একটি ক্রিকেট পরাশক্তির আনন্দের ঈদ

এগারো বছর!

হ্যা, এখন থেকে এগারো বছর চার মাস ১০ দিন আগে শেষবারের মতো অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সাদা পোশাকে খেলতে নেমেছিলো বাংলাদেশ। এখনকার অজি অধিনায়ক স্টিভ স্মিথ তখনও বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে হাত পাকানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন, অস্ট্রেলিয়া তখন রীতিমতো অপ্রতিরোধ্য একটি দল। সেই দলের বিপক্ষেই ফতুল্লায় আরেকটু হলেই ম্যাচ জিতে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো, এই আফসোস নিয়ে চট্টগ্রামে খেলতে এসে সেই ম্যাচে ইনিংস ব্যবধানে হারতে হয়েছিলো বাংলাদেশকে। সেদিন থেকেই আশায় বুক বেঁধে ছিলো গোটা বাংলাদেশ, পরেরবার সুযোগ পেলেই ‘ধরে দিবানি’!

নাহ, এরপর একে একে কেটে গেছে এগারোটা বছর, সেই সুযোগটা আর আসেনি কখনও। ২০১১ সালে বাংলাদেশে আরেকবার অস্ট্রেলিয়া এসেছিলো বটে, তবে টেস্ট সিরিজ খেলেনি। বরং কথা দিয়ে যায়, ২০১৫ সালে এসে এই সিরিজটা খেলে যাবে তাঁরা। ২০০৬ থেকে ২০১১, মাঝে বেশ কিছু বছর কেটে গেলেও এই বছরগুলোতে অস্ট্রেলিয়া আর আসতে রাজি হয়নি। কারণটা ছিলো স্পষ্ট, যথাযথ পারফরম্যান্স ছিলো না। বাংলাদেশের জন্য হয়তো কিছুটা অপমানজনক পরিস্থিতি ছিলো, তবে সত্যিটা অস্বীকার করারও বিশেষ উপায় নেই।

২০১৫ সালের সেপ্টেম্বর ধার্য করা হলো অস্ট্রেলিয়া বনাম বাংলাদেশ টেস্ট সিরিজের সময়। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বেঁকে বসলো ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া, জানানো হলো যে নিরাপত্তাশংকায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশে আসতে আগ্রহী নয় অস্ট্রেলিয়া। অপেক্ষার প্রহর বাড়লো আরও কিছুটা। এবারও অস্ট্রেলিয়া নিশ্চিত করলো, ভবিষ্যতে অবশ্যই বাংলাদেশ সফরে আসবে অস্ট্রেলিয়া।

অবশেষে এলো সেই মুহূর্ত, অস্ট্রেলিয়া ১১ বছর পর বাংলাদেশের বিপক্ষে টেস্ট খেলতে রাজি হলো। শেষ যেবার এই দুই দলের মধ্যে খেলা হলো, সেইসময় দুই দলে খেলা বাইশজন ক্রিকেটারের একজনও আর এখন জাতীয় দলের হয়ে খেলেন না, কিংবা সুযোগ পান না। এখন বাংলাদেশ বেশ নিয়মিতভাবেই বড় দলকে হারাচ্ছে ; টেস্ট হোক কিংবা ওয়ানডে, দেশ হোক কিংবা বিদেশ, বাংলাদেশের পারফরম্যান্স দারুণ নিয়মিত। ফলে অস্ট্রেলিয়াও আসতে তেমন ওজরআপত্তি দেখায়নি।

এই দলের মূল পুরোধা এখন সাকিব, তামিম, মুশফিকরা; সাথে নতুন প্রজন্মের মিরাজ, মুস্তাফিজ, সাব্বির, সৌম্য, তাইজুলরা নিয়মিতভাবেই দলকে আনন্দে ভাসার উপলক্ষ্য এনে দিচ্ছে। দারুণ একঝাঁক খেলোয়াড় পেয়ে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে বর্তমান বিশ্বের এক নম্বর অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান ম্যাচ শুরুর আগে দাবি করলেন, বাংলাদেশ এই সিরিজ ২-০ তে জেতারও সামর্থ্য রাখে। নড়েচড়ে বসলো গোটা বিশ্ব, কিছুটা হয়তো অবাক হলো অস্ট্রেলিয়াও!

