একটু পদ্মাবতী, অনেকখানি খিলজী

ইতিহাসে ‘পদ্মাবতী’ চরিত্রটি নিয়েই অনেক বিতর্ক আছে। কাহিনীটা মূলত ১৩০০-১৫০০ শতকের। অনেকের মতেই এটা ১৫৪০ শতকে কবি ‘মালিক মোহাম্মদ জায়সী’ তাঁর কবিতায় পদ্মাবতী নামের কাল্পনিক চরিত্রের অবতারণা করেন। আবার অনেকে বলে রাণী পদ্মাবতীর জন্ম ১৩-১৪ শতকের মাঝামাঝি কোনো একসময় শ্রীলঙ্কাতে।

আর যাদের নিয়ে কাহিনী মানে আলাউদ্দিন খিলজী, রানা রতন সিং তারা সবাই কবিতাটি লেখার ১৫০-২০০ বছর আগে মারা যান। কিন্তু ভিন্নমতও নেহাত কম নয়। মজার একটা রিউমার প্রচলিত আছে রাণী পদ্মাবতীর ব্যাপারে। সেটা হলো রাণীর বাবা অনেক কড়া ছিলেন। মেয়ের ব্যাপারে রাণীর একমাত্র সঙ্গী ছিলো তাঁর কথাবলা তোতাপাখি ‘হিরামণ’।

তো রাজা হঠাৎ লক্ষ্য করলেন তাঁর মেয়ে সারাদিন হিরামণের সাথে গল্প করে, হাসাহাসি করে। ব্যাপারটা রাজার ভালো লাগেনি। তিনি চার সিপাহীকে হিরামনকে হত্যার নির্দেশ দিলেন। সিপাহীরে হত্যার জন্য হিরামনকে বনে নিয়া গেলো, তবে সেখানে ঘটলো আরেক ঘটনা।

সিপাহীদের হাত ফসকে হিরামণ সোজা চলে গেলো রাজা রতন সিং এর দরবারে। তাঁর কাছে রাণীর অপরুপ রুপের বর্ণনা করলো। শুনে মুগ্ধ হয়ে রাজা বিবাহের প্রস্তাব পাঠায়। পরে পদ্মাবতীর বাবা রতন সিং বিবাহিত হওয়া সত্বেও তার ভয়ে বিবাহ দিতে বাধ্য হন।

যাই হোক, মূল কাহিনী হল এক রাজ্যে রণবীর সিং মানে আলাউদ্দিন খিলজী তার চাচা জালালউদ্দিন খিলজীর (রাজা মুরাদ) মেয়েকে (অদিতি রাও) বিয়ে করে। এবং পরে চাচা কাম শশুরকে হত্যা করে নিজেই রাজা হন রণবীর।

আরেক রাজ্যে শহীদ কাপুর দিপীকাকে বিয়া করে সুখে-শান্তিতে বসবাস করছিলেন।

কিন্তু আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন একটু উচ্চাভিলাসী ধরণের। সেজন্যই শহীদ কাপুরকে আক্রমন করে বসেন। কোনো এক পর্যায়ে যুদ্ধ বাদ দিয়ে শহীদের রাজপ্রাসাদে দাওয়াত খেতে যেয়ে তাঁর স্ত্রী দেখতে চান। অহেতুক ঝঞ্ঝাট এড়ানোর জন্য কোনোরকম এক ঝলক তাকে দিপীকাকে দেখানো হয়। বিবাহিত হওয়ার পরও রণবীরের আবারো বিয়ের শখ জাগ্রত হয়।

পরে নিজের রাজ্যে গিয়ে সে শহীদকে দাওয়াত দিয়ে ফাঁদে ফেলে। দাবী করে তার পদ্মাবতীকে চাই। পদ্মাবতীও তাঁর স্বামীকে রক্ষা করতে বিশাল সেনাবহর নিয়ে রণবীরের রাজ্যে যায়। যদিও, কোনো ঝামেলা ছাড়াই রণবীরকে তিনি ছাড়িয়ে আনতে সক্ষম হন।

এটা সিনেমার সবচেয়ে সেরা দৃশ্যগুলোর একটি। রণবীর আর দীপিকা অভিনয় শিল্পী হিসেবে কতটা দক্ষ সেটা বোঝা গেছে এই দৃশ্যে। সিনেমার সবচেয়ে ভাল দিক হল স্ক্রিন প্লে, ডায়লোগ এবং অবশ্যই রণবীর সিংয়ের অভিনয়। রণবীরের চরিত্রটি ছিল খুবই ইমপ্যাক্টফুল। অনেকক্ষেত্রে সিনেমাটি স্রেফ তাকে কেন্দ্র করে নির্মিত বললেও হয়তো ভুল বলা হবে না। সিনেমাটি দেখে এক মিনিটের জন্যও একঘেয়ে লাগার কোনো সুযোগ নেই।

সিনেমাটির আরেকটি সেরা দৃ্শ্য ছিল একদম অন্তীম মুহূর্তটি। দিপীকার অভিনয় এতটাই পেশাদার ছিল যে অনেক শক্ত মনের মানুষের চোখেও সেটা পানি আনতে পারে। বিশেষ করে বাকি সব নারীদের নিয়ে ‘সহ মরণ’ বেছে নেওয়ার মিনিট খানেক আগে, ব্যাপারটাকে পরিচালক সঞ্জয় লিলা বানসালি খুব দারুণ ভাবে তুলে ধরতে পেরেছেন।

সিনেমার সঙ্গীত আয়োজন বানসালির নিজের করা। লোকটা যে সত্যিই প্রতিভাবান, সেটা আবারো না বললেই নয়। রিমিক্স, নকল আর কপিপেস্টের যুগে এই ছবির গান মননে একদম ঠাণ্ডা করে দেবে। নীতি মোহানের ‘নেয়নো ওয়ালে নে’ ও অরিজিৎ সিংয়ের ‘বিনতে দিল’ – দু’টো গানই ছিল অস্বাভাবিক রকমের সুন্দর। আবারো বলতে হয়, বলিউড ইন্ডাস্ট্রিতে এখন অরিজিতের ওপর কেউ নেই।

ভারতের রাজস্তান, বিহার, উত্তর প্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ, গুজরাট সহ অনেক এলাকায় সিনেমাটিকে মুক্তি পেতে দেওয়া হয়নি। সেন্সর বোর্ড করেছে অনেকরকম কাটছাট। এমনকি সিনেমার নামও ‘পদ্মাবতী’ থেকে ‘পদ্মাবত’ করে ফেলা হয়েছে। যদিও, এত কিছু করেও পুরস্কারের বন্যা আর বক্স অফিসের সাফল্য আটকে রাখা সম্ভবত সম্ভব হবে না।

নি:সন্দেহে পদ্মাবত বলিউডের ইতিহাসের সেরা পাঁচটি সিনেমার একটি। সময় থাকলে দেখে ফেলুন। এক কথায় মাস্টারপিস একটা সিনেমা!

https://www.mega888cuci.com