পরিপূর্ণ একজন মিডফিল্ডার

জাভি-ইনিয়েস্তা কিংবা জেরার্ড-ল্যাম্পার্ড, কিংবা ইতালির আন্দ্রে পিরলো; তাদের কে না চেনে? তবে, এই যুগের অনেকেই হয়তো এক কালের মধ্য মাঠের সেনাপতি মাইকেল বালাকের নামই জানে না।

১৯৯৫ সালে জার্মান লিগের দ্বিতীয় সারির ক্লাব চেমনিটজারের হয়ে ক্যারিয়ার শুরু করেন বালাক। ১৯৯৭ সালে তিনি নাম লেখায় কাইজার্স্লৌটার্নে। মাইকেল বালাকের হাত ধরে অবিশ্বাস্যভাবে কাইজার্স্লৌটার্ন ৯৮-৯৯ সিজনে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নবাগত দল হিসেবে বুন্দেসলিগা জিতে যায়। অথচ এর আগের মৌসুমে দলটি দ্বিতীয় বিভাগ থেকে বুন্দেসলিগায় কোয়ালিফাই করে।

পরের মৌসুমে মাইকেল বালাক বেয়ার লেভারকুসেনে যোগ দেন। ২০০১-২ এ মাইকেল বালাকের একক পারফরমেন্স লিভারপুল, ম্যানইউয়ের মতো শক্তিশালী দলগুলোকে হারিয়ে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ফাইনাল খেলে বায়ার লেভারকুসেন।অবশ্য ফাইনালে রিয়াল মাদ্রিদের কাছে ২-১ এ হারতে হয়েছিল বালাকের দল লেভারকুসেনকে।

ঠিক সেই সিজনেই, বুন্দেসলিগা জিততে লেভারকুসেন প্রয়োজন ছিল শেষ তিন ম্যাচে মাত্র পাঁচ পয়েন্ট। বায়ার লেভারকুসেন শেষ তিন ম্যাচে সেই ৫ পয়েন্ট অর্জন করতে ব্যর্থ হয়। ফলে তারা চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। তবে সেই সিজনে বালাকের পারফরমেন্স ছিল বলার অপ্রতিরোধ্য, অদম্য। ফলস্বরূপ মাইকেল বালাক তখন জিতে নেন ‘উয়েফা মিডফিল্ডার অফ দ্য ইয়ার’ এর পুরষ্কার।

সে বছরই মানে ২০০২ সালে বিশ্বকাপে বালাকের একমাত্র গোলেই কোয়ার্টার ফাইনালে যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে জার্মানি সেমিতে চলে যায়। এরপর, সেমিতেও তার একমাত্র গোলেই স্বাগতিক কোরিয়া রিপাবলিককে পরাজিত করে জার্মানি ১২ বছর পর চলে যায় বিশ্বকাপ ফাইনালে।

কিন্তু কোয়াটার ফাইনাল এবং সেমিফাইনালে টানা দু’টি হলুদ কার্ড পাওয়ার কারণে ফাইনাল খেলতে পারেনি এই জার্মার সিংহ। ফাইনালে বালাকবিহীন জার্মানিকে ২-০ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয় তারকায় ঠাসা দুর্দান্ত একটি দল ‘ব্রাজিল’। সে বিশ্বকাপে সেরা খেলোয়াড়দের একজন ছিলেন বালাক। বালাক ছিলেন না বলেই হয়তো, ফাইনালে রোনালদো জাদুর কাছে পরাস্ত হয় জার্মানরা।

বিশ্বকাপের চোখ ধাঁধানো পারফর্মেন্সের পর পরের মৌসুমে তিনি বায়ার্ন মিউনিখে নাম লেখান। বায়ার্নের হয়ে চার সিজন খেলেছেন । ১০৭ ম্যাচে করেছেন ৪৪ গোল। প্রথম দুই সিজন এবং শেষ সিজনে জিতেছেন ডাবল।

২০০৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয় জার্মানিতে। জার্মানি সেবার তৃতীয় স্থান অর্জন করে। সেই বিশ্বকাপে তারা  হট ফেভারিট টিম হিসেবেই খেলে। বিশ্বকাপ জয়ের পথেই এগোচ্ছিল বালাকের জার্মানি। কোয়াটার ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে সেমিফাইনালে পৌছে যায় তারা।

সেমি ফাইনালে তারা ভালই খেলছিল। একের পর এক আক্রমণ করে ইতালির রক্ষণদূর্গকে ভেঙে দিচ্ছিল। গোল করার মতো দুটি অসাধারণ শটও নিয়েছিল। কিন্তু প্রতিবারই ইতালির ত্রাতা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন কিংবদন্তী গোলকিপার বুফন। ৯০ মিনিট শেষ হয়ে অতিরিক্ত ত্রিশ মিনিটের খেলা চলছে। খেলা টাইব্রেকারে গড়াবে, জার্মানি জিতবে এমন স্বপ্নই দেখেছিল জার্মানির প্রতিটি দর্শক। স্বপ্ন দেখবেই বা না কেন? আয়ালা, ক্যাম্বিয়াসোদেরি আর্জেন্টিনাকে তারা যে টাইব্রেকারে হারিয়েছিল সে স্মৃতি তখনো টাটকা।

