ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি খুবই নিষ্ঠুর জায়গা: কারিনা কাপুর

বেগম, গ্ল্যামার কুইন, বেবো… অনেক বিশেষণ তাঁর। পর্দায় ও পর্দার বাইরে বিভিন্ন ভূমিকায় অনবদ্য তিনি। ঈর্ষনীয় সফলতার সাথে সাথে ব্যর্থতার মুখও দেখেছেন কখনো-কখনো। কিন্তু ভ্রম বা মোহের পিছনে না ছুটে নিজের কাজ করে যাওয়ার অদম্য বাসনা-ই অন্যদের থেকে কারিনা কাপুর খানকে আলাদা করে চেনায়।

সফলতা বা ব্যর্থতা নিয়ে কখনো উচ্চবাচ্য করেন না তিনি। সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটির উত্তরও সাবলীলভাবে দিতে জানেন। তাঁর মোহনীয় সৌন্দর্য এবং স্টাইলের চর্চা সর্বত্র হলেও এগুলো তাঁকে মোটেও প্রভাবিত করেনা। নিজের কাজ ঠিকভাবে করার মাঝেই আনন্দ খুজে পান কারিনা।

সদ্য মা হয়েছেন তিনি, তবে নতুন এই দায়িত্ব তাঁকে তাঁর কাজ থেকে দূরে রাখতে পারেনি। শুরু করেছেন নতুন সিনেমার কাজ। জিম করা, বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহন সর্বোপরি আবার লাইমলাইটে ফিরে এসেছেন কাপুর-কন্যা। ফ্যাশন, পরিবার এবং খ্যাতি নিয়ে খোলামেলা ফিল্মফেয়ার ম্যাগাজিনের সাথে কথোপকথনে দেখা গেল আত্মবিশ্বাসের ঝলক।

কথোপকথনের কিয়দংশ নিচে তুলে ধরা হল অলিগলি.কমের পাঠকদের জন্য।

‘ভিড়ে দ্য ওয়েডিং’-এর মাধ্যমে আবার অভিনয়ে ফিরছেন, এই প্রত্যাবর্তনকে কিভাবে দেখছেন?

মূল ভাবনা হচ্ছে ভালবাসার জায়গা থেকে অভিনয় করে যাওয়া। নতুন কোন পরিকল্পনা নেই। ক্যারিয়ার এবং জীবনের দিক থেকে এটিকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবেই দেখি। আমার কাজ, পরিবার আর অন্যান্য বিষয়গুলোর মাঝে সামঞ্জস্য রক্ষা করে চলার চেষ্টা করছি।

‘ভিড়ে দ্য ওয়েডিং’-এর প্রস্তুতি কেমন চলছে? আবহটা কেমন?

সিনেমাটিতে একদল অদম্য ও পরিশ্রমী লোক কাজ করছে। সহজ-সরল গল্পের সিনেমা। একতা কাপুর আর রিয়া কাপুর তথা প্রযোজকদ্বয়, দুজনেই নারী। আর গল্পটিও চারজন নারীকে নিয়ে। এখন এই ধরনের কাজ-ই করতে চেয়েছিলাম। কাজের ফাঁকে সেটে তৈমুরকেও সময় দেয়া যাবে। প্রায় দেড় বছর অপেক্ষার পর অবশেষে সিনেমাটির কাজ শুরু হচ্ছে। এ মাসেই দিল্লীতে শুটিং শুরু হবে।

এখন কোন ধরনের চরিত্রগুলোতে অভিনয় করতে চান?

যে কোন চরিত্রেই কাজ করতে প্রস্তুত। তবে যেহেতু অনেকদিন পর অভিনয়ে ফিরছি, তাই মানুষ আমার নতুন কাজটিকে কিভাবে গ্রহন করে, সেটি দেখার অপেক্ষায় আছি। এছাড়া সেটে তৈমুরকে কতটুকু সময় দিতে পারছি, তার উপরও অনেক কিছু নির্ভর করছে। তাই এখনই কোন পরিকল্পনা করতে চাইনা। আসলে আমি একটু ভয়ই পাচ্ছি।

বলেন কি! সত্যি?

