ক্রিকেটের ‘বাবা’

আধুনিক ক্রিকেটের জনক বা ফাদার অব মডার্ন ক্রিকেট ডব্লিউ জি গ্রেস (উইলিয়াম গিলবার্ট গ্রেস) ক্রিকেটের বেশ কিছু মজার আর ‘স্মরণীয়-অবিস্মরণীয়’ ঘটনার জন্ম দিয়ে গেছেন তিনি পেশায় ছিলেন একজন ডাক্তার। শুরুতে সৌখিন ক্রিকেটার ছিলেন গ্রেস, তবে পরবর্তীতে পেশাদার ক্রিকেটার হয়ে যান।

একবার বোল্ড হওয়ার পর আম্পায়ারের দিকে ফিরে গিয়ে বলেছিলেন, ‘আপনি জানেন কিনা না জানেন, আসলে ঝড়ো বাতাসেই স্টাম্পের বেলটা পড়ে গেছে।’ প্রত্যুত্তরে ওই আম্পায়ার মুচকি হেসে বলেছিলেন, ‘আশা করি বাতাসটি আরেকটু ঝড়ো গতি পেয়ে ডাক্তার সাহেবকে প্যাভিলিয়নে উড়ে নিয়ে যেতে সাহায্য করবে।’

আরেকবার গ্রেস গেছেন এক গ্রামে খেলতে। সেখানকার এক অখ্যাত বোলার একেবারে প্রথম বলে আউট করে দিল গ্রেসকে! সরাসরি বোল্ড! কিন্তু তিনি হাল ছাড়বেন কেন? স্ট্যাম্পের বেল আবার জায়গামত বসিয়ে বোলারকে বললেন, ট্রায়াল বল হিসেবে প্রথম বলটা ভালোই করেছ বাছা। বেশ তবে, এবার শুরু হোক আসল ‘খেলা’ বলে আবারও গিয়ে দাঁড়ালেন উইকেটে! কোনভাবেই তাকে সাজঘরে ফেরাতে রাজি করানো যায়নি।

আউট হতে একেবারেই ইচ্ছে করত না গ্রেসের। আম্পায়াররাও বোধহয় তাঁর এই ইচ্ছেটাকে সম্মান করতেন অথবা বাধ্য হয়ে মেনে নিতেন। ১৮৯৮ সালের এক ম্যাচে গ্রেসের বিপক্ষে একাধিকবার এলবিডব্লিউর আবেদন করে প্রত্যাখ্যাত হলেন ফাস্ট বোলার চার্লস কোর্টনাইট।

শেষে রেগেমেগে একেবারে দুটো স্ট্যাম্পই দিলেন উপড়ে। বোল্ড! এরপর গ্রেসের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললেন, ‘ডক, তুমি এবার নিশ্চয়ই মাঠ ছাড়বে?’ তখন আউট না হতে চাওয়ার হাস্যকর যুক্তি দিলেন গ্রেস, ‘দেখতেই পাচ্ছো একটা স্ট্যাম্প এখনো মাটিতে দাঁড়িয়েই আছে? তাছাড়া লোকে গাঁটের পয়সা খরচ করে আমার ব্যাটিং দেখতে এসেছে, নিশ্চয়ই তোমার বোলিং দেখতে নয়।’

বোলারের উদ্দেশ্যে এই ছিল তাঁর বাণী! বোলার বেচারা আর কি করবে,বল নিয়ে পরের বল করতে প্রস্তুত হওয়া ছাড়া তার আর কোনো উপায়ই ছিলো না কারন আম্পায়াররাও গ্রেসের কথার কোন প্রতিবাদ করেননি।

ডব্লিউ জে গ্রেসের বিখ্যাত দুটি উক্তি:

১. গ্রেট ব্যাটসম্যান তৈরী হয়না, জন্মায়।

২. টসে জিতলে ব্যাট করো আগে। সন্দেহ থাকলে চিন্তা করো এবং ব্যাটিং নাও। আরো সন্দেহ থাকলে আরো চিন্তা করো এবং ব্যাটিং করো। আরো বেশি সন্দেহ থাকলে দলের সবার সাথে আলোচনা করো এবং ব্যাটিং নাও!

