেহেদি উঠে আসার প্রত্যাশা আর কত করবো? এভাবে আর কতদিন?

ইংল্যান্ডের প্রতিটি ইউনিভার্সিটি, স্কুল, কলেজের নিজস্ব মাঠ আছে। এমনকি শ্রীলঙ্কার স্কুল ক্রিকেটও অনেক শক্তিশালী। প্রতিভার বিকাশ যেখান থেকে শুরু হবে, সেই জায়গাটা থেকেই তো কাজ শুরু হওয়া উচিত। ইতিহাস সাক্ষী দেবে, যে দেশের স্কুল ক্রিকেট যত বেশি শক্তিশালী, সেই দেশের ক্রিকেট কাঠামো তত বেশি উজ্জ্বল। আর আমাদের দেশের স্কুল ক্রিকেট?

বোর্ড কর্মকর্তারা তবুও বলে চলেছে ক্রিকেট উন্নয়নের কথা! হাজারো প্রতিভা অঙ্কুরেই নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর যারা নিজেদের চেষ্টায় উঠে আসছে এদের টেকনিক, ফিটনেস হচ্ছে নিচুমানের। কিন্তু উপরমহলের মাথাব্যাথা কোথায়! রেডিমেড পাকা কাঁঠাল খাবার স্বপ্নে বিভোর হয়ে গোঁফে তেল মেখে বসে আছেন তারা। স্কুল ক্রিকেট এবং জেলা ক্রিকেটে উন্নত ফ্যাসিলিটি এবং মানসন্মত কোচের ব্যবস্থা না করলে এদেশের ক্রিকেট বেলুন ফুঁস হতে সময় নেবে না।

প্রতিটি হাইস্কুলে ক্রীড়া শিক্ষক রয়েছেন। তাদের প্রতি যথাযত শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এরা ৯৫% আনফিট। দেশের জনপ্রিয় দুটি খেলা ক্রিকেট এবং ফুটবল সম্পর্কে এদের জ্ঞান ঠিক কতখানি সেটা নিয়ে প্রশ্ন তুলছি। প্রতিটি স্কুলে ফুটবল এবং ক্রিকেট টিম তৈরি করার নির্দেশ আছে সরকারের, কিন্তু কিভাবে তৈরি হবে সেটা নিয়ে কোন মাথাব্যাথা আছে কি? এই ক্রীড়া শিক্ষকদের নিয়োগ প্রক্রিয়াই বা কি? ক্রিকেট এবং ফুটবলের বেসিক কোচিং জ্ঞান না থাকলে বাংলাদেশে কিভাবে একজন ক্রীড়া শিক্ষক পদে নিয়োগ পান?

স্কুল ক্রিকেটের মান উঁচুতে উঠাতে হলে ক্রীড়া শিক্ষক ইস্যুটা নিয়ে ভাবনা বাড়ানো উচিত অথবা বাধ্যতামূলকভাবে একজন ট্রেনিংপ্রাপ্ত কোচকে নতুন পদ বানিয়ে প্রতিটা স্কুলে নিয়োগ দেয়া উচিত। অন্তত সঠিক টেকনিকের সাথে, যখন আঞ্চলিক পর্যায় থেকে প্রতিভা উঠে আসবে, তখন উপরের পর্যায়গুলোতে তাকে লালন করতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। প্রতিটা ক্লাবের নিজস্ব মাঠ, কোচিং স্টাফ এবং জিমনেশিয়াম বাধ্যতামূলক থাকতে হবে। বিভাগীয় পর্যায়ে স্পেশালিষ্ট কোচ এবং সাপোর্ট স্টাফ থাকতে হবে। গাছ লাগিয়েই ফলের আশা করা পাপ, আর সেখানে গাছ না লাগিয়েই ফলের আশায় বসে আছি আমরা।

প্রতিটি ধাপে পরিকল্পনার ছাপ না থাকলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বেশিদুর এগোবে না। মাঠ পর্যায়ে প্রতিভার লালনই পারে ক্রিকেটকে এগিয়ে নিতে। গ্রামে একটা কথা চালু আছে, ‘বুড়ো বয়সে হাড় ভাঙলে জোড়া লাগে না’, ঠিক তেমনি সর্বোচ্চ পর্যায়ে এসে প্রতিভার খোঁজ করে লাভ নেই। যে মুলা বাড়বে, সেটার দুটি পাতা দেখলেই বোঝা যাবে। প্রতিভার চর্চা হোক প্রথম ধাপেই, সেটার প্রতিফলন হোক সর্বোচ্চ পর্যায়ে। প্রতিভার হাহাকার দূর হোক বাংলাদেশ ক্রিকেট থেকে, নাহলে হাজারো বিপিএল আয়োজনেও কোন লাভ হবে না।

https://www.mega888cuci.com