নিউটন মানেই কিন্তু আপেল গাছ নয়!

স্যার আইজাক নিউটন পৃথিবীর ইতিহাসে যে ক’জন ক্ষনজন্মা বিজ্ঞানী জন্মেছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন৷ আধুনিক পদার্থবিজ্ঞান নিউটনের আবিষ্কার ছাড়া অচল৷ সেই স্কুল জীবন থেকে যে নিউটনের সুত্র পড়া শুরু হয় তার যেন আর শেষ নেই, কলেজ ভার্সিটিতেও এসে পড়তে হয় নিউটনের নতুন নতুন সুত্র৷ তাঁর হাতে ধরেই পদার্থবিজ্ঞান, গনিতশাস্ত্র পেয়েছিল ভিন্ন এক মাত্রা৷

গতিবিজ্ঞান, আলোকবিজ্ঞান, গনিত, তাপবিজ্ঞান, শব্দবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান, রসায়ন, সংগীত, ধর্ম কোন কিছুই বাদ যায়নি যেখানে তাঁর ছোঁয়া লাগে নি৷ ছোট কাল থেকেই তিনি ছিলেন একঘুয়ে, সন্দেহবাতিক, স্বল্পভাষী ও অমিশুক ধরনের মানুষ৷ বিশেষ করে বিজ্ঞানের আবিষ্কারের দিক দিয়ে তিনি এতো বেশি মানুষদের সন্দেহ করতেন যে তিনি সবসময় ভয়ে থাকতেন তাঁর আবিষ্কৃত ফর্মুলা অন্য কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে৷

এই কারণেই নিজের কিছু আবিষ্কার তিনি অনেক পরে প্রকাশ করেছিলেন৷ ১৬৮৭ সালে বের হয় তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ফিলসোফিয়া ন্যাচারালিস প্রিন্সিপিয়া ম্যাথম্যাটিকা’৷ বইটি বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং নিউটন রাতারাতি বিখ্যাত বনে যান৷ এর কল্যানেই তিনি প্রথম বিজ্ঞানী হিসেবে নাইট উপাধি পান এবং লন্ডনের রয়েল সোসাইটির ফেলো নির্বাচিত হন৷

এই বইটি লেখার সময় তাকে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত দিয়ে সাহায্য করেছিল তাঁরই বন্ধু ফ্লামস্টিড৷ কিছুদিন পরেই তিনি ফ্লামস্টিডের সাথে বিতর্কে জড়িয়ে পড়েন৷ ঘটনাটি ছিল এমন- ফ্লামস্টিড কিছু বিষয় নিয়ে গবেষনা করছিলেন৷ একদিন নিউটন তার কাছে কিছু তথ্য চেয়েছিলেন যা ছিল ফ্লামস্টিডের গবেষনার বিষয়৷ স্বাভাবিকভাবেই ফ্লামস্টিড তথ্য দিতে রাজি হন নি৷ এতে নিউটন যান রেগে৷

তিনি নিজেকে রয়েল মানমন্দিরের পরিচালনা পরিষদে অন্তর্ভুক্ত করেন৷ অচিরেই ফ্লামস্টিডের উপাত্তগুলো প্রকাশ করার জন্য তার উপর চাপ দেন৷ কিন্তু ফ্লামস্টিড তাতেও রাজি হননি৷ নিউটনের রাগ গেল আরে বেড়ে৷ এবার তিনি ফ্লামস্টিডের তথ্যগুলো জোর করে হাতিয়ে নেন এবং এডমন্ড হ্যালির (হ্যালির ধুমকেতুর জন্য যিনি বিখ্যাত)নামে প্রকাশ করার ব্যবস্থা করেন৷

দুঃখের ব্যাপার হলে হ্যালি ছিল ফ্লামস্টিডের আজীবনের শত্রু৷ ফ্লামস্টিড আর কোন পথ খোঁজে না পেয়ে সরাসরি আদালতের দারস্থ হন৷ আদালতের কল্যাণে বিচার শেষে নিজের গবেষনা তথ্য ফিরে পেয়েছিলেন৷ এরপর থেকে নিউটন তার প্রিন্সিপিয়া বইয়ের পরবর্তী সংস্করন গুলোতে ফ্লামস্টিডের দেয়া তথ্যগুলো বাদ দিয়ে নিজের বই থেকে ফ্লামস্টিডের নামটাই মুছে ফেলেন৷

