দুটি নক্ষত্রের পতন, একটি সম্ভাবনার মৃত্যু

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে আব্বাস কিয়ারোস্তামি, উডি অ্যালেন, মাজিদ মাজিদি কিংবা রাজকুমার হিরানির মতো চলচ্চিত্রকার না আসলেও মোটামুটি ভিন্ন চিন্তাশক্তি নিয়ে যারা এসেছেন, দুঃখজনকভাবে তাদের সবাইকেই অকালমৃত্যুর কোলে ঢলে পড়তে হয়েছে। এটাকে বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির দুর্ভাগ্যও বলা যেতে পারে।

প্রথমেই বলতে হয় কিংবদন্তি জহির রায়হান ও আলমগীর কবিরের কথা। তাদের ছবির বিষয়বস্তু আর নির্মাণশৈলী ছিলো গতানুগতিক বিনোদনধর্মীর বাইরে গিয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০), ‘স্টপ জেনোসাইড’ (১৯৭১) প্রভৃতি ছবি নির্মাণের পর জহির রায়হানের চিন্তাশক্তি ও নির্মাণশৈলী ধীরে ধীরে যখন আরও পরিণত হয়ে ওঠছিলো, ঠিক তখনই ১৯৭২ সালে মিরপুর থেকে নিখোঁজ হয়ে যান বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এই মহান কারিগর। তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।

আরেক কিংবদন্তি আলমগীর কবিরও অকালমৃত্যুর হাত থেকে রেহাই পাননি। ১৯৮৯ সালে এক মোটরগাড়ি দুর্ঘটনায় মারা যান এই মহারথী। সত্তর ও আশির দশকে যিনি বাংলা চলচ্চিত্রে বক্তব্যধর্মী ভিন্ন ধারার প্রথা জারি করেছিলেন।

যাই হোক, এ দুই চলচ্চিত্রকারের দেখানো পথে যে মানুষটা সবচেয়ে বেশি হাঁটার চেষ্টা করেছেন, এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নিজের জাত চিনিয়েছেন— তিনি হচ্ছেন তারেক মাসুদ।

তারেক মাসুদ— বাংলাদেশের বিকল্প ধারা চলচ্চিত্রের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য নাম। এটা নিছক একটা নামই নয়, বরং একটা শিল্প, একটা ইতিহাস। ১৯৮৫ সালে বিশ্ববরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জীবনের ওপর নির্মাণ করেন নিজের প্রথম প্রামাণ্যচিত্র ‘আদম সুরত’। এরপর ১৯৯৫ সালে নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নির্ভর দু’টি তথ্যচিত্র ‘মুক্তির গান’ ও ‘মুক্তির কথা’। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকে সঙ্গে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কিছু ভিডিও ফুটেজ ব্যবহার করে নির্মাণ করা এই দুটি ডকুমেন্টারি হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তথ্যচিত্র, যা বহু মানুষের হৃদয়ে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে।

২০০২ সালে মুক্তি পায় তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র ‘মাটির ময়না’। এই ছবিটি কান চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং আন্তর্জাতিক সমালোচক পুরস্কার জিতে নেয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের চিত্র সেলুলয়েডের ফিতায় বন্দি করার মধ্য দিয়ে তিনি বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশকে নতুনভাবে পরিচিত করে তোলেন। এছাড়া এ ছবিটি প্রথম বাংলাদেশী সিনেমা হিসেবে অস্কার প্রতিযোগিতায় বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে মনোনয়ন পায়।

সেই সাথে ২০০৪ সালে ব্রিটেনের ডিরেক্টরস গিল্ড পুরস্কারের জন্যও মনোনীত হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রাক-কালীন সময়ে একটি পরিবার যুদ্ধ ও ধর্মের কারণে কিভাবে তিলে তিলে ভেঙে চুরমার হয়ে যায় তার গল্প দেখানো হয়েছে এই ছবিতে। ছবির প্রেক্ষাপট গ্রাম হওয়ায় গ্রামীণ চিত্রও বেশ ভালোভাবে ফুটে ওঠেছে।

২০০৬ সালে মুক্তি পায় তারেক মাসুদের দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘অর্ন্তযাত্রা’। একজন প্রবাসী বাঙ্গালী নারী ও তার ছেলের স্বদেশ যাত্রার কাহিনী নিয়ে সিনেমার গল্প সাজানো হয়। ছবিটি ঢাকা আর্ন্তজাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সেরা চলচ্চিত্র’ হিসেবে নির্বাচিত হয়। একই বছরে দিল্লিতে আয়োজিত ‘এশিয়ান সিনেফ্যান’ উৎসবে সমালোচকের দৃষ্টিতে সেরা চলচ্চিত্রের খেতাবও অর্জন করে।

