দিনাজপুর: ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের ভাণ্ডার

২০১৩ থেকে দিনাজপুর যাবো যাবো করে শেষমেষ দিনাজপুর যাওয়া হলো কিছুদিন আগে। উদ্দেশ্য দিনাজপুর ভ্রমণ। বলে রাখা ভালো কোনো নতুন জায়গা দেখতে পারলেই আমার ভালো লাগে, বিখ্যাত হোক বা না হোক। আর আমার বেশিরভাগ ট্যুরের সময়কাল ২ থেকে ৩ দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে।

ঢাকা থেকে দিনাজপুর গিয়েছিলাম ট্রেনে করে (দ্রুতযান এক্সপ্রেস)।  ভাড়া: ৪৮০ টাকা (শোভন চেয়ার)। ট্রেন কমলাপুর থেকে ছাড়ে রাত ৮ টায় এবং ভোর ৫/৫.৩০ টার দিকে দিনাজপুর স্টেশনে পৌছে। দিনাজপুর যাওয়ার অনেক ভালো ভালো বাস ও আছে। ৭-১০ ঘন্টার মধ্যে বাসে ঢাকা টু দিনাজপুর যাওয়া যায়। তবে টাংগাইল মহাসড়ক এর জ্যামে একবার পরলে খবর আছে! তাই আমার মতে ট্রেনই ভালো।

যেখানে থাকবেন

বড় ভাই দিনাজপুরে থাকায় আমার কোনো হোটেলে বা অন্য কারো বাসায় উঠতে হয়নি। তবে  রেলওয়ে স্টেশন এর আশেপাশে মোটামুটি ভালো থাকার হোটেল রয়েছে। রুম ভাড়া : ৪০০* (এসি), ২০০* (নন এসি)।

যা দেখার আছে

আগেই বলেছি কোথাও গেলে বিখ্যাত জায়গাগুলোর পাশাপাশি আমি আশেপাশের জায়গাগুলোও ঢুঁ মারা পছন্দ করি। দিনাজপুরে দেখার মতো জায়গাগুলো হচ্ছে: কান্তজীর মন্দির, নয়াবাদ মসজিদ, মোহনপুর রাবার ড্যাম, রামসাগর, হাজী দানেশ ইউনিভার্সিটি, দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ ইত্যাদি। এছাড়াও দিনাজপুর সিটিতে অনেক জায়গা আছে ঘোরার মতো।

যেভাবে যাবেন

১. কান্তজীর মন্দির: দিনাজপুরের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ট্যুরিস্ট স্পট বলা যায় এটাকে। প্রাচীন আমলে বানানো এই মন্দিরটির প্রতিটি ইঞ্চি টেরাকোটা নকশায় সজ্জিত। দিনাজপুর বাসস্ট্যান্ড এ গিয়ে বললেই হবে কান্তনগর যাবো। ভাড়া -২৫/৩০ টাকা*। কান্তনগরে নেমে অটোরিকশা অথবা ভ্যানে ৫-১০ টাকা করে কান্তজীর মন্দিরে যাওয়া যায়। আমরা গুগল ম্যাপ অন করে কান্তনগর থেকে হেটে হেটে কান্তজীর মন্দিরে গিয়েছিলাম। রাস্তার দুপাশের ভুট্টা খেত, খালি মাঠ আর প্রাকিতিক সৌন্দর্য্য দেখতে দেখতে ১০ মিনিটের মধ্যেই কান্তজীর মন্দিরে পৌছে যাই।

২. নয়াবাদ মসজিদ: কান্তজীর মন্দির থেকে প্রায় ২ কি.মি দূরে নয়াবাদ মসজিদ। এটিও অনেক আগে বানানো একটি স্থাপত্য। কান্তজীর মন্দির থেকে রিকশা বা অটোতে করে নয়াবাদ মসজিতে যাওয়া যায়। এছাড়া হেটেও ১৫-২০ মিনিটে যাওয়া যায়। মন্দির থেকে নয়াবাদ মসজিদে যাওয়ার রাস্তার দুপাশে প্রায় পুরোটাই লিচু বাগান। লিচুর দিনে গাছগুলোতে এতো লিচুফুল থাকে যে সবুজ গাছ সাদা হলুদ বর্ণ ধারন করে। সে এক অপরূপ সৌন্দর্য। নয়াবাদ মসজিদ ঢেপা নদীর কাছাকাছি অবস্থিত। হাতে যদি সময় থাকে তাহলে ফিরার সময় ঢেপা নদীর পাড় ধরে কিছুক্ষণ হেটে আস্তে পারেন।

