প্রতাপশালী যত ব্যবসায়ী দম্পতি

আমাদের এই বর্তমান প্রজন্ম জীবনের সর্বক্ষেত্রেই ভারসাম্য খুঁজে পেতে চায়। দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, স্বাধীনচেতা এক সত্ত্বার পাশাপাশি আমাদের মনের কোণে এক শিশুমনও বাস করে, যে কিনা সর্বক্ষণ ভালোবাসা আর সাহচর্য কামনা করে। তবে নির্মম হলেও সত্য যে, একই সাথে কোমল-কঠিনের এ মানিকজোড় খুঁজে পাওয়া যেতে পারে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লাবণ্যতেই, বাস্তব জীবনে যে মানুষটি খুঁজে পাবার সম্ভাবনা শূন্যের কোটায়, বেশ হতাশাজনক।

তবে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ যদি সম্ভাবনার সূত্র মেনেই চলে, তবে তা আর জীবন কেন! পরতে পরতে রোমাঞ্চ আর বিস্ময় লুকিয়ে রেখেছে বলেই তো জীবন এত সুন্দর।

পূর্বসূরিরা বলতেন, মানুষ ঠিক তেমনটাই পায়, যা সে মনেপ্রাণে চায়। মনেপ্রাণে কোমল আর কঠিনের কামনা করলে কি পাওয়া যেতে পারে, তার প্রমাণ রেখেছেন নিচের পাঁচ দম্পতি। ওহ, তারা কেবল দম্পতিই নন, একে অপরের ব্যবসায়ের অংশীদারও।

চলুন জেনে আসা যাক, পাঁচ শীর্ষ ব্যবসায়ী দম্পতির অনুপ্রেরণার গল্প।

বিল গেটস এবং মেলিন্ডা গেটস

ব্যবসা, শক্তি এবং একই সাথে সুখী দম্পতির তালিকা শুরুতেই বাতিল বলে গণ্য হবে, যদি না তালিকাটা এই জুটির নাম দিয়ে শুরু করা হয়। তর্কসাপেক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি বিল গেটস বর্তমানে ৭৯.৭ বিলিয়ন ডলারের মালিক। তার সহধর্মিণী, আমেরিকান ব্যবসায়ী এবং মানবহিতৈষী, মিস মেলিন্ডা গেটস ফোর্বসের সূত্রানুযায়ী, ৭০ বিলিয়ন ডলারের মালিক। দুজনে মিলে ‘বিল ও মেলিন্ডা গেটস ফাউন্ডেশন’ পরিচালনা করছেন, যা কিনা বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রাইভেট ফাউন্ডেশন। নব্বইয়ের দশকের প্রথমদিকে মেলিন্ডার মাইক্রোসফটে যোগদানের মাধ্যমে দুজনের পরিচয় ঘটে এবং ১৯৯৪ সালে হাওয়াইতে এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে তারা গাঁটছড়া বাঁধেন। এ দম্পতি ২০১৮ সালের মধ্যে পৃথিবী থেকে পোলিও নির্মূল করার এবং ২০২০ সালের মধ্যে আধুনিক যুগের গর্ভনিরোধকের সাথে ১২০ মিলিয়নেরও বেশি মহিলাকে পরিচয় করিয়ে দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছেন।

মারিসা মেয়ার এবং জ্যাক বোগ

তাদের একজন ইয়াহুর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অপরজন সাবেক আইনজীবী যিনি বড় বড় ডেটা প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ শুরু করেন এবং পরবর্তীতে একটি বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ‘ডেটা কালেকটিভ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তাদের যখন পরিচয় হয়, মেয়ার তখন গুগলে কাজ করতেন। ১২ ডিসেম্বর, ২০০৯ সালে তারা বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ইয়াহুতে যোগদানের পর, কোম্পানিটি যখন তাকে তাদের সিইও হিসাবে নিয়োগের ঘোষণা দেয়, মেয়ার সে আয়োজনেই ঘোষণা দেন যে তিনি অন্তঃসত্ত্বা। এ দম্পতি এখন এক ছেলে এবং দুজন যমজ কন্যার গর্বিত বাবা-মা।