উত্তেজনার বারুদ আকাশ ছুঁতে চাইলো হয়তো, কোনোদিন আমরা যা আশা করিনি, এবার হলো সেটাই। অস্ট্রেলিয়ার সাথে মাইন্ডগেমে মাতলো বাংলাদেশ, কথার আক্রমণ-প্রতিআক্রমণে উত্তেজনার পারদ ঊর্ধ্বমুখী হলো। স্মিথ বলে বসলেন, ‘নিঃসন্দেহে তাঁরা অতি আত্মবিশ্বাসী হয়েই এটা বলেছে। এর আগে ১০০ টেস্টে ওরা মাত্র ৯টা জিতেছে, সেটাই অনেক কিছু বলে দেয়!’ আঁতে ঘা লাগলো যেন বাংলাদেশের, নিজেদের প্রমাণ করাটা তাই খুব জরুরী হয়ে উঠলো। সাথে যোগ হলো মাশরাফীর আরেকটি ভবিষ্যদ্বানী, ‘এইবার আসলি নাড়ায়ে দিবানি!’

এরপর মাঠে গড়ালো ক্রিকেট, নাটকীয়তাময় লো-স্কোরিং এই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়াকে ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং সবদিক থেকেই পরাভূত করে নখকামড়ানো উত্তেজনাময় এই ম্যাচ বাংলাদেশ জিতে নিলো ২০ রানে। একই সাথে গত ১৭ বছর ধরে জমে থাকা অনেক ক্ষোভ, অনেক অভিমানও যেন ভাষা পেলো অনায়াসে। সব বিতর্ক, সব অপমান, সব বাঁকা কথার সবচেয়ে ভালো উত্তরটা যে সবাই পেয়ে গেছে মাঠের পারফরম্যান্সেই!

অথচ হয়তো এই বাংলাদেশই কিছুদিন পর আর অস্ট্রেলিয়া-ইংল্যান্ডদের সাথে খেলার সুযোগ পাবে না। দুই স্তরের টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ চালু হয়ে গেলে বাংলাদেশ র‍্যাংকিংয়ে নিচের দিকে থাকায় হয়তো সেভাবে আর ম্যাচই পাবে না উপরের দিকে থাকা দলগুলোর সাথে। কে জানে, পরেরবার অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলতে হলে ঠিক কতদিন অপেক্ষায় থাকতে হবে!

 

গত হোম সিরিজে টেস্ট ক্রিকেটের কুলীনতম সদস্য ইংল্যান্ডকে হারিয়ে গোটা বিশ্বকে নাড়িয়ে দিয়েছিলো বাংলাদেশ, এরপর শ্রীলঙ্কায় গিয়ে নিজেদের শততম টেস্টে তাঁদের মাঠেই হারিয়ে এসেছে স্বাগতিকদের, এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বলে-কয়ে এই জয়। ক’জনই বা ভাবতে পেরেছিলো এমনও হতে পারে?

ভেবেছিলেন তাঁরা, ভেবেছিলেন একজন সাকিব আল হাসান। শুধু ভাবেননি, অস্ট্রেলিয়ার সাথে মাইন্ডগেম খেলাটার শুরুও করেছেন তিনিই। শুধু মুখ খুলেই বসে থাকেননি, ব্যাটে-বলে অস্ট্রেলিয়াকে রীতিমতো ধ্বসিয়ে এবং নাচিয়ে ছেড়েছেন সাকিব। আরও একবার প্রমাণ করেছেন, কেন তিনি বিশ্বসেরা। আরও একবার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন, তারকায় ভরা এই বাংলাদেশ দলে এক দশক পেরিয়ে এসে এখনও তিনিই শেষ ভরসা!