হ্যাঁ, হ্যাঁ। জীবনে প্রথম ভয় লাগছে। ‘ভিড়ে দ্য ওয়েডিং’-এর পর খুব ভাল গল্প হলেই শুধু কাজ করব। তবে ‘ভিড়ে দ্য ওয়েডিং’-এর গ্রহণযোগ্যতার উপরেই আমার পরবর্তী পদক্ষেপগুলো নির্ভর করছে। আর যেহেতু অভিনয় আমার রক্তে মিশে আছে, তাই এর সাথেই থাকব।

প্রেগনেন্সির সময় আপনাকে বেশ প্রানবন্ত মনে হয়েছে….

(হাসি) আমার মনে হয়, আমাদের দেশ সহ পশ্চিমের মডেল-অভিনেত্রীরাও ঐ সময়টাকে এভাবেই উপভোগ করে। তবে, অভিনেত্রীরা সবাই ঐ সময়টাতে বিরতি নিয়ে থাকেন। কিন্তু, আমি প্রেগনেন্সির বিষয়টিকে সাধারণভাবে নিয়েছি। আমি বরাবরই একটি পরিবার শুরু করা ও সন্তান নেয়ার ব্যাপারে আগ্রহী ছিলাম। আর আমি ঐ খুশির সময়টিকে পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও ভক্তদের সাথে ভাগাভাগি করে নিয়েছি। প্রেগনেন্সির সময় ওজন বেড়ে যাওয়া, পরবর্তীতে জিম করার মাধ্যমে ওজন কমানো, সবমিলিয়ে নিজেকে আবার নতুন করে গড়ে নিয়েছি। তাই বলা যায়, নিজের ইচ্ছেমতই সবকিছু করেছি।

অবাক করার বিষয়, আপনি সামাজিক মাধ্যমে তৈমুরের ছবি প্রকাশ নিয়ে অন্যান্য ‘স্টার মম’-দের মতো রাখঢাক করেননি?

বর্তমান সময়ে ইন্টারনেটের মাধ্যমে সবাই সবাইকে দেখছে, খোঁজখবর রাখতে পারছে। মানুষ নিজেদের জীবনের বিভিন্ন মুহূর্তের ছবি ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামের মতো সাইট গুলোতে শেয়ার করছে, তাই ব্যক্তিগত বা গোপন বলে কিছুই থাকছেনা। তাই আমি আর সাইফ মিলে এই বিষয়টি নিয়ে রাখঢাক না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সে আমাদের সন্তান আর লোকজন তার ছবি তুলবে, শেয়ার করবে, এই বিষয়টিকে আমরা মেনে নিয়েছি।

পাপারাজ্জিদের পছন্দের পাত্র হয়ে উঠছেন তৈমুর আলী খান….

(হাসি) বিষয়টা আমি বুঝতে পারি। আমি ওকে ‘স্টার কিড’-দের মতো তৈরি করতে চাইনা, ওকে যথাসম্ভব সাধারনভাবে গড়ে তুলতে চাই। আর ওকে ওর মতো-ই থাকতে দিতে চাই।

সামাজিক মাধ্যমে আপনার কোন অ্যাকাউন্ট না থাকলেও আপনার উপস্থিতি লক্ষ্যণীয়। কবে আমরা কারিনা কাপুর খানকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে সরাসরি পাচ্ছি?

(হাসি) আমি জানি! ইনস্টাগ্রামে মনে হয় আমাকে সবচেয়ে বেশী দেখা যায়। সবজায়গায় আমার ছবি। তাই আমি সরাসরি না থাকলেও চলে, তাই না? আমার বোন, বন্ধুরা এবং আমার ফ্যান ক্লাব গুলো সময় আমার ছবি পোস্ট করে। তাই আমি সরাসরিভাবে না থাকলেও একেবারে বিচ্ছিন্ন নই। আমার মনে হয়, আমি আর সাইফ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে না থাকলেও আমরা যথেষ্ট সামাজিক।

তৈমুরের জন্মের মাত্র দু’দিন বাদেই আপনি একটি ডিনার পার্টিতে অংশ নিয়েছিলেন, যেটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে অনেক নেতিবাচক মন্তব্য লক্ষ্য করা গেছে। এ ব্যাপারে আপনার অভিমত কি?

