ড্রেসিং রুমে ধুয়ে দিন, প্রেসে আগলে রাখুন

পোস্ট ম্যাচ প্রেজেন্টেশনে দুটি স্বীকারোক্তি দেখলাম।

একটি সরল স্বীকারোক্তি। মুশফিক বললেন, তারা ভাবতে পারেননি উইকেট এতটা ফ্ল্যাট হবে।

আরেকটা ক্ষোভ মেশানো স্বীকারোক্তি। ফাফ দু প্লেসি বললেন, পচেফস্ট্রুমের উইকেটে স্বাগতিক অধিনায়ক হিসেবে তিনি হতাশ। পরের টেস্টে ব্লুমফন্টেইনে অবশ্যই বাউন্সি উইকেট চান। কিছু হলেও ঘাস যেন থাকে উইকেটে।

উইকেটের আলোচনার আগে শেষ দিনে আলো ফেলি। আমাদের জন্য যদিও এদিনের সবই অন্ধকার। একটা দল ৩৫ রানের মধ্যে ৭ উইকেট হারিয়ে ফেললে বিশ্লেষণের কিছু থাকে না।

৩৫ রানে ৭ উইকেট শুনলে মনে হয় বোলাররা বুঝি বিধ্বংসী বোলিং করেছে। উড়িয়ে দিয়েছে। ধসিয়ে দিয়েছে। অথচ ৭ উইকেটের একটিও আনপ্লেয়েবেল ডেলিভারিতে নয়। হতাশার এটিই। আমাদের উইকেটে থাকার ইচ্ছেই ছিল না। লড়াই করার জেদই ছিল না। শরীরী ভাষায় ছাপ মারা ছিল “আত্মসমর্পণ।”

শেষ দিনে লড়াই করে ম্যাচ বাঁচিয়ে ফেলতে হবে, অতটা চা্ওয়া ছিল না। ছিল লড়াই দেখার আশা। সেটির জন্য খুব বেশি কিছু দরকার ছিল না। চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা, শক্ত মানসিকতা। এই তো!

আর দরকার ছিল একটু বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট। সেটাও আসলে খুব সিম্পল। মর্নে মর্কেল নেই। মানে ওদের বোলিং আক্রমণের অর্ধেক শক্তি নেই। শেষ দিনে ওদের ভরসা কাগিসো রাবাদা। এটা বুঝতে তো গবেষণা লাগে না। তো রাবাদাকে উইকেট দেওয়া চলবে না। তার মারার বলও না মারলাম, শুধু ছাড়লাম আর ডিফেন্স করলাম, ব্যস! রাবাদাকে টায়ার্ড করে দিলেই হয়।

কেশভ মহারাজ ছিলেন। তবে তিনি তো রঙ্গনা হেরাথ নন। আর বাচ্চাকাল থেকে বাঁহাতি স্পিন খেলতে খেলতে আমাদের ঝুনা হয়ে ওঠার কথা। রাবাদার প্রথম স্পেলটা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। সেটিকে উইকেট না দিলেই দক্ষিণ আফ্রিকা হয়ত প্যানিক করতো। এরপর লাঞ্চের আগে হয়ত রাবাদার আরেকটি স্পেল। সেটি সামলে নিলে ওরা হতো আরও প্যানিকড! সারাদিনে কয়টা ওভার করত রাবাদা, বড়জার ১৫? সেটুকু সামলালেই চলত। আমরা তার প্রথম ৪ ওভারে ৩ উইকেট হারিয়েই ম্যাচ কার্যত শেষ করে দিয়েছি।

আমরা লড়াই করতে পারিনি। আমরা বুদ্ধিদীপ্ত ক্রিকেট খেলতে পারিনি। টেস্ট দলটা এগিয়ে যাচ্ছিলো। এই টেস্ট একটা রিয়েলিটি চেক করিয়ে দিলো।

