ঢাকার জলাবদ্ধতার সত্যিই কী কোনো সমাধান আছে?

নানামুখী পরিকল্পনা, উচ্চাভিলাষী প্রকল্প এবং কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত বিভিন্ন কর্মসূচি সত্ত্বেও রাজধানী এবং এর আশেপাশের নিচুভূমির বাসিন্দারা এখনও বর্ষাকালে জলাবদ্ধতা সমস্যা ভোগ করছেন।

প্রতিবছরই মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে নগরবাসীদের ব্যাপক আকারে জলাবদ্ধতা সমস্যা ভোগ করতে হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে যা ঢাকা এবং এর আশেপাশে অপরিকল্পিত নগরায়নের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া।

এ সমস্যা শহরের আর্থিক, শারীরিক ও পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করে।

২০১৫ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, যদি জলবায়ু পরিবর্তনকে বিবেচনার বাইরে রেখে, কেবলমাত্র জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আমলে নেয়া হয়, ২০১৪ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে ঢাকার সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ ১১ হাজার কোটি টাকা। পরিবর্তিত জলবায়ুতে, তীব্র বৃষ্টিপাতের ফলে একই সময়ে ক্ষতির পরিমাণ বেড়ে দাঁড়াবে ১৩ হাজার ৯০০ কোটি টাকায়।

বাজে, অপর্যাপ্ত ও অপরিকল্পিত নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে খুব সামান্য পরিমাণ বৃষ্টিতেও ঢাকায় জলাবদ্ধতা ঘটে যে ব্যবস্থা কিনা তিনটি সংস্থা কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত- পানি সরবরাহ ও নিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন।

বিশেষজ্ঞরা নগরের কোনো উন্নয়ন কর্মসূচি ঠিকঠাক বাস্তবায়ন না করতে পারার কারণ হিসেবে নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, রাজউক এবং ঢাকা ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যান (ড্যাপ) এর ব্যর্থতাকে চিহ্নিত করেছেন। বিগত কয়েক বছরের প্রতিবেদন ঘেঁটে দেখা যায়, ঢাকা শহর এববং তার আশপাশ দিয়ে প্রবাহিত অনেক খাল, জলাধার এবং বন্যা প্রবাহ অঞ্চলগুলোকে বাড়িঘর তৈরি করে দখল করা হয়েছে।

নগর পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে রাজউক অভিযুক্ত। অন্যদিকে সরকারও প্রতিনিয়ত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান ও ভূমিদখলকারীদের থেকে চাপের মুখোমুখি হচ্ছে।

ঢাকা ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন, ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসকের দপ্তর, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহণ কর্তৃপক্ষ এবং ঢাকা সেনানিবাস বোর্ড ঢাকা শহর এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে একত্রে কাজ করে যাচ্ছে। এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও অতিসম্প্রতি তার মন্ত্রীসভাকে নির্দেশনা প্রদান করেছেন।

ওয়াসা এবং দুটি সিটি কর্পোরেশন শহরের ১২৮ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরাসরি কাজ করছে। ওয়াসা ৩৭০ কিলোমিটার ড্রেন নিয়ন্ত্রণ করছে, যেখানে ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি একত্রে প্রায় ২ হাজার কিলোমিটার জায়গা দেখভাল করছে।

তবুও, এই শহরের বিপুল পরিমাণ জনগোষ্ঠীর জন্য এই ড্রেনেজ ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় এবং বিদ্যমান নালাগুলিও দ্রুততার সাথে বৃষ্টির পানি অপসারণ করতে সক্ষম হচ্ছে না, কেননা শহরের ২৬ টি সংযুক্ত খাল জমি দখলকারীদের পেটে চলে গিয়েছে।

জলাশয়ের অবস্থা

২৬ টি নালা হতে বুড়িগঙ্গা, বালু, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা, এই চার নদী কর্তৃক যেন রাজধানীর বৃষ্টির পানি অপসারণ করা যায়, নগরীর নিষ্কাশন ব্যবস্থা সে রূপরেখা অনুযায়ী-ই তৈরি করা হয়েছিলো।

ওয়াসার মতে, ঢাকায় ৬৫ টি নালা ছিল কিন্তু কালক্রমে সে সংখ্যা ৪৩-য়ের কমে নেমে এসেছে। ওয়াসা কর্মকর্তাদের মতে, বিদ্যমান নালাগুলির মধ্যে, ভূমিদস্যুদের থাবায় আরও ২০ নালা মৃতপ্রায়।

