কিম জং উন: অবিশ্বাস্য ও রহস্যময় একনায়ক

তিনি পৃথিবীর সর্বকণিষ্ঠ একনায়ক। তার রাষ্ট্র উত্তর কোরিয়াকে ঘিরে যেমন রহস্য আছে, তেমনি তাঁকে ঘিরেও রহস্য আর কৌতুহলের কমতি নেই।  তিনি নিজের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে খুব একটা কথা বলেন না, তার আত্মজীবনীও ভুতুড়ে সব গালগল্পে ভরা। অতি-কৌতুহলী দুধর্ষ সাংবাদিক কিংবা দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা রিপোর্ট বাদে তাঁর ব্যাপারে জানার সুযোগ নেই বললেই চলে।

চলুন সেসবের আলোকে ক্ষমতাধর এই রাষ্ট্র প্রধানের জীবনের অজানা অধ্যায়গুলো জেনে আসা যাক।

বয়স নিয়ে লুকোছাপা

কিম জং উনের জন্ম আট জানুয়ারি বা ছয় জুলাই, ১৯৮২ সালে, কিংবা ১৯৮৩ সালে, আবার ১৯৮৪ সালেও হতে পারে। বলা হয়, তিনি নিজেকে বয়স্ক দেখাতে পছন্দ করেন। তাই তার আনুষ্ঠানিক জন্মসাল ১৯৮২। যদিও, দক্ষিণ কোরিয়ার গোয়েন্দা রিপোর্ট বলছে তাঁর জন্ম এর দু’বছর বাদে।

ছোট হয়ে আসা ভ্রু

বিভিন্ন সময়ে এই রাষ্ট্রপ্রধানের ছবি দেখলে মনে হবে যে তার ভ্রু’র বিচিত্র এক পরিবর্তন হচ্ছে। এগুলো ছোট হয়ে আসছে। মনে করা হয়, নিজেকে বাবা কিং জং ইলের মত দেখাতে ইচ্ছে করেই ভ্রু ছোট করছেন উন। এই ব্যাপারে কখনো তিনি রাষ্ট্রীয় বিবৃতি দিয়ে বসলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

রহস্যময় শৈশব

তিনি নিজের শৈশবের ছবি দেখাতে পছন্দ করেন না। যদিও, ২০১৪ সালের সামরিক ছুটিতে উত্তর কোরিয়ায় বড় পর্দায় এই ছবিটি দেখানো হয়েছিল। সন্দেহ করা হয়, এটাই দেশটির রাষ্ট্রপ্রধানের শৈশবের ছবি। যদিও, সত্যিকারের ‘সত্য’টা কেউ জানে না।

স্থানীয় নারী ব্যান্ড দলের সদস্য নির্বাচন

উত্তর কোরিয়ায় আর কিছু না হোক পপ মিউজিক আছে। তবে, সেটা আমরা পপ মিউজিক বলতে যা বুঝি ঠিক তেমনটা নয়। এটা হল উত্তর কোরিয়ার সামরিক অর্কেস্ট্রা। উত্তর কোরিয়ার জনগন কতটা ভাল জীবন যাপন করে, মিউজিক ভিডিওতে সেটাই এর সদস্যরা তুলে ধরার চেষ্টা করেন।

উত্তর কোরিয়ায় মেয়েদের বিখ্যাত ব্যান্ড হল ‘মোরানবঙ’। কথিত আছে, এই ব্যান্ডের জন্য সদস্য খোদ রাষ্ট্রপ্রধানই নির্বাচন করে দেন।

এক গাদা রাষ্ট্রীয় পদবী

‘ডেমোক্রেটিক পিপল’স রিপাবলিক অব কোরিয়া’র সর্বাধিনায়ক, পার্টি ও জনগনের নেতা’র আরো কিছু নাম আছে। যেমন – নতুন সূচনা, দ্য ব্রিলিয়ান্ট কমরেড, সবার চেয়ে তুখোড়, দ্য মার্শাল অব নর্থ কোরিয়া (২০১২ সাল থেকে)। এই ‘ভদ্রলোক’-এর ইউনিভার্সিটি অব কিম ইল-সাং থেকে পদার্শবিজ্ঞানের ডিগ্রী আছে। একই সাথে তিনি মালয়েশিয়ার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হেলপ (HELP) থেকে অর্থনীতিতেও পড়াশোনা করেছেন।

ছদ্মবেশে পড়াশোনা

১৯৯৮ থেকে ২০০০ সাল অবধি তিনি সুইজারল্যান্ডের বার্নে বিখ্যাত Liebefeld-Steinhölzli পাবলিক স্কুলে পড়াশোনো করেন। উত্তর কোরিয়ান দূতাবাসে তাঁর রেজিস্ট্রেশন অবশ্য হয়েছিল ভিন্ন নামে। মানে, তিনি পড়াশোনা করেছেন পরিচয় গোপন করে।