ভাগ্যের নিষ্ঠুর খেলা! ১১৯ মিনিট। খেলা শেষ হতে মাত্র এক মিনিট বাকি। ঠিক এমন সমই গোল খেয়ে বসে জার্মানি। গোল শোধ করার মত আর সময় নেই বললেই চলে। তবু গোল শোধ করার জন্য তার মরিয়া হয়ে উঠেছিল। প্রায় সব খেলোয়ারই উপরে উঠে গেছে। সেই সুযোগে প্রতি আক্রমণ থেকে ইতালি আরেকবার  জার্মানির জালে বল পাঠায়। ততক্ষণে ১২১ মিনিট।  খেলা শেষ। স্বাগতিক জার্মানিকে বিদায় করে ফাইনালে ইটালি।

সেমিফাইনালে যখন ইতালির কাছে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় জার্মানি, তখন বালাকের কান্নাভেজা মায়াবী  চোখ দেখে প্রতিটি দর্শকের হৃদয়েই রক্তক্ষরণ হয়েছিল, কাদতে হয়েছিল। সেই বিশ্বকাপেও সেরা স্কোয়াডে জাইগা হয়েছিল এই জার্মান সৈনিকের। সে ছিলেন ওেই বিশ্বকাপের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।

২০০৬ বিশ্বকাপের পর ফ্রি এজেন্ট হয়ে পাড়ি দেন চেলসিতে। ২০০৭-০৮ মৌসুমের চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে তার দল চেলসি টাইব্রেকারে পরাজিত হয় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের কাছে। চ্যাম্পিয়ন হবার স্বাদ এবারও তিনি নিতে পারলেন না।

২০০৮ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে জাভি, ইনিয়েস্তাদের স্পেনের কাছে তার দল জার্মানি ১-০ গোলে পরাজিত হয়।। এবারও তিনি মেজর কোন ট্রফি ছুয়ে দেখতে পারেনি।প্রতিবারই যেন তার ‘তীরে এসে তরী ডুবছে’।

চেলসির হয়ে এফএ কাপ খেলার সে মারাত্মকভাবে ইনজুরিতে আক্রান্ত হয়। সেখানেই তার ২০১০ বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন মাটিতে মিশে যায়। আর ঐ ম্যাচটিই ছিল চেলসির হয়ে তার শেষ ম্যাচ। তারপর সে আবার তার পুরনো ক্লাব লেভারকুসেনে ফিরে আসে। লেভারকুসেনে সে দুইটি মৌসুম খেলেই ২০১২ সালের ২য় অক্টোবর ফুটবল থেকে আজীবনের জন্য বিদায় নেন।।

২০০২ ও ২০০৬ বিশ্বকাপে এবং ২০০৮ ইউরো কাপে ফাইনালে গিয়ে ব্যর্থ হতে  হয়েছিল এই জার্মান সৈনিককে। কিন্তু এই তিনটি টুর্নামেন্টেই তিনি সেরা একাদশে জায়গা করে নিয়েছিলেন। তিনি তিন বার জার্মানির বর্ষসেরার পুরষ্কার জিতেছিলেন। মাইকেল বালাক কি ছিলেন এসব ছোট পরিসংখ্যানে হয়তো বুঝা যাবেন না। যারা তার খেলা দেখেছেন তারাই বলতে পারবেন সে কি মাপের একজন খেলোয়ার ছিলেন।

শট পাস, কি পাস, লং পাস, স্কিলিং – প্রতিটি ক্ষেত্রেই তিনি খুব দক্ষ ছিলেন। নেতৃত্বের বিষয়ে কি আর বলব!  শুধু এই কথায় বলব যে বিশ্ব দেখেছিল সাড়া মাঠে দাপিয়ে বেড়ানো বুদ্ধিদীপ্ত, বিচক্ষণ, সাহসী ও  এগ্রসিভ এক সত্যিকারের দলনেতাকে।  ক্রিকেটে যেমন রিকি পন্টিং, ফুটবলেও তেমনি এক নেতার নাম মাইকেল বালাক। মূলত দলের মিডফিল্ডে সেনাপতির মতো দাপিয়ে বেড়ানোর ক্ষমতাটাই তাকে করে তুলেছে সবার প্রিয়।

কী ছিলনা তার খেলায়! একজন পারফেক্ট মিডফিল্ডার এর যা যা দরকার তার সবই ছিল এই জার্মান যোদ্ধার। ভাগ্যের ছোয়া পেলে হয় মতো তিনি সর্বকালের সেরা খেলোয়াড়দের একজন হয়ে যেতেন।

অলিভার কানের মতে ২০০১ থেকে ২০১০ অবধি জার্মানির সেরা খেলোয়াড় ছিলেন বালাক। রুডি ফোলার ওই সময় বলেছিলেন, ‘বালাককে ছাড়া জার্মান দল কল্পনাই করা যায় না!’ বাস্তিয়ান শোয়েন্সটাইগার তাকে আদর্শ মানতেন। ফ্র্যাঙ্ক ল্যাম্পার্ডের চোখে তিনি ছিলেন, দারুণ একজন সতীর্থ। গোল মেশিন থিয়েরি হেনরি ও’রি তাকে সময়ের সময়ের সেরা মিডফিল্ডার মানতেন। তিনি কত বড় মাপের খেলোয়াড় ছিলেন, সেটা তো এখান থেকেই স্পষ্ট।

https://www.mega888cuci.com