দক্ষিণ আফ্রিকায় আমরা ৩৩৩ রানে কেন, ইনিংস ব্যবধানেও হারতে পরি। কিন্তু সেটা যদি ডারবান-কেপটাউনে হতো, টিপিক্যাল দক্ষিণ আফ্রিকান উইকেটে হতো, তাহলে মানতে পারতাম। একদম নিজেদের মত উইকেট এবং বেশ আরামদায়ক কন্ডিশনে আমরা হেরেছি। আমি ধরে নিচ্ছি, এই টেস্ট আমাদের কাছে দেশের মাটিতে ৩৩৩ রানে হারার মত। রিয়েলিটি চেক বলছি সেই কারণেই।

ম্যাচ শেষে সংবাদ সম্মেলনে নিজের বোলারদের এক হাত নিয়েছেন মুশফিক। এর আগেই সংবাদ সম্মেলনে বোলারদের ধুয়ে দিয়েছেন বেশ কবার। তার হতাশাটা বুঝি। পেসাররা একটা জায়গায় বল ফেলতে পারছে না ক্রমাগত। ফিল্ড সেট আপ অনুযায়ী বোলিং করতে পারছে না। সব্ ঠিক আছে। কিন্তু প্রকাশ্যে এভাবে বলাটাও কতটা ঠিক?

এভাবে বললে সংবাদকর্মীরা লুফে নেবে অবশ্যই। নিউজ হবে। দলের কাজের কাজ কতটা হবে? তার চেয়ে এই বার্তা ড্রেসিং রুমে দিন। কঠিন ভাবে দিন। কিলিয়ে-পিটিয়ে, যতটা কড়া ভাবে ঝাড়া সম্ভব, ড্রেসিংরুমে ধুয়ে দিন ওদের। বাইরে, প্রেসের সামনে আগলে রাখুন। এটা বরং বেশি কার্যকরী হতে পারে।

শুরুর প্রসঙ্গে ফিরে যাই আবার। উইকেট। পোস্ট ম্যাচ প্রেজেন্টেশনের পর সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক বলেছেন, টস জিতে বোলিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটি সম্মিলিত। যতদূর জানতে পেরেছি, অধিনায়ক ঠিক কথাটিই বলেছেন। সিদ্ধান্ত তার ছিল না, কোচের একারও ছিল না। শুরুতে ব্যাট করতে অস্বস্তি ছিল দলের ব্যাটসম্যানদের। সেই কারণেই আগে বোলিং নেওয়া। ধরে নিলাম, উইকেট পড়তে ভুল হয়েছে। শুরুতে একটু মুভমেন্ট থাকবে বলেই ধরে নিয়েছিল দল। নাহয় থাকলই একটু মুভমেন্ট, সেটাও তো বড়জোর এক দেড়-ঘণ্টা। ওই সময়টুকু কাটিয়ে দেওয়ার সাহস নেই?

ব্লুমফন্টেইনে নিশ্চিত ভাবেই আর পচেফস্ট্রুমের অতিথি সেবা পাচ্ছে না বাংলাদেশ। সবুজ উইকেট না হোক, তাদের অধিনায়কের চাওয়ার পর অন্তত বাউন্সি উইকেট নিশ্চয়ই হবে। কিন্তু ডেল স্টেইন, ভার্নন ভিল্যান্ডার, ক্রিস মরিসের পর মর্নে মর্কেলকেও হারিয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা। হোক বাউন্সি উইকেট, সামনে একদমই ওদের দ্বিতীয় সারির পেস আক্রমণ। স্রেফ চাই সাহস।

কলিজার কথা বলছিলাম একটু আগে। অনেক সময় ফলাফলের চেয়েও প্রতিপক্ষের সম্মান, ক্রিকেট বিশ্বের শ্রদ্ধা বেশি পাওয়া যায় সাহসী ক্রিকেট খেলে। ইংল্যান্ডের কাছে প্রথম টেস্টে হেরে আমরা ঘুরে দাঁড়িয়েছি, শ্রীলঙ্কায় প্রথম টেস্ট বাজে ভাবে হরে পরের টেস্ট জিতেছি। দক্ষিণ আফ্রিকায় তুলনায় অনেক কঠিন হলেও অসম্ভব নয়। আশা করতেই পারি।

তবে কলিজাটা গুরুত্বপূর্ণ। বড় দল হয়ে উঠতে হলে বড় কলিজার প্রমাণটা দেখাতে হবে।

– ফেসবুক থেকে

https://www.mega888cuci.com