আমি মনে করি, বিষয়টি নিয়ে এভাবে চিন্তা করাটা বোকামি। জন্মদান করাটাকে আমি খুব সাধারন একটি বিষয় হিসেবেই দেখি। এটি জীবনের একটি অংশ। আমার অনেক বন্ধুরা আমেরিকায় থাকে, যারা জন্মদানের ৩ দিনের মাঝেই ওরা নিজেদের কাজে যোগ দেয়, কারন তাদের অন্য কোনো উপায় থাকেনা। সুতরাং, জন্মদানের পর বাড়িতে বসে থাকার রীতিটি ক্ষয়িষ্ণু। এমনকি মা যদি শিশুকে দুধ খাওয়াতে চায়, সেটি মা বাড়িতে না থেকেও বিভিন্ন উপায়ে করতে পারে। সন্তান জন্মের পরের সময়ে দেহ-মনকে উজ্জীবিত রাখার জন্য কিছু সময় বাইরে বেড়িয়ে আসা কোন অপরাধ নয়। সাইফ এবং আমি এসব বিষয়ে কখন কর্ণপাত করিনি, আমরা আমাদের মতো-ই চলতে চাই।

মা হিসেবে আপনি কি ধরনের—সুস্থির নাকি অস্থির?

যেহেতু প্রথমবার মা হয়েছি, তাই কিছুটা অস্থির তো বটেই । অবশ্যই, সন্তানের বেড়ে উঠার মুহূর্তগুলোকে মিস করতে চাই না। আমি সবসময় ওর পাশেই থাকতে চাই। মাতৃত্বের প্রতিটি মুহূর্তকে কল্পনার চাইতেও বেশী উপভোগ করছি। তৈমুরের মা হতে পারাটা আমার জন্যে সবচেয়ে গর্বের বিষয়। আশা করি, আমি একজন ভাল মা হয়ে উঠতে পারব। পথচলাতো মাত্র শুরু…

‘সন্তান পালন বিষয়ক উপদেশে’র জন্য আপনাকে কার দ্বারস্থ হতে হয়?

আসলে আমি কারো কাছেই যাইনা। আমি নিজের মতো করেই সবকিছু করতে চাই। মানুষ করতে করতেই শিখে। সাইফ ও আমাকে এটাই বলে। প্রত্যেক মা-ই অন্যদের থেকে আলাদা ভাবে তার সন্তানকে লালন-পালনের চেষ্টা করে। আমি সবার কথাই শুনি, তবে কাজটা নিজের মতোই করি।

তৈমুরের আগমনের পর সাইফ এবং আপনার সম্পর্ক কিভাবে প্রভাবিত হয়েছে? আর নিজেদের জন্য সময় বের করে নেয়া হয় কি?

এটি পুরোপুরি দম্পতিদের উপর নির্ভর করে, তারা কিভাবে সবদিক সামাল দিয়ে নিজেদের জন্য সময় বের করে নিতে পারে। তবে হ্যাঁ, অবশ্যই, এখন সন্তানকেই বেশী সময় দিতে হয়, আর তাই সাইফ, তৈমুর আর আমি একসাথেই সময় কাটাতে পছন্দ করি। এছাড়া, আমি আর সাইফ ও নিজেদের জন্য যথেষ্ট সময় পাই।

‘কুল’ বাবা হিসেবে সাইফের খ্যাতি রয়েছে…

হ্যাঁ। সারা এবং ইব্রাহিমের বাবা হিসেবে সাইফ অসাধারণ। সাইফ সবসময়ই তাদের কথা মনযোগ দিয়ে শোনে, তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করে। সে সবসময়ই শান্ত আর নিয়ন্ত্রিত। নিজের ব্যক্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন। এর ফলে বাসায় ওর পিতৃসুলভ আচরণে প্রকাশ পায়। ও তিন সন্তানের বাবা এবং তাদের প্রত্যেকের সাথেই তার সম্পর্ক নাটকীয়ভাবে আলাদা।

সিনেমায় সারা আলী খানের অভিষেক হচ্ছে…

হ্যাঁ ! আমি বিশ্বাস করি, সিনেমায় সে দারুণ সফল হবে। সৌন্দর্য্য আর বুদ্ধিমত্তার  অসাধারন মিশ্রণ রয়েছে তার মাঝে। আমি তার কাজ দেখার জন্য অত্যন্ত আগ্রহী। আশা করি, সবকিছু তার জন্য ঠিকভাবেই পরিচালিত হবে।

বর্তমানে বি-টাউনে স্বজনপ্রীতি নিয়ে বেশ বিতর্ক চলছে। এ বিষয়ে আপনার দৃষ্টিভঙ্গি কি?