বিশ্বব্যাংকের সহায়তায়, ঢাকার বৃষ্টি ও ব্যবহৃত পানির টেকসই অপসারণের লক্ষ্যে ২০০৮ সালের সেপ্টেম্বরে সরকার ঢাকা পানি সরবরাহ ও স্যানিটেশন প্রজেক্ট (ডিডব্লিউএসএসপি) শিরোনামে একটি প্রকল্প হাতে নেয়। প্রকল্পের অংশ হিসেবে, খালের বাঁধের ধারে ওয়াকওয়ে, চ্যানেল, লাইন এবং গাছ লাগানোর মাধ্যমে অবৈধ দখল থেকে ২৬ টি নালা উদ্ধার করতে ঢাকা ওয়াসা পদক্ষেপ নেয়। কিন্তু প্রকল্পটি শেষতক সাফল্যের মুখ দেখেনি।

কয়েকটি বিশ্বস্ত সূত্র হতে জানা যায়, ডেভেলপার কোম্পানি হতে অব্যাহত চাপের মুখে সরকার নতুন ড্যাপ পর্যালোচনা করেছে।

চারটি নদী এখনও হুমকির মুখে রয়েছে কেননা ভুমিদস্যুরা বন্দীরা এখনও নদীর তীর ভরাট ও বসতি স্থাপন করে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বন্যা প্রবাহ অঞ্চল দখল করে ডেভেলপার কোম্পানি এবং বিভিন্ন শিল্প প্রতিষ্ঠান নদীর উভয় পাশে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

বিগত ২৫ বছরে, নগর পরিকল্পনাবিদরা বেশ কয়েকবার উল্লেখ করেছেন যে, ঢাকা শহরের দ্রুত নগরায়ন ঢাকাকে নিঃসাড় এলাকায় পরিণত করেছে, প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থায় প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হয়েছে এবং এই সময়ে নদীর অববাহিকা সরু হয়েছে। ফলস্বরূপ, ঝড়ের ঘনত্বের সময় কমে আসছে এবং প্রবাহমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ড্যাপ বিশেষজ্ঞ দলের অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বলেন, ‘এটা বলা যাবে না যে ড্যাপ সম্পূর্ণ সফল ছিল। বিপুল সংখ্যক ভূমি উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান বন্যা প্রবাহ অঞ্চল ভরাট করছে এবং ঢাকার আশপাশের বাঁধগুলো দখল করে নিচ্ছে।’

তিনি বলেন, নগর উন্নয়নের সরকারি পরিকল্পনা পুরোপুরি না মানার কারণে নগরীর কাঠামোগত ও শিল্প বিপর্যয়ের পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।

জামিলুর রেজা বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবহেলার কারণে ড্যাপ এখনও পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। ভূমি উন্নয়নকারীরা রাজউকের পরিকল্পনা লঙ্ঘন করে জমি ব্যবহার করছে।’

অধ্যয়ন এবং সুপারিশ

সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি ঢাকায় জলাবদ্ধতা সমস্যা কমানোর উপায়গুলি খুঁজে বের করার জন্য দুটি বেসরকারী গবেষণা সংস্থা- সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিকাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস এবং ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং -এর শরণাপন্ন হয়েছে। উভয় গবেষণা সংস্থা পরামর্শ দিয়েছে, জলাবদ্ধতা সংকট নিরসনে সমস্ত দখলকৃত জলাশয়কে মুক্ত করতে হবে।

জরিপ পরিচালনার পরে, উভয় গবেষণা দল শহরের আশপাশের নদী এবং বন্যা প্রবাহ অঞ্চলের আয়তন বৃদ্ধি করার সুপারিশ করেছে।

গবেষণাপত্রে বলা হয় যে, চার নদের উভয় তীরে ৫০ মিটার থেকে ৪০০ মিটার বাফার জোন বন্যার পানির নিরবিচ্ছিন্ন প্রবাহ নিশ্চিত করবে, যা ২০৩৬ সালের নতুন ড্যাপ অবধি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিরবচ্ছিন্ন রাখতে পারে।

প্রাকৃতিক নিষ্কাশন ব্যবস্থার দখলদারি বন্ধ করার উদ্দেশ্যে গবেষণায় উন্নয়ন কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পরামর্শ দেয়া হয়েছে, কেননা উক্ত কার্যক্রম সমস্ত জলাধারকে প্রভাবিত করতে পারে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আশুলিয়া, বনশ্রী, আফতাবানগর, বসুন্ধরা, মেরাডিয়া, বাউনিয়া, বাড্ডা, আমিন বাজার ও হাটহাজারীতে অগণিত জলাভূমি ভরাট হবার কারণে রাজধানী জুড়ে জলাবদ্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

