পরীক্ষার ফলাফলই জীবনের শেষ কথা নয়

আজ থেকে চার বছর আগে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছিলাম আমি। রেজাল্ট দিয়েছিলো আগস্টের ৩ তারিখ। প্রায় ৯০% নিশ্চিত ছিলাম এ+ পাবো আর খুব কড়া করে খাতা দেখলে একটু কম তবে তা ৪.৮ এর ওপরই থাকবে।

রেজাল্টের দিন সকালে ফেসবুকের কে জানি একজন ইনবক্সে রেজাল্ট দিলো। প্রথমে রেজাল্ট দেখে হেসে ফেললাম। আব্বু, আম্মু, আমার নাম ঠিকই আছে, রোল ঠিকই আছে কিন্তু রেজাল্টের সংখ্যাটা নিশ্চিত আমার না।

বললাম, ভাইয়া মজা নেন? বলল না তো আপু, এটাই তোমার রেজাল্ট। আরো দুই একজন কে বললাম। ওমা একই রেজাল্ট! তারমানে আমি? মানে আমি সত্যিই এত খারাপ করেছি? এতটা খারাপ? এটা আমার রেজাল্ট!

আমি প্রায় তিনদিন বেহুশ এর মতই হয়ে ছিলাম। আব্বু খালি বলতে লাগলো সারাজীবন তোকে এই রেজাল্ট বয়ে বেড়াইতে হবে। কোথাও চাকরী তো পাবিনা বরং এই রেজাল্ট দেখলে মানুষ গালে জুতা দিয়ে পিটবো।

আমি বললাম, আব্বু বিশ্বাস করেন আমার কোন দোষ নাই। আমি সব পারসি। আমি ভালো পরীক্ষা দিসি।

আব্বু আরো চিৎকার করে বলল, যারা খাতা দেখসে তারা কি শত্রু? তোরে ইচ্ছা করে কম দিসে? আমি ফিডার খাই যে আমারে বুঝাস? যা গিয়া মোবাইলে আরো দুই ঘন্টা কথা বল।

আমি রাগে আব্বুর সামনে আমার সিমটাকে ভেঙে দুই ভাগ করে ফেললাম। (সেই ভাঙা অংশটা এখনও সচল) আমিও চিৎকার বললাম, আমি কি পাপ করসি? আমার মত সন্তানের জন্য আপনি সমাজে মুখ দেখাইতে পারবেন না? তাহলে ঠিক আছে। আমিই আমার মুখ কাউরে আর দেখাবো না।

রুমে এসে কম্পাস দিয়ে হাতে আঁচড় কাটা শুরু করলাম। আম্মু এসে থাপ্পড় দিলো। বকা দিলো আবার বুঝাইলো।

যারা জীবনে কোনদিন জানতে চায় নাই বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি তারাও রেজাল্টের খবর নেওয়ার জন্য নিজের গাঁটের টাকা খরচ করে কল দিতে শুরু করলো।

এই জঘন্য রেজাল্ট নিয়েও আমি মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন দেখেছিলাম। খুব চেষ্টা করেছিলাম। এমসিকিউ আমাকে উপরে তুল্লেও রেজাল্ট আমাকে ধাক্কা মেরে অতল গহ্বরে ফেলে দিলো। আমার মেডিকেলে পড়ার স্বপ্ন কোথায় জানি চিরতরে হারিয়ে গেল।

আব্বুর ইচ্ছা ছিলো আমি এক বছর গ্যাপ দিয়ে আবার পরীক্ষা দেই। সেটা করিনি। অন্য কোন পাবলিক ইউনিতে পরীক্ষাও দেইনি। কেবল জগন্নাথে নিয়ম রক্ষার পরীক্ষা দিয়েছিলাম আরকি।

আমার বাবা কিছুতেই আমাকে প্রাইভেট ভার্সিটিতে পড়াবেন না। এমনকি আমার ভর্তির ফিটাও আব্বু তখন দেয়নি। খালু নিজের টাকা দিয়েই ভর্তি করিয়ে দিলো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অফ বিজনেস এন্ড টেকনোলজিতে। (পরে অবশ্য আব্বু টাকা ফেরত দিয়েছেন)

কি সাবজেক্ট নিয়ে পড়বো সেটা নিয়েও ছিলাম দোটানায়। কারন পিওর সায়েন্স এর ছাত্রী হয়ে আমি কখনই বিবিএ পড়বো না এটা আগেই ঠিক ছিলো। কোন এক সময়ে বলেছিলাম দরকার হলে গার্মেন্টস এ কাজ করবো তাও ইঞ্জিনিয়ারিং পড়বো না।

আম্মু বলল, তুই বংশের একটা মাত্র মেয়ে। তোকে পড়াশোনা করানোর জন্য কত মানুষের কথা শুনেছি, কত যুদ্ধ করেছি, ডাক্তারি না পড় অন্তত ইঞ্জিনিয়ারিংটা পড়।

সিএসসি না ট্রিপল ই? আর্কিটেকচার না সিভিল? কোনটায় পড়লে কি হয় তাও জানিনা আমি। পরিচতজনরা ‘যেটা ভালো মনে কর’ নামক সুন্দর উপদেশ দিলেন। যেন আমি সব সাবজেক্টে পিএইচডি করে অনার্সে পড়তে যাচ্ছি।

দশ পাঁচ ভেবে সিএসই মানে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে ভর্তি হলাম। যখন আমি ভর্তি হয়েছিলাম তখন আমি কম্পিউটার কিভাবে অন করতে হয় সেটাও জানতাম না। কি বোর্ডে চাপ দিয়ে কিভাবে লিখতে হয় আমি সেটা ও জানতাম না। মাউসের ডান দিকে ক্লিক করবো না বাম দিকে ক্লিক করবো তা নিয়েও দোটানায় ছিলাম।

আজ আমি শেষ সেমিস্টারের ছাত্রী। আলহামদুলিল্লাহ, আমার জীবন থেমে থাকেনি, আর উপরওয়ালা সহায় হলে সামনের দিনগুলোতেও থেমে থাকবেনা।

এখন মনে মনে হেসে বলি, ভাগ্যিস রেজাল্টটা খারাপ হয়েছিলো। মেডিকেল পড়ুয়া বান্ধবীদের কষ্ট দেখলে বলি, ভাগ্যিস মেডিকেলে চান্স পাইনি।

একটা রেজাল্ট কখনোই সারা জীবনের চিত্র পাল্টে দেয়না। নিজের ইচ্ছা আর সাহস জীবনকে পাল্টে দেয়। এখন আমি অপেক্ষা থাকি, অদূর ভবিষ্যতের সেই দিনটার দিকে যেদিন আল্লাহ্‌র রহমতে আমি নিজে উপার্জন করতে পারবো।

সেদিন আমার উপার্জনের টাকা আমার বাবার হাতে দিয়ে হেসে বলবো, ‘আমার রেজাল্টের জন্য কেউ আমার গালে জুতার বাড়ি মারেনি আব্বু। আমি নিজের যোগ্যতা আর পরিশ্রম দিয়ে অর্থ উপার্জন করতে পেরেছি।’

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।