পিথাগোরাস: গণিতজ্ঞ না ঘাতক?

পিথাগোরাসের নাম শুনলেই আমাদের মনে পড়ে যায় নাইন টেনে পড়া সেই উপপাদ্যের কথা যেই উপপাদ্য প্রমাণ করতে গিয়ে নাকানি-চুবানি খেতে হয়েছিল৷ কিন্তু জ্যামিতি শাস্ত্র প্রায় অনেকটাই অকেজো তাঁর এই উপপাদ্য ছাড়া৷ শুধু জ্যামিতি শাস্ত্র নয় ত্রিকোনমিতি ও গনিতের অনেক শাখায় এর ব্যবহার রয়েছে৷

পিথাগোরাস একাধারে একজন গনিতবিধ, সংগীতজ্ঞ, ভেষজ চিকিৎসক ও ধর্মগুরু ছিলেন৷ কিন্তু মজার ব্যাপার হলো তিনি কিন্তু প্রথম জীবনে গানিতিক ছিলেন না৷ তিনি ছিলেন একজন সংগীত স্রষ্টা৷ এই সংগীত চর্চাই তাকে গনিতের দিকে ধাবিত করেছিল৷ জীবনে তিনি কিছু অদ্ভুত কাজ করে গেছেন যা শুনলে আজকালকার অনেকেই বিশ্বাস করতে চাইবে না

তিনি মনে করতেন মানুষ মরে গেলে তার আত্মা আরেকটা জীবিত মানুষের মধ্যে চলে যায় যে শিশু হিসেবে মায়ের গর্ভে জন্মে আছে৷ তিনিও নিজেকে মৃত মানুষের আত্মা থেকে জন্ম নেয়া ভাবতেন৷ সারা জীবন নিরামিষ ভোজী ছিলেন৷ কারন তিনি মনে করতেন আমিষ খেলে বদ হজম হয়,আর বদ হজমই শরীরের সবচেয়ে বড় রোগ৷ মটরশুটির প্রতি তার ছিল তীব্র বিতৃষ্ণা৷ মটরশুটি তো খেতেনই না বরং মরটশুটি গাছ যে জমিতে চাষ করা থাকতো ঐ জমির পাশ দিয়েও যেতেন না৷ এতো কিম্ভুত বৈশিষ্ট্য থাকা সত্ত্বেও তাঁর ছিল একটা বিশেষ গুন৷ আর তা হলো তিনি বক্তৃতা দিতে দাঁড়ালে মানুষ মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁর কথা শুনতো৷

তিনি যাই বলতেন লোকে তাই বিশ্বাস করতো৷ ফলে তাঁর এটা বিশাল শিষ্যবাহিনী তৈরী হয়ে যায়৷ এই শিষ্যবাহিনী সবসময় তাঁর পাশেই থাকতো৷ জীবনের বেশিরভাগ সময়ই তিনি শিষ্য দ্বারা পরিবৃত ছিলেন৷ শিষ্যরাও তাঁর দেয়া গনিত চর্চা করতো৷ ফলে কিছু শিষ্যও গনিতের নতুন কিছু ফর্মুলা তৈরী করেছিল৷ কিন্তু পিথাগোরাসের এতটাই প্রভাব ছিল যে ওইসব ফর্মুলা গুলো সবাই পিথাগোরাসের ফর্মুলা বলে ভাবতো৷ ভক্তকুলের মধ্যে তৈরী হওয়া সেইসব গনিতবিদদের নাম আর আমরা জানি না৷ বিখ্যাত উপপাদ্যটিও কিন্তু তাঁর করা না৷