নগর পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘জলাবদ্ধতা সংকট নিরসনের জন্য, নিষ্কাশন ব্যবস্থা সবসময় অবিচ্ছিন্ন রাখা প্রয়োজন যা সম্মিলিতভাবে করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সহযোগিতা না করলে সমস্যার সমাধান করা হবে না।’

ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক বলেন, নিষ্কাশন ব্যবস্থা সঠিকভাবে বজায় রাখার জন্য তারা সমস্ত নগর খালের দায়িত্ব নিজেরা তুলে নেবে।

ডিএসসিসি মেয়র মো: সাঈদ খোকন জানান, নগরীর জলাবদ্ধ এলাকায় বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থায় তার কর্পোরেশন কাজ করছে, ‘ঢাকা ওয়াসা আমাদের হাতে তুলে দিলে আমরা সমস্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থার দায়ভার নেবো।’

মেয়র খোকন ইতোমধ্যে এই সমস্যা মোকাবেলার ব্যর্থতার জন্য ওয়াসাকে তিরস্কার করেছেন।

কিন্তু ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক টেকসেম খান জলাবদ্ধতার কারণ হিসেবে ড্রেনে নিক্ষিপ্ত বর্জ্য পদার্থকে দোষারোপ করেন, ‘নিষ্কাশন লাইন এবং খালের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে কেননা তা কঠিন বর্জ্য পদার্থ দিয়ে ভর্তি এবং তা পরিষ্কারের দায়িত্ব দুইটি সিটি করপোরেশনের।’

তিনি আরও বলেন, ‘রাজধানীর চারপাশের বন্যা প্রবাহ অঞ্চলগুলি রিয়েল এস্টেট কোম্পানীর দ্বারা ভরাট হয়ে গেছে।’

ওয়াসা প্রধান আরও বলেন, সুরারেজ ব্যবস্থা এবং পানি নিষ্কাশনের নেটওয়ার্ক উন্নতির জন্য ২০৩৫ সাল অবধি একটি ‘মাস্টার প্ল্যান’ চালু করা হয়েছে।

সিটি করপোরেশন-ই ভবিষ্যৎ

ওয়াসা নালাগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছে এই অভিযোগে, স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়, ওয়াসা থেকে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনেকে নিষ্কাশন ব্যবস্থা রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব হস্তান্তর করেছে।

গত ১৬ জুলাই গুলশানে ডিএনসিসি কার্যালয়ে বিভিন্ন সরকারী অংশীদারদের যৌথ বৈঠকে স্থানীয় সরকারমন্ত্রীর খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, তারা ঢাকা থেকে ২৬ টি খাল দখলকারীদের থেকে উদ্ধারের সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নিষ্কাশন ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

যদিও ওয়াসা ঢাকা ডেপুটি কমিশনারের অফিসের মালিকানাধীন, তবুও খালের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব বছরের পর বছর তাদের হাতেই ছিলো।

উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন ডিএনসিসি মেয়র আনিসুল হক, যেখানে আরও উপস্থিত ছিলেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী মোশাররফ হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, আইনমন্ত্রী এ কে এম রহমতুল্লাহ এবং ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম খান।

পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন ‘ওয়াসা ঢাকার জলাবদ্ধতা সঙ্কটের সমাধান করতে পারেনি। তাই জনগণের চাহিদা সম্পর্ অবগত, জনগণের প্রতিনিধিদের কাছে এই ব্যবস্থার দায়িত্ব দেওয়া উচিত।”

তিনি যোগ করেন, ‘জলাবদ্ধতা সমস্যা মোকাবেলায় পূর্বে গৃহীত প্রকল্পগুলো সফল হয়নি। তাই, দুটি সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্পোরেশনসহ সব সংস্থাকে একত্রে কাজ করতে হবে এবং সমস্যার সমাধানে একটি মাস্টার প্ল্যান তৈরি করতে হবে।’

———-

Can Dhaka’s waterlogging problem really be resolved? শিরোনামে প্রতিবেদনটি আগে ছাপা হয়েছিল ঢাকা ট্রিবিউনে। অনুবাদ করেছেন রিজওয়ান রেহমান সাদিদ

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।