জেফ বেজোস এবং ম্যাকেঞ্জি বেজোস

ঘটনার সূত্রপাত, আমাজনের প্রতিষ্ঠাতার এক আমেরিকান ঔপন্যাসিকের প্রেমে পড়ার মাধ্যমে। দুজনের পরিচয় নিউ ইয়র্ক হেজ ফান্ড ‘ডি.ই. শ’ তে, যেখানে তারা উভয়েই ১৯৯২ সাল পর্যন্ত কাজ করেছেন। পরিচয়কে পরিণয়ে রূপ দিতে কেবল এক বছরই সময় লেগেছিলো। দুই বছর পর জেফ আমাজনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে নিযুক্ত হন। এ দম্পতি ১৯৯৪ সালে সিয়াটলে স্থানান্তরিত হন, যার ফলে তাদের ক্যারিয়ার যেন আরও গতিপ্রাপ্ত হয়। টনি মরিসনের প্রিয় ছাত্র ম্যাকেঞ্জি বেজোস তাঁর বিখ্যাত রচনা ‘দ্য টেস্টিং অব লুথার অ্যালব্রাইট’ (২০০৫) এবং ট্রপস (২০১৩) প্রকাশ করেছেন এ সময়েই। যখন জেফ বেজোস বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলির একটি আমাজনকে সম্প্রসারণ করতে ব্যস্ত, তখনই ম্যাকেঞ্জি ২০১৪ সালে ‘বিস্ট্যান্ডার’ প্রতিষ্ঠা করেন। ব্যক্তিগত জীবনে এই দুর্দান্ত জুটি, তিন পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের পিতামাতা।

চের ওয়াং এবং ওয়েঞ্চি চেন

কে বলেছে ‘প্রযুক্তিপোকা’রা ভালোবাসা পান না! এইচটিসি কর্পোরেশনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা চের ওয়াং বাঁধা পড়েছেন চিয়াং ওয়েন-চির বাঁধনে, যিনি ভিআইএ টেকনোলজিসের প্রেসিডেন্ট এবং সিইও। নিজ ধর্মের ব্যাপারে রক্ষণশীল ওয়াঙয়ের জন্য তার স্বামী খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করেছেন। ওয়াং এবং চেন উভয়েই পরষ্পরের কোম্পানির পক্ষে প্রচারণা চালান এবং এমনকি ভিআইএ টেকনোলজিস পরিচালনা শুরুর সময়ে চেনের মুখোমুখি হওয়া সমস্যাগুলোর সমাধানও ওয়াং-ই করে দিয়েছিলেন। এ দম্পতি এখন দুই ফুটফুটে শিশুর গর্বিত অভিভাবক।

মুকেশ ও নিতা আম্বানি

একটি কথা বেশ প্রচলিত যে, ‘আম্বানি পরিবারের মতো করে, কেউ-ই কিছু করেন না।’ যখন রিলায়েন্স ফাউন্ডেশনের চেয়ারপারসন ও প্রতিষ্ঠাতা নিতা আম্বানীর বাবা ধীরুভাই আম্বানী মেয়ের বিয়ের জন্য ঘটকের দারস্থ হন, তখনই মুকেশ আম্বানী এই অপরূপাকে প্রথম দেখেছিলেন। তারপরে মুম্বাইয়ের যানবহুল রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে, মুকেশের নিতাকে প্রেম নিবেদনের গল্প তো সবার হৃদয়ই জয় করে নিয়েছে। বর্তমানে এই ঈর্ষণীয় জুটি এক বিলিয়ন ডলারেরও বেশি পরিমাণ অর্থের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অংশীদার এবং প্রতিষ্ঠানের আয় করা অর্থের সিংহভাগ-ই দাতব্য প্রতিষ্ঠানকে দান করেন তারা। এছাড়াও ‘প্রজেক্ট দৃষ্টি’ নামে অন্ধদের জন্য প্রতিষ্ঠিত এক সামাজিক উদ্যোগের সাথে নিজেকে সম্পৃক্ত করেছেন নিতা, বাস্তবিকপক্ষে এই উদ্যোগটি ‘ন্যাশনাল ইনস্টিটিউশন ফর দ্য ব্লাইন্ড’য়ের সহযোগিতায় আম্বানি পরিবারের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজেরই গড়া। এই মহৎ দম্পতি ব্যক্তিগত জীবনে দুই পুত্র আকাশ ও অনন্ত এবং এক কন্যা এশার জনক-জননী।

সাধারণত ব্যবসায়ী দম্পতি খুঁজে পাওয়া বিরল, তবে একবার সাফল্যের চাবি হাতে পেয়ে গেলে, তারা কেবল নিজেদের ভাগ্যই নয়, গোটা পৃথিবীর ললাটলিখন বদলের কাজেই নেমে পড়েন। প্রমাণ তো উপরের পাঁচ দম্পতিই।

ইওরস্টোরি.কম অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com