ডিপ্রেশনে না ভুগে দৃষ্টিভঙ্গী পাল্টান

আমাদের দেশের বিশাল একটা জনগোষ্ঠি ডিপ্রেশনে ভুগছে।

আমি তাদের অনেকের সাথে কথা বলেছি। নিজেকে ডিপ্রেশন বিশারদটাইপ কিছু মনে করি না, কিন্তু আমার মনে হয়েছে, তারা যদি কারো কাছে নিজেদের কথাগুলো বলে হালকা হতে পারে, এতোটুকু তো আমি করতেই পারি। সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা নিয়ে মানুষ ডিপ্রেশনে ভুগছে – সেটা বেকারত্ব। বিডিজবসে লক্ষ লক্ষ সিভি, চোখের সামনে লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার।

আমাদের দেশটা ছোট, এই ছোট দেশে ১৭ কোটি মানুষ ঠেসাঠেসি করে জীবনযাপন করে। অনেক ক্যালকুলেশন করে বাইর করলে দেখা যাবে যে, আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষের টার্গেট একটাই – কম পরিশ্রমে অধিক অর্থ উপার্জন। শুধু তাই নয়, আমরা মানুষকে বিচারও করে থাকি টাকার পরিমাণ দিয়ে। খোলাচোখে চারপাশে তাকালেই আমরা দেখতে পাবো স্বল্পতম পরিশ্রমে অধিক উপার্জনে প্রথম স্থানের অধিকারী সবাই সরকারের নানাবিধ কর্মকর্তাগণ।

সুতরাং, জীবনের লক্ষ্য একটাই – সরকারী চাকরী চাই।

কিন্তু মামা পৃথিবী থিকা চান্দের দূরত্ব তো আর সবার মনে থাকে না। বিসিএস নামক খিচুড়িসদৃশ পদার্থটি গলধ:করণ, এবং পরীক্ষার হলে সকল নাম-দেশ-মুদ্রা-রাজধানী উল্টিয়ে সারাজীবন সাহিত্য নিয়ে পড়া সবছেলে তো পুলিশ প্রশাসনে দেশের সেবা করতে পারে না, তাই না? তো কি হয় এই বিশাল বেকার জনগোষ্ঠির?

তারা পুন: পুন: চেষ্টা করতে থাকে। চেষ্টা করতে করতে যখন দেখে আর কিছুদিন পরে প্রথম প্রেমিকা মাতামহ হওয়ার দিকে আগাইতেসে, তখন ‘প্রাইভেটে’ ‘জব’ খুজতে শুরু করে। আপনি বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আদিমতম গালি শুনতে চাইলে এই জনতার সাথে দুএকদিন চা-নাস্তা খেয়ে দেখতে পারেন।

‘সব শালা দেশের দোষ। এমন *** দেশে জন্মাইসি, শালা এমএ পাশ করে পিয়নের চাকরি পাই না।’

আপনার কি মনে হয়, আপনি আমেরিকায় গেলে সেখানে লোকজন আপনাকে ফুল নিয়ে, মালা নিয়ে, চাকরি দিতে আসবে?

ভাই, সত্যি কথাটা বলি। জাতি হিসেবে আমরা পরশ্রীকাতর। আমরা কুশিক্ষায় শিক্ষিত। আমরা নিজেরাই নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে কাজ করিনা, একের পর এক দোষারোপ করে চলি। আমরা অলস এবং অসৎ। আমরা অদক্ষ এবং অযোগ্য। ফ্রাস্টেশন ইস্টিশনে ফালায়া আসেন, আপনার ভাগ্যের জন্য আপনি দায়ী।

আপনি বেকার? ভালোকথা। ২৬ টা বছর ধইরা কি ফালাইসেন স্কুল, কলেজ, ভার্সিটিতে? আপনার জবসাইটে কমপ্লিট প্রোফাইল আছে – নাই। আপনার লিংকডইনে প্রোফাইল আছে – নাই। আপনি পড়ার বইয়ের বাইরে নিজের স্কিল ডেভেলপ করার জন্য শিখসেন কোনদিন কোনো কিসু? – না। রান্না করতে পারেন? – না। প্রোগ্রামিং জানেন? – না। ওয়েল্ডিং পারেন? সেলাই? ওয়েবসাইট ডিজাইনিং? কারপেন্টিং?

আপনি কিছুই জানেন না, কিছুই পারেন না। আপনি পাতার পর পাতা মুখস্ত করসেন আর নানান জায়গায় গিয়া চেকইন দিয়ে ভাবসেন দেশের জন্য বিরাট কাম কইরা ফালাইসি। আপনি বছর বছর পরীক্ষা দিসেন আর সার্টিফিকেট প্রশব কইরা ভাবসেন এইবার আমার টাইম, দেশমাতা আমারে পরান ভইরা রিটার্ন দিবো।

আপনারে আপনার বন্ধু শিখাইসে বিবিএতে ফিন্যান্স না নিতে। আপনার আব্বা আর্টসে পড়াইসে কারণ আপনি অংক পারেন না। আপনি স্যুট-টাই পইড়া কর্পোরেট জীবন চান, শুধু চান না, সেই জীবন পাওয়ার জন্য কোন পরিশ্রম করতে। আপনি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির জব চান, জানেন না একটা মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানি কিভাবে কাজ করে। আপনি বিজনেস ম্যাগনেট হৈতে চান, কিন্তু বিনা পরিশ্রমে, বিনা ক্যাপিটালে।