তার অনেক আগেই মিশরীয়রা এই উপপাদ্যের কথা জানতো৷ তিনি শুধু এই উপপাদ্যের একটা কাঠামো দিয়েছিলেন, একটা সুত্রের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন৷ তাঁর সকল অদ্ভুত স্বভাবের মধ্যে একটা ছিল পুর্ণসংখ্যাপ্রীতি৷ পুর্ণ সংখ্যার  প্রতি তাঁর টান এতোটাই বেশি ছিল যে তিনি জগতের সব কিছুকেই পুর্ণ সংখ্যার মাধ্যমে প্রকাশ করতে চাইতেন৷ যেমন এক হল ঈশ্বর সংখ্যা, দুই হলো মতামত, তিন হলো ঐকতান,চার ন্যায়পরায়নতা,পাঁচ বিবাহ সংখ্যা৷

একই ভাবে মনে করতেন জগতের সকল সংখ্যাকে পুর্ণসংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যায়৷ যেমন ১.৫ কে ৩/২ দ্বারা,.৫ কে ১/২ দ্বারা৷ অর্থাৎ জগতের সকল সংখ্যাকে তিনি মুলদ সংখ্যা ভাবতেন৷ অমুলদ সংখ্যা বলে যে কিছু একটা আছে সে কথা স্বীকার করতেন না৷ তাঁর একজন শিষ্য,নাম ছিল হিপ্পাসাস৷একদিন হিপ্পাসাস পিথাগোরাসকে ‘পিথাগোরাসের উপপাদ্য’এর সাহায্যে প্রমাণ করে দেখালেন যে পৃথিবীর সকল সংখ্যাকে দুটি সংখ্যার অনুপাতে মানে মুলদ সংখ্যার আকারে প্রকাশ করা যায় না৷

উপপাদ্যটি এমন ছিল-সমকোনী ত্রিভুজের যেকোন দুই বাহুর বর্গের সমষ্টি অতিভুজের বর্গের সমষ্টির সমান৷ এখন যদি দুইটি বাহুর মধ্যে প্রতিটির মান ১ ধরা হয় তবে দুই বাহুর বর্গের সমষ্টি হয় ১²+১²=১+১=২৷ অতিভুজের মানকে যদি a ধরা হয় তাহলে বিষয়টা দাঁড়ায় a2 = ২৷ মানে a=√২৷ অভিভুজ=√২৷ এই √২ কে দুইটি সংখ্যার অনুপাতে প্রকাশ করা যায় না৷ মানেটা হলো যে মুলদ সংখ্যা বাদেও গনিতে আরেকটা সংখ্যা আছে৷

হিপ্পাসাসের এই ব্যাখ্যা শুনে পিথাগোরাসের বিশ্বাসের ঘরে যেন আগুন লাগলো৷ এতোদিন ধরে তিনি মানুষের মনে যে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন সে বিশ্বাস আজ ভাঙ্গতে বসেছে৷ তিনি কিছুতেই তা মেনে নেন নি,প্রচন্ড রেগে গেলেন৷ পিথাগোরাস রেগে যাওয়া মানে তাঁর বিশাল অন্ধভক্তকুল রেগে যাওয়া৷ একদিন পিথাগোরাস জাহাজে করে সমুদ্র ভ্রমনে বের হলেন,সাথে করে নিলেন হিপ্পাসাসকেও৷

জাহাজ যখন ভুমধ্যসাগরের মাঝখানে পৌছালো তাঁর কিছু ভক্ত মিলে হিপ্পাসাসের হাতপা বেঁধে সমুদ্রে ফেলে দেয়৷ আর এভাবেই হিপ্পাসাসের জীবনবসান হলো৷ হিপ্পাসাসের এই ব্যাখ্যার মাধ্যমেই জন্মনিয়েছিল গনিতের আরেকটি সংখ্যা আর তা হলো অমুলদ সংখ্যা৷ অমুলদ সংখ্যার জনক হিসাবে হিপ্পাসাসের নাম স্মরণ করা হয়৷ আর তাকে বলা হয় গনিতের জন্য প্রাণ দেয়া প্রথম শহীদ৷

https://www.mega888cuci.com