৩. রামসাগর দীঘি: রামসাগর দীঘি তেজপুর গ্রামে অবস্থিত। দিনাজপুর থেকে অটোতে ৪০ মিনিটে রামসাগর যাওয়া যায়। দীঘিতে ঘুরতে যাওয়ার পাশাপাশি দীঘির পানিতে কিছুক্ষণ সাঁতার ও কেটে আসতে পারেন।

৪. মোহনপুর রাবার ড্যাম: আত্রাই নদীর উপর করা রাবার ড্যাম ও ঘুরার মতো একটি যায়গা। অনেকেই এখানের স্বচ্ছ টলমলে পানিতে গোসল করেন। তবে পানি বেশি থাকলে এখানে না নামাই ভালো। এখানে যেতে হলে দিনাজপুর বাস স্ট্যান্ড থেকে ফুলবাড়ি যাওয়ার বাসে উঠতে হবে। বাসের হেল্পারকে বললেই রাবার ড্যামে নামিয়ে দিতে বললেই হবে। ভাড়া-২০ টাকা। মোহনপুর রাবার ড্যামে আমরা গিয়েছিলাম বিকালে। প্রথমে পানি অল্প থাকায় পানিতে নেমে কিছুক্ষন হাটি। এরপর হঠাৎ নামে শিলা বৃষ্টি। ড্যামে পানি প্রবাহ এতো বেড়ে যায় যে পআনআনিচচে থাকলে হয়তো স্রোতের টানে আমরা ভেসেই যেতাম।

৫. হাজী দানেশ বিশ্ববিদ্যালয়: অটোতে করে যাওয়া যায় বিশ্ববিদ্যালয়ে। ক্যাম্পাস যথেষ্ট গুছানো ও সুন্দর।

৬. দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ: বড় ভাই এর ক্যাম্পাস হওয়া সত্বেও মেডিকেলের ভিতরে ঢুকা হয় নি। তবে গেটের বাইরে থেকে কলেজটা দেখার মতো ছিলো।  কলেজ বিল্ডিং, কলেজের সামনের বাগান সবমিলিয়ে সুন্দর একটা ক্যাম্পাস।

এগুলো বাদেও দিনাজপুরে রয়েছে স্বপ্নপুরী, দিনাজপুর রাজবাড়ি, নবাবগঞ্জ জাতীয় উদ্যান।  সময় এর অভাবে এগুলো ঘুরতে যাওয়া হয় নি।

যেখানে খাবেন

ভালো মানের অনেক হোটেল আছে দিনাজপুরে। সবগুলোতেই খাওয়া যায়।  খাবারের দাম ও ঠিকঠাক। এখানকার নামকরা একটি হোটেল হলো ‘বেড়ার হোটেল’। মেইন টাউন থেকে ২০/৩০ টাকা রিক্সাভাড়া লাগে বালুয়াডাংগা বেড়ার হোটেলে যেতে।  পরিবেশ মোটামুটি, তবে খাবারের স্বাদ অতুলনীয়। হাতে সময় থাকলে অবশ্যই যাবেন।

আমার দেখা দিনাজপুর এতটুকুই ছিলো। দিনাজপুর আমাকে নিরাশ করেনি। দিনাজপুর থেকে ঢাকা ফেরার দিন সন্ধ্যা থেকে বৃষ্টি পরছিলো। দিনাজপুর হয়তো চায় নি আমি এতো তাড়াতাড়ি চলে আসি। বাসে উঠে বাইরে বৃষ্টি দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পরেছিলাম খেয়াল নেই। দিনাজপুর আমাকে নিরাশ করে নি।  ট্যুরটা অসম্ভব উপভোগ করেছি আমি। কারো যদি দিনাজপুর ঘুরে দেখার ইচ্ছা থাকে তাহলে দ্বিধা না করে বেড়িয়ে পরুন। আশা করি আপনারাও নিরাশ হবেন না।

শুভ হোক আপনার ভ্রমণ।

https://www.mega888cuci.com