দুই বাংলার সিনেমা: যেখানে পিছিয়ে ঢালিউড

দেখছিলাম অরিন্দম শিলের ‘ব্যোমকেশ পর্ব’ মুভটি। অরিন্দম শিল পরিচালিত ব্যোমকেশের সবগুলো মুভিই আমি দেখেছি। তাছাড়া ফেলুদা সিরিজের সবগুলোই দেখা হয়েছে আমার। ব্যোমকেশ পর্ব দেখতে দেখতেই কোলকাতা বাংলা ছবি আর বাংলাদেশি বাংলা ছবির পরিচালক কিংবা চিত্রনাট্যকারের ভাবনার বৈপরীত্য এবং সেই বৈপরীত্যের ধারাবাহিকতা কিভাবে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধারণ করে রেখে সেই ভাবনাগুলো মনে উঁকি  দিলো।

আমি মুভিখোর না হলেও ক্লাসিক এবং কনটেম্পরারি মুভি আমি কম-বেশি দেখেছি;   দেখার চেষ্টা করি। উপরের প্রসঙ্গে কথা বলার জন্য দেখা মুভির মোটামুটি একটা স্যাম্পল সাইজ আমার হয়েছে হয়তো। আলোচনায় যাওয়ার আগে একটা ছোট প্লট ভাবি এবং সেই প্লটটার কনটিনুয়েশান (কাছাকাছি প্লট) দুই বাংলার বিভিন্ন ছবিতে কিভাবে এসেছে অথবা আসে সেটা নিয়ে একটু ভাববো।

ধরে নেই, ছবির কেন্দ্রীয় চরিত্র (নায়ক) যার ফোকাসড্ দিক এবং তার কার্যকলাপ তার কিছু শত্রু সৃষ্টি করেছে (ভিলেন)। নায়ক ভিলেন নির্মূলের দায়িত্ব পালন করে, অন্যদিকে ভিলেন নায়ক প্রতিরোধের উপায় খোঁজে। এই উপায়টাকু দুই বাংলার পরিচালকরা যেভাবে খোঁজেন কিংবা এতোব্দি খুঁজেছেন সেগুলো কেমন?

কলকাতার চিত্রনাট্যকাররা সাধারণত যেটা করেন, যেহেতু বিবাদ নায়কের সাথে ভিলেনের; প্রতিরোধ বা প্রতিকারের যাবতীয় যত চেষ্টা বা কৌশল সবকিছুই নায়ক এবং ভিলেন এই দুজনের মধ্যেই সাধারণত সীমাবদ্ধ থাকবে। ব্যোমকেশ গল্পে, আপনি   কখনোই দেখবেন না, শত্রুপক্ষ ব্যোমকেশের স্ত্রী সত্যাবতীকে ব্যোমকেশ বশীকরণের টোপ হিসেবে দেখিয়েছে।

ফেলুদা সিরিজের দ্বিতীয় মুভি, ‘জয় বাবা ফেলুনাথে’ মগনলাল ফেলুদার সামনে জটায়ুকে হেনেস্তা করেন কিন্তু সেটাও ঝিকে মেরে বউ শিক্ষা দেয়ার মতো উপলক্ষ সৃষ্টি করার জন্য  নয়। মগনলাল যে খতরনাক ধরণের একজন মানুষ হতে পারেন ফেলুর জন্য সেটা পরিষ্কার করার জন্য।

এই দিকটা কলকাতার গোয়েন্দা মুভিগুলো ছাড়াও অন্য জনরার মুভিগুলোতে এই অ্যাপ্রোচের বৈচিত্র্য থাকলেও স্কেলিটনটা কিন্তু একিই! তবে বাণিজ্যিক ছবিগুলোতে এর ব্যতিক্রম যে ঘটেনি/ঘটেনা সেটা নয়।

বাংলাদেশি চিত্রনাট্যকাররা যেটা ভাবেন (ভেবেছেন), করেন (করেছেন)- ভিলেন প্রথমেই খবর নেন; নায়কের পরিবারে কে কে আছেন; যদি কেউ না থাকেন তবে নায়কের প্রেমিকা/স্ত্রী আছে কি না। নায়ককে প্রতিরোধের নজর নায়কের প্রতি নজর না দিয়ে তার সাথে সম্পৃক্ত মানুষদের শাস্তি দেয়ার নায়ককে প্রতিরোধ করা।

কিন্তু এমন তফাতের পেছনের সাইকোলজিটা কেমন?

এমন তো না, বাংলাদেশি সমাজে একজনের অন্যায় বা ভুলের জন্য তার মা কিংবা ভাই-বোনকে শাস্তি দেয়ার ঘটনা  সচরাচর ঘটে/ঘটেছে। কালামের সাথে সালামের মারামারির জের ধরে সালামের বোন সালমার দিকে কালাম কুনজরে তাকানো শুরু করে দেয় না। বরং কয়েকজন বন্ধু মিলে সালামের হাত-পা ভাঙ্গার চেষ্টাই বাস্তবিক মনে হয়। তাহলে বাংলাদেশী সিনেমায় এই ইরেশনাল এবং কাওয়ার্ড অ্যাপ্রোচটা কেন বহতা নদীর মতোই বহমান? (ব্যতিক্রম তো আছেই- অসাধারণ মুভি বাংলাদেশেও অনেক তৈরি হয়েছে, এখনও হচ্ছে)

তবে মুভি তৈরির বাজেটই এক্ষেত্রে বড় ইস্যু না ইরানী মুভিগুলো বিচার-বিশ্লেষণ করলে আমরা সেটা বুঝতে পারি।

আমার কাছে মনে হয়, মস্তিষ্কের অনুর্বরতা অথবা বুদ্ধিভিত্তিক চর্চায় অনীহা, অপারগতা, আলস্য এর অন্যতম কারণ।টিপিক্যাল এই ধারাটা ফলো করার পেছনে আরেকটা কারণ হতে পারে- অজ্ঞ দর্শকের সেন্টিমেন্টকে পুঁজি করার প্রবণতা।

ডান হাত বামে ঘাড় ঘুরিয়ে এনে ভাত গেলার প্রবণতা। এখানকার মানুষ রেইপ দেখতে কিংবা অশ্লীল কথোপকথন অনুৎসাহ বোধ না করলেও, স্বামী-স্ত্রীর প্রাসঙ্গিক রোমান্টিক দৃশ্যে অ্যালারজিক।

বাংলাদেশি চিত্রনাট্যকারগণ ক্লাসিকাল সময়ে উঠোনের কোণে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে পাওয়া গুপ্তধনের কলস সযত্নে আলিঙ্গন করে রেখেছেন।

https://www.mega888cuci.com