দেশে ব্যাঙের ছাতার মত এতো ওয়েডিং পেজের রহস্য জানেন? এতো সহজে আর কোথাও কোনভাবে সিইও হওয়া যায় না।

ফেসবুকে খালি লাইক দিয়া গেসেন, খালি চ্যাটই কইরা গেসেন, খালি সেলফিই দিয়া গেসেন। এতো এমবি জুকারবার্গরে না দিয়া কিছু টিউটোরিয়াল বেসড ওয়েবসাইটকে দিতেন, কিছু পর্ণ কম দেইখা ডকুমেন্টারি দেখতেন, কিছু সময় অন্যকে দোষারোপ না করে নিজে নতুন কিছু করার চিন্তা করতেন। সোলায়মান সুখনের মোটিভেশন আপনাকে সাপোজিটরি দিয়া দিলেও কিছু হবে না, যদিনা আপনার মাথায় কিছু থাকে।

সব ইন্টারভিউ বোর্ডে তো আর জব্বার কাগু থাকে না, যে আপনারে জিগাইবো – বাংলাদেশের বাংলা কিবোর্ডের জনকের জন্ম কতো সালে?

বাংলাদেশের প্রায় সব নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে অভিজ্ঞতা চায়। কেন জানেন? কারণ, আমরা আমাদের সারা জীবনে স্কুল-কলেজ-ভার্সিটিতে যা পড়ি, তার সিকিভাগও কর্মক্ষেত্রে আমাদের কাজে লাগে না। যে ছেলেটা পড়াশোনার পাশাপাশি তার নিজের কোন স্কিল ডেভেলপ করে, সে আপনার মত দিন-রাত আফসোস করে না। আপনি ভাগ্যকে দোষারোপ করেন, সরকারকে দোষারোপ করেন, দেশকে দোষারোপ করেন, তারপর বিদেশ গিয়ে বাথরুম সাফ করেন। সেই ছেলেটা এই দেশে বসে নিজের ভাগ্য নিজে বানায়, আপনার মত কিছু আবর্জনাকে তার কোম্পানিতে চাকরি দেয়।

আমি প্রায়ই বলি, আমরা সুশিক্ষিত না, কুশিক্ষিত। শিক্ষার কাজ মানুষকে অহংকার মুক্ত করা কোনটা সঠিক কোনটা সঠিক নয় বুঝতে শেখানো; কিন্তু আমাদের দেশে হয় উল্টা। সুইপার বাপের ছেলে ইন্টার পাশ করে বাপের পরিচয় দিতে লজ্জা পায়। গোল্ডেন এ প্লাস পাইসে, এখন আর সে রিকশার গ্যারেজের মালিক হতে পারবে না। নিজের বাপ যে মুরগির খামার দিয়ে ৩/৪ ভাইবোনকে লেখাপড়া শিখেয়ে বের করেছে, ছেলে বিএ পাশ করে সেই খামারকে নিজের বুদ্ধিতে বাড়াতে চেষ্টা করবে না। আমাদের শিক্ষা আমাদের কাজ করার এ্যাটিচুডকে ধ্বংস করে দিয়েছে, আমাদের পরশ্রীকাতর সরিসৃপসদৃশ কোন অমেরুদন্ডী প্রাণীতে পরিণত করে ফেলেছে, যাদের একমাত্র কাজ ফেসবুকে কার বুকে কাপড় আছে নাকি নাই সেইটা পর্যবেক্ষণ করা।

আমরা কথায় কথায় ভারতকে গালি দিই। দেশের বাইরে গিয়া দেখেন, এনআরআই দিয়া তারা ভরায়া ফেলসে বিশ্ববাজার। কতোগুলো রিসার্চ ফার্ম কাজ করতেসে দিনের পর দিন, টেকনোলজিতে লাফায়ে আগাইতেসে তারা। আমেরিকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মোট ছাত্রের একটা বড় অংশ ভারতীয়। খোলা পায়খানা নিয়ে জোক করতে করতে একদিন প্রাচ্যের অক্সফোর্ডের পিছে গিয়া বাদাম বেচতে হবে, শিখবেন না কিছু।

যারা বলেন এইদেশে কিছু সম্ভব না, তারা আবুল খায়ের সাহেবের কথা শোনেনাই। তারা আকিজ সাহেবের কথা শুনে নাই। যারা ভাবে দেশকে কিছু দেয়া সম্ভব না, তারা পলান সরকারের কথা শুনে নাই। যারা মনে করে ভাগ্য উন্নয়নের জন্য চেষ্টার দরকার নাই, তাদের ভাগ্য স্রষ্টাও কখনো পরিবর্তন করবেন না।

আব্রাহাম লিংকন আফসোস কইরা প্রেসিডেন্ট হয় নাই। কলেজ ড্রপআউট হয়েও স্টিভ জবস যা করসে, আপনি ভার্সিটি কাবেল হৈয়াও তা করতে পারতেসেন না কারণ আপনার মাঝে সেই দৃষ্টিভঙ্গিই নাই। চেঞ্জ দ্য ওয়ে ইউ লুক অ্যাট থিংস অ্যান্ড দ্য থিংস ইউ লুক অ্যাট উইল চেঞ্জ!

https://www.mega888cuci.com