২০০৮ সালে মুক্তি পায় তারেক মাসুদ ও তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ নির্মিত উর্দু ভাষায় স্বল্পদৈর্ঘ্যের থ্রিলার ‘নরসুন্দর’। মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে তৈরী ১৫ মিনিটের এই পলিটিক্যাল থ্রিলার মুভিটি ‘রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ’ নামক একটা সংস্থার অর্থায়নে নির্মাণ করা হয়। যারা সারা বিশ্বে অভিবাসী ও আটকে পড়া উদ্বাস্তু মানুষদের নিয়ে কাজ করে।

২০১০ সালে আসে তারেক মাসুদের আরেকটি বিখ্যাত ছবি রানওয়ে। ২০০৫-০৬ সালে বাংলাদেশে চলমান জঙ্গিবাদ ও মৌলবাদ ইস্যু নিয়ে নির্মিত হয়েছে সিনেমাটি।

১৯৫৭ সালের ৬ ডিসেম্বর ফরিদপুরের ভাঙ্গায় জন্মগ্রহণ করেন এই কিংবদন্তি। তার বাল্যকালের প্রায় পুরোটা সময়ই কেটেছে স্থানীয় মাদরাসায়। দেশ স্বাধীনের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর করা তারেক মাসুদের পরবর্তী স্বপ্নের প্রজেক্ট ছিলো ‘কাগজের ফুল’। ‘মাটির ময়না’র প্রিক্যুয়েল হিসেবে তিনি ভারত ভাগ ও পরবর্তী সময়কে ধরতে চেয়েছিলেন সেলুলয়েডের মাধ্যমে। কিন্তু ছবির শুটিং স্পট দেখে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় আকস্মিকভাবে মহাপ্রয়াণ ঘটে এই সিনেমা ফেরিওয়ালার।

তার অন্যান্য প্রামাণ্যচিত্রগুলি মধ্যে ‘নারীর কথা’, ‘ইন দ্য নেইম অব সেফটি’, ‘আ কাইন্ড অব চাইল্ডহুড’, ‘ভয়েসেস অব চিলড্রেন’ উল্লেখযোগ্য। স্বল্পদৈঘ্য ছবিগুলো হলো— সোনার বেড়ি, সে, নরসুন্দর, শিশু কথা, নিরাপত্তার নামে, বিপন্ন বিস্ময়, নিরপরাধ ঘুম, ‘সুব্রত সেনগুপ্ত ও সমকালীন বঙসমাজ’ এবং ‘ইউনিসন’ ইত্যাদি।

___________________________________

মিশুক মুনীর— পুরো নাম আশফাক মুনীর মিশুক। শহিদ বুদ্ধিজীবী ও নাট্যকার মুনীর চৌধুরীর ছেলে। ক্যামেরার কারসাজি দেখিয়ে করে সে সব বাঙালী আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটা নিজস্ব জায়গা করে নিয়েছেন, মিশুক মুনীর তাদের অন্যতম।

১৯৫৯ সালে ঢাকায় জন্মগ্রহণ করলেও তার গ্রামের বাড়ি নোয়াখালী জেলায় চাটখিল থানায়। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি একুশে টিভিতে ‘হেড অব নিউজ অপারেশনস’ এবং এটিএন নিউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি ঘাতক ও দোসররা যখন তার বাবা শিক্ষাবিদ মুনীর চৌধুরীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিলো, কিশোর বয়সী মিশুক মুনীর ছিলেন তার প্রত্যক্ষদর্শী।

তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’র প্রধান চিত্রগ্রাহক এছাড়াও তিনি ‘টোকাই’ ‘রিটার্ন টু কান্দাহার’ ‘ওয়ার্ডস অব ফ্রিডম’-সহ বিভিন্ন ফিল্ম ও প্রামাণ্যচিত্রে কাজ করেছেন।

২০১১ সালের ১৩ আগস্ট ‘কাগজের ফুল’ ছবির লোকেশন দেখে ঢাকা ফেরার পথে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে বাসের সঙ্গে  মাইক্রোবাসের মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। ঘটনাস্থলেই তারেক মাসুদ, মিশুক মুনীরসহ আরো ৩ জন নিহত হন। বাংলাদেশের আকাশ থেকে দু’টি নক্ষত্রের পতন হয় সেদিন, একই সাথে চিরতরে মৃত্যু হয় একটি সম্ভাবনার।

https://www.mega888cuci.com