নিউটনের সাথে জার্মান গণিতবিধ গডফ্রিড লিবনিজের বিতর্কটি ছিল সবচেয়ে আলোচিত৷ বিতর্কের বিষয়টি ছিল ক্যালকুলাস৷ আমরা সবাই জানি ক্যালকুলাসের জনক নিউটন৷ কিন্তু এখানে একটি বড় ধরনের ঘটনা চাপা পড়ে আছে৷ নিউটনের স্বভাবজাত অতিমত্রার গোপনীয়তা আর অন্যকে সন্দেহ করার প্রবনতার কারণে  ক্যালকুলাস নিয়ে অনেক আগে কাজ করলেও সেসব তত্ত্বগুলো প্রকাশ করেছিলেন ১৭৯৪ সালে আর পুরো মাত্রায় বিবর্ধিত ব্যাখ্যা বের করেন ১৮০৪ সালে।

সে সময় তিনি ক্যালকুলাসকে অনেকটা জ্যামিতির মাধ্যমে প্রকাশ করেছিলেন৷ বর্তমানে ক্যালকুলাসের যে রুপ তা তার হাত ধরে আসেনি৷ ফ্লক্সিয়ান নামে যে ধরনের ক্যালকুলাসের ধারনা তিনি নিয়ে এসেছিলেন তাতে ছিল এমন একটা প্রতীক যা ছিল খুবই বিদগুটে৷ তিনি ও তাঁর কিছু ভক্ত ছাড়া সে প্রতীক আর বিশেষ কেউ ব্যবহার করতেন না৷ কিন্তু ততোদিনে যা ঘটবার ঘটে গেছে৷

জার্মান গনিতবিদ লিবনিজ ক্যালকুলাস নিয়ে তার লেখা প্রকাশ করে ফেলেছিলেন নিউটনের আগে৷ লিবনিজ ক্যালকুলাস নিয়ে কাজ করা শুরু করেন ১৭৭৫ সালে আর তা গুছিয়ে তত্ত্ব আকারে প্রকাশ করেছেন ১৭৮৪ সালে৷ তিনি ক্যালকুলাসের জন্য নিয়ে এলেন সহজ প্রতীক৷ আমরা আজকাল ক্যালকুলাস করতে যে dx, dy, dt এর ব্যাবহার করি তা ছিল লিবনিজের দেয়া৷

লিবনিজের ক্যালকুলাস সবার নিকট জনপ্রিয় হয়ে উঠে৷ নিউটন মনে করতেন ক্যালকুলাসের ধারণাটা লিবনিজ তার কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গেছে৷ ফলে ক্যালকুলাস কে আগে আবিষ্কার করেছে তা নিয়ে শুরু হয় তুমুল বিতর্ক৷ নিউটন বলে নিউটন আবিষ্কার করেছে, লিবনিজ বলে লিবনিজ আবিষ্কার করেছে৷

কাদা ছোড়াছুড়ি শুরু হয়ে যায় ব্রিটেন আর জার্মানির মধ্যে৷ তখন যেকোন আবিষ্কারের স্বীকৃতি দিত রয়েল সোসাইটি৷ তো রয়েল সোসাইটি সিদ্ধান্ত নিল এর একটা তদন্ত করার৷ কিন্তু মজার ব্যাপার হলো ওই সময় নিউটন ছিলেন রয়েল সোসাইটির প্রধান৷ তিনি তাঁর কিছু অনুগত কর্মীকে তদন্তের ভার দিলেন৷ তদন্তের ফলাফল স্বাভাবিকভাবেই নিউটনের পক্ষে ছিল৷

রয়েল সোসাইটি তদন্তের যে ফল প্রকাশ করে তাতে লিবনিজকে নিউটনের ক্যালকুলাস চুরির জন্য দায়ী করা হয় এবং নিউটনকেই ক্যালকুলাস আবিষ্কারের স্বীকৃতি দেয় হয়৷ লিবনিজ কিছুটা নির্ভেজাল প্রকৃতির লোক ছিলেন তিনি আর বেশি উচ্চবাচ্য করেননি৷ নিউটনের আগে সহজ পদ্ধতিতে ক্যালকুলাসের ধারণা প্রকাশ করেও তার কপালে স্বীকৃতি মেলেনি।

https://www.mega888cuci.com