জীবন যুদ্ধের নিলামে ওঠা বন্ধুত্ব

আমাদের প্রাইমারি স্কুল ছিল পল্লী গাঁয়ে। তখন গ্রামের স্কুলে খাতার ব্যবহার অতোটা হয়ে ওঠেনি। খাতার বদলে স্লেটে লিখতাম আমরা। স্লেটে লিখলে আবার মুছে ফেলা যেতো। স্কুলের কড়াকড়ি ছিল স্লেট চকচকে রাখার। আমাদের স্লেট চকচকে না থাকলেও ক্লাসের একজনের স্লেট সব সময় চকচকে থাকতো। ওর নাম ‘লালচান’। লালচানের স্লেট চকচকে রাখার কৌশল আমরা রপ্ত করতে চাইলেও পারিনি। কেন যেন ওর স্লেট সব সময় সবার চেয়ে চকচকে থাকতো।

লালচানের হাতের লেখা ছিল সবচেয়ে সুন্দর, স্লেটে লেখা অনেক কঠিন ছিল। অনেকটা কিউনিফর্মের মতো। আমাদের বাচ্চা হাতে স্লেটে লেখা কঠিন ছিল বেশ! কিন্তু লালচান খুব সহজভাবেই স্লেটে লিখতে পারতো, লালচানের হাতের লেখার খুব প্রশংসা করতেন স্কুল পরিদর্শক ও ম্যাডামরা।

দেখতে দেখতে আমাদের প্রাইমারী স্কুল জীবন শেষ হয়ে গেলো। লালচান গ্রামের স্কুলে ক্লাস ফোর থেকে সিক্সে ভর্তি হলো, আমি ফোর থেকে অন্য স্কুলে ক্লাস ফাইভে ভর্তি হলাম।

লালচান আমাকে খুব পছন্দ করতো। ও আমাকে বললো, দোস্ত সিক্সে ভর্তি হ, আমরা একসাথে ক্লাস করবো।

আমি ওর কথা শুনে হাসি।

লালচানের বাড়ি ছিল আমাদের থেকে বেশ দূরে। ওর সাথে আর তেমন দেখা হয়নি।

প্রাইমারি স্কুল শেষে আমি ভর্তি হলাম মানিকগঞ্জ জেলা শহরে সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে।

স্কুলে যাবার পথে লালচানের বাড়ির পথ ধরেই যেতাম। এলাকায় নতুন রাস্তা করা হচ্ছে, ব্রিজের সাথে লাগোয়া রাস্তা। সে রাস্তায় নতুন মাটি ফেলা হচ্ছে।

সেখানে অনেকেই মাটি কাটার কাজ করছে। একদিন মাটির বোঝা মাথায় নিয়ে লালচান ডাকলো আমাকে।

চেয়ে দেখি আমার বন্ধু লালচান।

সে পড়ালেখা ছেড়ে এখন মাটিকাটার কাজ করছে। আমি স্কুলে যাচ্ছি ও মাটি কাটা বাদ দিয়ে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছে। ওদিকে আমার চোখ বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পরছে।

ওর মা ছিল না, হতদরিদ্র ঘরের ছেলে। অভাবের কারণে আর হয়ে ওঠেনি কিছুই। হাতে রঙ বেরঙের কলমের বদলে তুলে নিয়েছে কোদাল। হাতের লেখা প্রতিযোগীতায় যার প্রথম হবার কথা সে মাটিকাটার প্রতিযোগীতায় নিজের পেটকে হার মানানোর কাজে ব্যস্ত এখন।

এখনো দেখা হয়, সেই লালচান। আগের মতোই হাসিমুখ, সেই ক্লাস সিক্সের মতো এখনো দেখা হলে বলে – ‘কিরে রনি!’

নটর ডেম কলেজে ভর্তি হবার পরে প্রতি সপ্তাহেই বাড়ি যেতাম। প্রথম বর্ষে পড়ার সময় বাড়ি যাচ্ছিলাম একদিন। নবীনগর স্মৃতিসৌধের ওখান থেকে বাসে উঠি। বাস চলছিল…

বাসে ‘রনি’ বলে কে যেন ডাকলো। চেয়ে দেখি আমার প্রাইমারি স্কুলের আরেক বন্ধু হারুন। বাসের হেলপার।

আমি জিজ্ঞেস করলাম – ‘তুই এখানে কেন?’

ও বললো – ‘এই আছি, এখানেই আর কি!’

বলেই সামনে দিকে ঘুরলো। আর আমার দিকে তাকালো না।

আমিও আর কথা বলার শক্তি পেলাম না। কি যেন ভাবতে ভাবতেই পথ শেষ হয়ে এলো। নামার সময় হারুনের কাধে হাত রেখে হাসিমুখ করে নেমে গেলাম। আমাদের ক্লাসে সবচেয়ে ভালো অংক পারতো হারুন। এমন দিন নেই যে হারুন বোর্ডে সবাইকে অংক বুঝিয়ে দেয়নি। ও ক্লাসে না এলে ম্যাডাম বাড়ি থেকে ডেকে ক্লাসে নিয়ে আসতেন।

হারুনের কাছে গুণ, ভাগ অনেক শিখেছি। অহংকার ছিল না কখনোই। হাসিখুশি মনে সবাইকেই না পারলে বুঝিয়ে দিতো।

যে হারুন আজ হতে পারতো কোন ব্যাংক কর্মকর্তা, ব্যাংকের হিসাবরক্ষক। সে হারুন আজ ব্যস্ত নবীনগর টু মানিকগঞ্জ যাত্রীদের ভাড়ার হিসেব নিয়ে। পাটিগণিতের হিসেব থেমে গেছে অভাবের তাড়নায়। ভাগ অংক করতে করতে জীবনটাই যে ওর ভাগ হয়ে যাবে, ও কি জানতো!

অভাব ওদের এভাবেই থামিয়ে দেয়…

বাল্যকালের অনেক বন্ধুই এভাবে কালের স্রোতে ছিটকে পড়েছে। কেউ যুদ্ধে টিকে থেকেছে, কেউ টিকেনি।কেউ ভুলে গেছে, কেউ মনে রেখেছে। তবুও ভালো থাকুক জীবনযুদ্ধে এই নিলামে ওঠা বন্ধুত্ব।

https://www.mega888cuci.com