আরেকবার একজন আম্পায়ার গ্রেসকে লেগ বিফোর ঘোষনা করার পর সরাসরি আম্পায়ারের উদ্দেশ্যে বললেন, ‘এই যে এতো মানুষ, এরা কেউ তোমার আম্পায়ারিং দেখতে আসেনি, এসেছে আমার ব্যাটিং দেখার জন্য।’

গ্রেসের আরেকটা মজার অভ্যাস ছিলো, স্লিপে বা আউটফিল্ডে ক্যাচ উঠলে ভয়াবহ চিৎকার দিতেন, ‘মিস ইট’ বলে। কখনো কখনো এতে কাজ হতো। মনসংযোগ হারিয়ে ক্যাচ সত্যিই মিস করতেন ফিল্ডার।

গ্রেসকে আধুনিক ক্রিকেটের জনক বলাহয় কারন তিনিই প্রথম ক্রিকেটার যিনি একই সাথে ফ্রন্ট ফুট এবং ব্যাক ফুটে সার্থকভাবে শটস খেলা শুরু করেন। ১৮০০-১৯০০ এই শতকে ব্যাকফুটে খেলার প্রচলন ছিলোনা। গ্রেস একই সাথে অফ স্ট্যাম্প এবং লেগ স্ট্যাম্পে গার্ড নিয়ে দুই পাশেই সহজেই শটস খেলতে পারতেন।

আক্রমণাত্মক ক্রিকেটের জনক বলা হয় গ্রেসকে, ১৮৭০ সালে তিনি যেই স্ট্যান্সে ব্যাট করতেন সেটা বর্তমানের টি টুয়েন্টির স্টাইল। ১৮৭৩ সালে ওভালে গ্রেস প্রথমবারের মতো লাঞ্চের আগেই সেঞ্চুরী করেন। ‘আমি ডিসেন্সিভ শট পছন্দ করিনা, এতে মাত্র তিন রান পাওয়া যায়’, গ্রেসের বিখ্যাত উক্তিগুলার একটি।

১৬ বছরে প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে অভিষেক হওয়া ডব্লিউ জি গ্রেস প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলেছেন ৬০ বছর পর্যন্ত। ক্রিকেটের অমর বুড়ো গ্রেস ক্যারিয়ারে একটি বা দুটি নয়, প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেট খেলেছেন ২৯ টি দলের হয়ে। ৮৭০ ম্যাচে রান করেছেন ৫৪,২১১! সেঞ্চুরী করেছেন ১২৪ টি, ফিফটি ২৫১ টি, বল হাতে পেস বোলিং করে উইকেট নিয়েছেন ২৮০৯ টি, পাঁচ উইকেট নিয়েছেন ২৪০ বার, ১০ উইকেট পেয়েছেন ম্যাচে ৬৪ বার। ক্যাচ নিয়েছেন ৮৮৭ টি। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ক্যাচের রেকর্ড। একজন সত্যিকারের অলরাউন্ডার!

ইংল্যান্ডের হয়ে টেস্ট খেলেছেন ২২ টি, যার ভেতর অভিষেকেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৫২ রানের ইনিংস রয়েছে। এক মৌসুমে এক হাজার রান এবং একশো উইকেটের ‘ডাবল’ অর্জন করেছেন আটবার।

১১-১৮ আগস্ট ১৮৭৬, এক সপ্তাহে ৮৩৯ রান করেন ডাক্তার সাহেব! এক সপ্তাহে করা সর্বোচ্চ প্রথম শ্রেনীর রানের রেকর্ড। এমসিসির হয়ে ৩৪৪, গ্লস্টারশায়ারের হয়ে ১৭৭ এবং ৩১৮*। প্রথম শ্রেনীর ক্রিকেটের ইতিহাসে প্রথম দুটি ট্রিপল সেঞ্চুরী গ্রেসের, এক সপ্তাহের ভেতরই।

বল করেই বুঝতে পারতেন ব্যাটসম্যান কোথায় শট খেলবেন এবং গ্রেস সেদিকেই দৌড় দিয়ে ফলো থ্রোতে ক্যাচ নিতেন নিজের বলেই! এই সময় ক্রিকেটে ‘ফিজিও’ ছিলোনা। গ্রেসের ডাক্তারি ব্যাগটা সাথেই থাকতো। নিজ দল অথবা প্রতিপক্ষ, ইনজুরিতে পড়া প্লেয়ারদের চিকিৎসা মাঠের ভেতরই করতেন ডাক্তার গ্রেস।

যদিও তিনি অ্যামেচার দাবি করতেন নিজেকে তবে তার ম্যাচ ফি তৎকালীন পেশাদার ক্রিকেটারদের চেয়েও বেশি ছিলো এমনকি ম্যাচের প্রবেশ মূল্য বেড়ে যেত! ‘প্রবেশ মুল্য ৩ পেনি তবে ডাক্তার গ্রেস খেললে ৬ পেনি’ – এইরকম নোটিশ প্রায় নিয়মিত নোটিশ ছিলো তখন।

 

https://www.mega888cuci.com