আরও একবার জ্বলে উঠেছেন তামিম ইকবাল, নিজের ৫০তম টেস্টে আরেকবার দুই ইনিংসেই ফিফটি করার কীর্তি গড়েছেন তিনি। শুধু রানসংখ্যাটাই নয়, সবচেয়ে মুগ্ধ করার মতো ব্যাপার ছিলো তাঁর ব্যাটিং করার ধরণটা। অস্ট্রেলিয়ার দারুণ বোলিং অ্যাটাককে যেভাবে সামলেছেন, যেভাবে দুই ইনিংসের শুরুর বিপর্যয় সামলে দলের হাল ধরেছেন, গোটা ম্যাচের সেরা ব্যাটসম্যান ছিলেন সম্ভবত তিনিই। অথচ, মাত্র তিন-চার বছর আগেও কি কেউ এই তামিম ইকবালের কথা ভাবতে পেরেছিলো কেউ? তখন তামিম ইকবাল মানেই আগ্রাসন, প্রথম বলেই ডাউন দ্য উইকেটে আসা। সৌম্য সরকার আসার আগ পর্যন্ত তাঁকেই দেওয়া ছিলো ‘লাইসেন্স টু কিল’, আর সে কারণেই বারবার বেরিয়ে এসে খেলতে চাইতেন হয়তো। আর এর ফলে দলকে প্রায়ই বিপদে ফেলে দিতেন ইনিংসের শুরুতেই আউট হয়ে গিয়ে। সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে দিনে দিনে নিজেকে তুলে নিচ্ছেন অনন্য উচ্চতায়, হয়ে উঠছেন বিশ্বের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান। আর এই দাবিটা জানানোর জন্য এই ম্যাচের চেয়ে ভালো প্ল্যাটফর্ম আর কোথায় পেতেন তিনি?

যেকোনো দেশের উন্নতির জন্য মাঝেমধ্যেই একটা ‘অলিখিত’ মানদণ্ড দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়, ‘আগে ইংল্যান্ড-অস্ট্রেলিয়ার সাথে জিতে দেখাও দেখি!’  গত এক বছরের মাথায় ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়া, বিশ্বের কুলীনতম দুই সদস্যদেশকে টেস্ট হারিয়ে বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে, বড় দল হয়ে উঠেছে তাঁরাও। নিজেদেরকে বিশ্বের নতুন পরাশক্তি হিসেবে ঘোষণা করার জন্য এর চেয়ে বড় উপলক্ষ্য আর কী হতে পারতো?

মাঠের বাইরে বাংলাদেশ দারুণ অস্বস্তিকর এক পরিস্থিতি পার করছিলো। মাহমুদউল্লাহ-মুমিনুলের স্কোয়াড থেকে বাদ পড়া, এরপর আবার নাটকীয়ভাবে দলে মুমিনুলের অন্তর্ভুক্তি, একাদশে দেশের সফলতম টেস্ট ব্যাটসম্যানের সুযোগ না পাওয়া, এমন হাজার রকমের বিতর্ক মাথায় নিয়েই খেলতে নেমেছিলো বাংলাদেশ। আর সব বিতর্ক ঝেড়ে ফেলার জন্য প্রয়োজন ছিলো দারুণ একটি পারফরম্যান্স, একটি সাজানোগুছানো জয়। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এমন দাপুটে এক জয়ের পর সেই বিতর্কও কিছুটা হলেও যেন চাপা পড়ে গিয়েছে!

জিওফ বয়কট, বীরেন্দর শেবাগসহ আরও অনেকের ভ্রুকুটির যোগ্য উত্তর দেওয়ার জন্য হলেও এই টেস্টটা জেতা খুব প্রয়োজন ছিলো বাংলাদেশের। এখন আমরাও বুক ফুলিয়ে বলার সামর্থ্য রাখি, ‘আমরা এখন পরাশক্তি!’ এই স্বপ্নেই গত ১৭ বছর বুঁদ হয়ে ছিলাম আমরা, অবশেষে এসেছে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। এখন আমাদের আনন্দের সময়, শুধুই উপভোগের সময়।

ঈদ মোবারক বাংলাদেশ। এমন আনন্দদায়ক ঈদ আগে আর ক’টাই বা এসেছে!

https://www.mega888cuci.com