একা থাকাই ভালো থাকা!

৬৩ বছর বয়সী বেলা ডি পাওলো তার পুরো জীবনটাই একা কাটিয়ে দিয়েছেন।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ডি পাওলো, ‘টেডক্স টক দিস স্প্রিং’ নামে এক সেমিনারে বলেন, ‘আমি কখনোই সাত পাকে বাঁধা পড়তে চাইনি। একা থাকাই আমার কাছে সবসময় সুখের মনে হয়েছে।’

এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ডি পাওলো তার মতো একাকী জীবনযাপন করা মানুষদের নিয়ে গবেষণা করছেন এবং তার প্রাপ্ত ফলাফলগুলো বলছে, একা থাকার দৃশ্যমান কিছু সুফল রয়েছে। তা একদিকে যেমন মানসিক, অন্যদিকে শারীরিক।

২০১৩ সালে, ডি পাওলো তাঁর ব্লগ সাইকসেন্ট্রাল-এ লিখেছিলেন যে, ‘আমাদের মাঝে বিশ্বাস জন্মেছে যে অবিবাহিত মানুষগুলো ভীষণভাবে একা, তাদের জীবনে কোনো প্রেম নেই এবং তারা সবসময় দাম্পত্য জীবনের আকাঙ্ক্ষা করেন। এ ধারণাগুলো তাদের কল্পনা ছাড়া আর কিছুই নয়।’

২০১৬ সালে, তিনি অবিবাহিত এবং বিবাহিত মিলিয়ে ৮০০-য়েরও বেশি মানুষকে তাঁর গবেষণার কাজে লাগিয়েছেন। তাদেরকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করে তিনি দেখতে পান, তার নিজের ধারণা একেবারেই অমূলক নয়। তাঁর মতে, ব্যাচেলর জীবনের দারুণ কিছু উপকার রয়েছে- তারা যেমন শক্তিশালী সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখতে পারেন তেমনি স্বাস্থ্যকর শরীর অক্ষুণ্ণ থাকে অবিবাহিতদেরই।

বন্ধুত্ব চাও, একা থাকো!

বিবাহিতদের বন্ধুসংখ্যা বেশি বলে ভাবছেন? তাহলে আবার নতুন করে ভাবুন।

বিবাহিত এবং অবিবাহিতদের মাঝে আত্মীয়, প্রতিবেশী এবং বন্ধুদের সাথে কাদের সম্পর্ক ভালো? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সমাজবিজ্ঞানী নাতালিয়া সারকিসিয়ান এবং নাওমি গারস্টেল ২০১৫ সালে একটি গবেষণা চালান। গবেষণায় তারা দেখতে পান, অবিবাহিতরাই সামাজিক যোগাযোগ বজায় রাখার ক্ষেত্রে অগ্রগামী। শুধু তাই নয়, তাদের বিবাহিত সহকর্মীদের তুলনায় তারা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে এবং সাহায্য পেতে বেশি উদগ্রীব থাকেন। যেকোনো জাতি, লিঙ্গ কিংবা আয়ের মানুষকে বিবেচনায় নিলেও ফলাফল একই থাকে। সোজা কথায়, ‘ব্যাচেলর জীবন নারী কিংবা পুরুষের সামাজিক যোগাযোগে বৃদ্ধি করে’, সারকিসিয়ান আর গারস্টেল তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে এমনটিই লিখেছেন।

অবিবাহিতরাই বেশি ফিট

এই ধারণার কিছুটা সত্যতা পাওয়া যায় যে, যারা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে যান, তারা শারীরিক ফিটনেসের কিছু পরিমাপে পিছিয়ে পড়েন।

১৮ থেকে ৬৪ বছরের মধ্যে, ১৩০০০-এরও বেশি পুরুষ ও নারীদের উপর জরিপের পর গবেষকরা এই সিদ্ধান্তে আসেন যে, যারা অবিবাহিত এবং কখনো বিয়ে করেননি, তারা তাদের বিবাহিত বা তালাকপ্রাপ্ত সঙ্গীদের তুলনায় প্রতি সপ্তাহে তাদের শরীর নিয়ে বেশি কাজ করেন।

