পরিণত ভাবনা ও ভাবনাকে পরিণত করার সিনেমা

‘লিপস্টিক আন্ডার মাই বুরখা’ – ছবিটা যে নি:সন্দেহে ভাল সেটা আইএমডিবিতে এর সাত রেটিং দেখেই বোঝা যায়। ছয় কোটি রুপি ব্যয় নির্মিত সিনেমাটি ২৭ কোটির মত আয় করেছে। ফলে একে ব্যবসাসফলও বলা যায় নি:সন্দেহে। মুভিটির গল্প ভিন্ন বয়সের চারজন নারীর জীবন কাহিনী কে ঘিরে।

রেহানা

মুভি শুরু হয় ওর গল্প দিয়ে। বয়স ১৭-১৮ বছর, গরীব মুসলীম পরিবারের কঠোর অনুশাসনে বেড়ে উঠা মেয়ে। কিন্তু চোখে তার অনেক স্বপ্ন, মিলি সাইরাসের মত গায়িকা হওয়ার, মডার্ন সোসাইটির সাথে উঠাবসা করার ইচ্ছা তার। বাসা থেকে বোরখা পড়ে বের হলেও শপিং মলে গিয়ে দামী দামী জামা-কাপড়,জুতা, কসমেটিকস চুরি করে আর সেগুলা পড়ে ধনী বন্ধুদের হাই সোসাইটি পার্টি এটেন্ড করে নিজেকে ওদের সমকক্ষে নেয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু এইভাবে কয়দিন?

লীলা

গরীব ঘরের মেয়ে লীলা, বয়স ২৫-২৭, বিউটি পার্লার চালায়। ওর বয়ফ্রেন্ড গলির দোকানের ফটোগ্রাফার। ওর স্বপ্ন বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে একটা ইউনিক বিজনেস চালু করার, ‘হানিমুন ফটোগ্রাফি;। হানিমুনে যাওয়া কাপলদের সাথে গিয়ে ওদের মেকআপ করবে লীলা, আর ওর বয়ফ্রেন্ড ঐ কাপলদের সুন্দর সুন্দর ছবি তুলে দিবে। এই সুযোগে ফ্রিতে দেশ-বিদেশ ঘুরবে দুইজন আবার অর্থও কামাই হবে। যদিও অনেক চেষ্টা করেও কোন হানিমুন অর্গানাইজিং এজেন্টকে ম্যানেজ করতে পারে না ওরা এই ধরনের বিজনেসের জন্য। এর মধ্যে লীলার বিয়ে ঠিক করে ওর মা। এখন কি করবে লীলা? মায়ের কথা শুনবে না বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে পালিয়ে যাবে?

শিরীন

শিরীনও মুসলীম পরিবারের পর্দানশীন বউ। বয়স ৩৫। জামাই বেকার। তাই সংসার চালানোর জন্য জামাইকে না বলে বাড়ি বাড়ি ঘুরে টুকটাক প্রডাক্ট বেচে কিছু এক্সট্রা ইনকামের আশায়। জামাইয়ের সাথে তার সারাদিনেও কোন কথা হয় না। কথা বলা তো দূরের কথা জামাই ওকে রাতের বিছানার ভোগ্যপন্য বাদে আর অন্য কিছুই ভাবে না। শিরীনের স্বপ্ন খুব সামান্য, সে লুকিয়ে লুকিয়ে যে কাজটা করছে, সেই সেলসম্যানের জবটা যেন সম্মানের সাথে সবাইকে গর্বের সাথে জানিয়ে করতে পারে। আর তার স্বামীর সামান্য রেস্পেক্ট, ব্যাস এতটুকুই। কিন্তু এই সামান্য জিনিসটুকুও কি পাবে সে?

উষা

বাড়ির বয়জেষ্ঠ মহিলা উষা বুয়াজি, বয়স ৫৫, বিধবা। পারিবারিক বাড়ি আর ব্যবসার দেখাশোনা এখনো নিজেই করেন। কিন্তু দিনশেষে বড় একা তিনি। নিষিদ্ধ কামসূত্রের গল্পের বই পড়ে তার রাত কাটে। একদিন হঠাৎ করেই খোজ পান সাতার প্রশিক্ষক য্যাসপালের। আকৃষ্ট হন ওর প্রতি। এজন্য এই বয়সেও সাতার শিখা শুরু করেন, নাম গোপন করে রাতভর ফোনে কথা বলা শুরু করেন ওর সাথে। তার স্বপ্ন য্যাসপালকে সত্যি কথাটা জানানো, জানিয়ে ওকে আপন করে পাওয়ার। প্রায় অবাস্তব এই স্বপ্ন কি পূরণ হবে?

এই হল চারজনের জীবন কাহিনী ও তাদের স্বপ্ন, সমান্তরালে চলতে থাকে মুভিতে। সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা এই চার নারীর সমাজের কিছু রীতি-নিয়মকে বুড়ো আঙুল দেখানো, মিথ্যের আশ্রয়, দুষ্কর্মের প্রতি প্রলোভিত ও বাঁচার লড়াইয়ে নিজের অধিকার নিয়ে সমাজের ঠুলির ভিতরেই লুকোচুরি খেলার গল্প ফেঁদেছেন পরিচালক।

তিনি দেখিয়েছেন বোরকার ভিতর আবদ্ধ মুসলিম দুই চরিত্র যেমন কষ্ট আছে, তেমনি কষ্টে আছে বোরকার বাইরে থাকা দুই নারীও। চারজনেই চান শেকল ভেঙ্গে নিজের অধিকারে বাঁচতে। আর এই শেকল ভাংগার হাতিয়ার হিসেবে রুপক অর্থে দেখানো হয়েছে লাল লিপস্টিককে।

মুভিটি থেকে অনেক কিছু শেখার ও বুঝার আছে। মুভির স্ক্রিনপ্লে এবং সিনেমাটোগ্রাফি ভাল ছিল, একঘেয়ে লাগবে না একদমই, এক বসায় দেখে উঠার মত মুভি। আশা করি সবাই একবার করবেন আর একবার হলেও ভাববেন, আপনি আপনার জীবনের গুরুত্বপূর্ণ নারীদের সঠিক সম্মান দিচ্ছেন তো? তবে, অবশ্যই মুভিটি পরিণত দশর্কদের জন্য। কখনো কখনো এটা আপনার ভাবনাকেও করবে পরিনত।

https://www.mega888cuci.com