স্বজনপ্রীতি নিয়ে অনেক অপ্রাসঙ্গিক বিষয়ের অবতারণা হচ্ছে। সমাজের সব ক্ষেত্রেই তথা ব্যবসা, রাজনীতি সহ সব ক্ষেত্রেই কম-বেশী স্বজনপ্রীতি রয়েছে। কিন্তু, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে এই বিষয়টি নিয়ে একটু বেশীই কথা হয়। যদিও অনেক ‘স্টার কিড’-ই তাদের বাবা-মা’র মতো সফল হতে পারেনা। তাই আমার বুঝতে কষ্ট হয়, কেন এই বিষয়টি নিয়ে এত আলোচনা হয়? মূলত, ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি খুবই নিষ্ঠুর জায়গা। এখানে শুধুমাত্র প্রতিভা আর যোগ্যতার বলেই টিকে থাকা যায়। এমনটা না হলে সব ‘স্টার কিড’-ই দেশের নাম্বার ওয়ান স্টার হতে পারত। ইন্ডাস্ট্রিতে রণবীর কাপুর যেমন আছেন, তেমনি ইন্ডাস্ট্রির বাইরে থেকে আসা রণবীর সিংও আছে। সুতরাং, সত্যি বলতে, স্বজনপ্রীতি নিয়ে আলোচনা অর্থহীন। ইন্ডাস্ট্রিতে প্রতিভা আর যোগ্যতার মূল্য আছে বলেই কঙ্গনা রৌনত ইন্ডাস্ট্রির বাইরে থেকে এসেও আজ এত বড় মাপের অভিনেত্রী।

উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে আপনার পথচলা…

উত্থান-পতনের মধ্য দিয়েই পথ চলতে হয়। আমি আমার সাফল্য বা ব্যর্থতা, কোনটিকেই খুব বেশী গুরুত্ব দিই না। যদি সিনেমা হিট হয় খুব ভাল, হিট না হলেও ঠিক আছে। আমি আমার কাজকে ভালবাসি। অনেক মানুষই তাদের কাজ কে উপভোগ করতে পারেনা, আমি উপভোগ করি। সাফল্য পেলে ব্যর্থতার জন্যেও প্রস্তুত থাকতে হবে।

সম্প্রতি, সোহা আলী খান আপনার কাছ থেকে শিশু সংক্রান্ত ‘মূল্যবান উপদেশ’ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। তার সাথে আপনার সম্পর্ক কেমন?

আমি আর সাইফ উভয়ের সাথেই ওর সম্পর্ক বেশ ঘনিষ্ঠ। আমরা ওকে খুব ভালবাসি। ও আন্তরিক, দৃঢ়। বাবা (মনসুর আলি খান পাতৌদি), আর মা (শর্মিলা ঠাকুর)-র সব গুণাবলীই ওর মাঝে রয়েছে। আমরা সপ্তাহে অন্তত দু’বার দেখা করি আর একসাথে ডিনারও করি।

আগের কোনো এক ইন্টারভিউতে যখন আপনাকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিলো আপনার পরবর্তীতে দশকের পরিকল্পনার বিষয়ে, তখন আপনি বলেছিলেন, ‘ফ্রেঞ্চ রিভেইরার কোনও এক ভিলায় আমি আর সাইফ’, সেই পরিকল্পনা কি এখনো আছে?

(হাসি) হ্যাঁ। এখনও কাজ করছি সেই স্বপ্নকে সত্যি করার জন্যে। কে জানে! পৃথিবীর যে কোন জায়গাতেই হতে পারে এটা। আমি এরকমই… আমি আমার পরিবার আর বন্ধুদেরকে অনেক ভালবাসি।

তবে আমরা আপনাকে সবসময় বড় পর্দায় দেখতে চাই…

অবশ্যই! ৭০-৮০ পর্যন্ত অভিনয় চালিয়ে যেতে চাই…

https://www.mega888cuci.com