ছবি দেখে এই খবর নিশ্চিত করা না গেলেও, তাঁর ওই সময়ের সহপাঠীরা এখন হলফ করে বলেন যে তাদের বন্ধুই এখন বিশ্বের অন্যতম ক্ষমতাধর এক রাষ্ট্র নায়ক। তাঁর ওই সময়ের বন্ধু জোয়াও মাইকেলো সম্প্রতি বলেন, ‘আমরা ভাল বন্ধু ছিলাম। এক সাথে অনেক মজা করেছি। বাচ্চারা ওকে পছন্দ করতো। এখন ও যেমন, সেটা দেখে ওর স্কুলের জীবনকে কল্পনাও করা যাবে না।ও বাস্কেটবল খেলতে পছন্দ করতো। আমরা এক সাথে অনেক খেলেছি। ওর সাথে সময় কাটাতে আমার ভাল লাগতো, হয়তো এখনো লাগবে।’

স্কুলে তাঁকে সবাই ‘পাক উন’ নামে চিনতো। ওই সময় বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে তাঁদের মধ্যে কোনো কথাই হত না বলে জানালেন উনের আরেক সহপাঠী মার্কো ইমহোফ। বললেন, ‘ওর হাসি সুন্দর ছিল। একই সাথে ও হারতে ঘৃণা করতো। খেলাতেও ওর জন্য জয়টাই বেশি জরুরী ছিল। ওর হিউমার সেন্সের সুবাদে সবার কাছে পরিচিত পেয়েছিল। এমনকি উত্তর কোরিয়ার শত্রু রাষ্ট্রের শিক্ষার্থীরাও ওকে পছন্দ করে। স্কুলে রাজনীতি নিয়ে আলাপ করাটা ট্যাবুর মত ছিল। আমরা ফুটবল নিয়ে ঝগড়া করতাম, রাজনীতি নিয়ে নয়।’

উনের বড় ভাই, কিম জং চুল, ছোট বোন কিং ইয়ো জংও সুইস স্কুলে পড়াশোনা করেছেন ১৯৯২ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে। বলা হয়, সুইস স্কুলে উন ছাত্র হিসেবে ছিলেন যাচ্ছেতাই রকমের বাজে।

বাস্কেটবল প্র্রেম ও ডেনিস রডম্যানের সাথে বন্ধুত্ব

স্কুলের বন্ধুরা তো বলেছেনই, বাস্কেটবল খেলতে দারুণ পছন্দ করতেন উন। এমনকি বাস্কেটবল তারকা মাইকেল জর্ডানের ছবিও আঁকতেন। ২০১৩ সালে তিনি বাস্কেটবল তারকা ডেনিস রডম্যানের সাথে তাঁর নিজন্স দ্বীপে দেখা করেন। দু’জনের মধ্যে আকাশপাতাল ব্যবধান থাকার পরও দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হয়। ডেনিস বলেন, ‘হয়তো ও পাগল, তবে আমি তার কিছুই খুঁজে পাইনি।’

সদা হাস্যজ্জ্বল

যেকোনো পরিস্থিতিতে, যেকোনো মুহূর্তে ঠোঁটে হাসি থাকে কিম জং উনের। এত ‘সিরিয়াস’ একটা দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের সবসময় হাসা একটু পাগলাটে ঠেকতে পারে অনেকের কাছে। তবে, এর আসল কারণ হল, তিনি চান সবাই তাঁকে আমুদে বলে চিনুক।

কেশবিন্যাস

কিম জং উনের কেশবিন্যাসে বিচিত্র কিছু নেই। এটা সাদামাটা একটা সামরিক কেশবিন্যাস। ফিউরি সিনেমায় ব্র্যাড পিট কিংবা পৃথিবীর যেকোনো হিপস্টারদের কেশবিন্যাস এমনই হয়।

তারপরও এতে তাঁকে ভুতুড়ে দেখা যায়। কারণ, বিচিত্র এক ঢঙে তিনি ‍চুল আচড়ান। আর গুজব আছে নিজের নাপিতকে তিনি বিশ্বাস করেন না। তাই নিজের চুল নিজেই কাটেন তিনি।

মলমূত্রহীন জীবন

উত্তর কোরিয়ায় রাষ্ট্রীয় ভাবে প্রোপাগান্ডা ছড়ানো হয়েছে যে কিমদের মলমূত্র ত্যাগ করার প্রয়োজন পড়ে না। বিস্ময়কর হলেও সত্যি যে উত্তর কোরিয়ার সাধারণ মানুষও এই কথা বিশ্বাস করেন। উনের বাবা কিং জং ইল নিজের আত্মজীবনীতে এটা লিখে গেছেন। আর একই কথা নাকি উন সহ তাঁর পরিবারের সবার জন্যই সত্য!

– ব্রাইট সাইড, ডেইলিস্টার.কো ও নিউজ.কো.ইউকে

https://www.mega888cuci.com