৯ টি ইউরোপীয় দেশের প্রায় ৪৫০০ মানুষের উপর পরিচালিত, ‘সোশ্যাল সায়েন্স এন্ড মেডিসিন’ নামক এক জার্নালে ২০১৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, বিবাহিত নারী-পুরুষদের চেয়ে অবিবাহিত পুরুষ এবং নারীদের বিএমআই সূচক সামান্য কম। সামগ্রিকভাবে, বিবাহিত দম্পতিদের ওজন অবিবাহিতদদের চেয়ে গড়ে প্রায় পাঁচ পাউন্ড বেশি।

একাকী জীবনেই পরিপক্বতা বেশি

যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পরিবার জরিপের এক তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিবাহিতদের তুলনায় অবিবাহিতরা মানসিক দিক হতে বেশি পরিপক্ব। এ জরিপে, হাজারেরও বেশি অবিবাহিত অংশ নেন। বিপরীতে, বিবাহিতদের সংখ্যা ছিলো তিন হাজারেরও বেশি এবং তারা ১৯৯৮ সাল থেকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ। জরিপে তাদেরকে দুটি প্রশ্ন করা হয়, যার উপর ভিত্তি করে গবেষণার ফল নির্ধারণ করা হয়।

নমুনায় দেখা যায়, বিবাহিতদের তুলনায় অবিবাহিতরা নিচের বিবৃতির সাথে বেশি একমত হন: আমার জন্য জীবন হচ্ছে শেখার, পরিবর্তিত হবার এবং বড় হবার একটি ক্রমাগত প্রক্রিয়া। আমি মনে করি নতুন অভিজ্ঞতা অর্জন গুরুত্বপূর্ণ কেননা এটি আপনাকে নিজের এবং বিশ্বের সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে চ্যালেঞ্জ করে।

বিয়ের পরে, উদারতা কমে

১৯৮৭-৮৮ সালে আমেরিকানদের উপর পরিচালিত একটি জরিপে এবং তার পাঁচ বছর পরে ডি পাওলোর গবেষণায় দেখা যায়, এই সময়ের কিছু আগেপরে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া বিবাহিত পুরুষেরা তাদের ব্যাচেলর জীবনের তুলনায় বন্ধুদের গড়ে ১৮৭৫ ডলার কম প্রদান করেছিলেন। অবশ্য, এই ফলাফল নারীদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়।

অন্যদিকে একই সময়কালে যারা বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন, তারা তাদের বিবাহিত জীবনের তুলনায় গড়ে ১২৭৫ ডলার বেশি দান করেছিলেন।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, এই সময়ে যারা ডিভোর্সের পর পুনরায় সংসারজীবন শুরু করেছিলেন, তারা আবারও ১০৫০ ডলার কম দান করে তাদের কৃপণতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

এই গবেষণার আলোকে, ডি পাওলো তাঁর ‘সিঙ্গলডআউট আউট’ বইতে লিখেছেন, ‘অবিবাহিত পুরুষেরা বিবাহিত পুরুষের তুলনায় তাদের আত্মীয়দের কোনো অংশে কম দান করেন না। এবং বন্ধুদেরও তারা বিবাহিত পুরুষদের চেয়ে আর্থিকভাবে বেশি সাহায্য করেন।’

অবিবাহিতরা বিবাহিতদের চেয়ে একাকী সময়কে বেশি আপন করতে পারেন

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ এমি মরিনের মতে, নিরবচ্ছিন্নতা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য অনেক সুফল বয়ে আনতে পারে। একাকীত্ব মানুষকে আরো উৎপাদনশীল এবং আরো সৃজনশীল হতে সাহায্য করতে পারে।

২০১৫ সালে বিজনেস ইনসাইডারকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে মরিন বলেন, ‘একা সময় কাটানোতে একাকীত্ব বোধ করবার কোনো কারণ নেই। নিজেকে আরও ভালোভাবে জানতে চাইলে একা সময় কাটানো জিয়নকাঠির মতো কাজ করতে পারে।’

প্রকৃতপক্ষে, অন্যান্য মনস্তাত্ত্বিকরা তাদের গবেষণায়, স্বাধীনতা বৃদ্ধি হতে শুরু করে অধিকতর সৃজনশীলতা কিংবা অন্তরঙ্গতা, সবকিছুর সাথেই নির্জনতাকে (যা মোটেই একাকীত্ব নয়) যুক্ত করেছেন।

– আইএফএল সাইন্স অবলম্বনে

https://www.mega888cuci.com