একটা প্রেমের গল্প

বারোই ডিসেম্বর সকাল দশটা। বেশ রোদ্দুর চারপাশে। শীতের রোদটা বেশ উপভোগ্য। আবির সেই রোদ্দুর গায়ে মাখতে মাখতে অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটাকে দেখছে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের পাড়ে। তার পরনে নীল শাড়ি। আবির কখনো অপ্সরী দেখেনি, কিন্তু এই মুহুর্তে সে জানে সামনের মেয়েটা দেখতে একদম অপ্সরীদের মত সুন্দরী। সমুদ্র থেকে উড়ে আসা হাওয়ায় মেয়েটার লম্বা চুল উড়ছে, উড়ছে তার নীল শাড়ির আচল। আবির এগিয়ে গেল পায়ে পায়ে। মেয়েটার কাছে, খুব কাছে।

– এক্সকিউজ মি?

মেয়েটা পেছন ফিরলো। কাজল কালো চোখ মেলে চাইলো আবিরের দিকে। বললো, ‘আমাকে বলছেন?’

আবির হ্যা সূচক মাথা নাড়লো। মেয়েটার চোখে চোখ রেখে বললো, ‘সমস্যা কি আপনার?’

মেয়েটা অবাক হলো, ‘আপনি ঠিক কোন সমস্যার কথা বলছেন?’

– এই যে পরনের নীল শাড়ি, লম্বা চুল, অপ্সরীদের মত চেহারা, এর সবই তো সমস্যা।

– আমি আপনার কথা ঠিক বুঝছি না।

আবির এবারে রেগে গেল। রাগান্বিত গলায় বললো, ‘হু, এখন তো ঢং করবেনই। বাংলা সাহিত্যের বাশটা মেরে দিয়ে এখন না বোঝার ভান হচ্ছে, তাইনা? আপনার কি মনে হয়না জিনিসটা বেশি বেশি হয়ে যাচ্ছে? গল্প, উপন্যাস, নাটক সবখানেই ঘুরেফিরে সেই একই নীল শাড়ি, একই লম্বা চুল, একই অপ্সরীদের মত চেহারার নায়িকা। এসব হচ্ছে আপনাদের মত মেয়েদের জন্যই। মানুষ এখন বাংলা প্রেমের গল্প নিয়ে হাসাহাসি করে। ক্যান ভাই, প্লাজো পরা শ্যামলা মেয়েদের চাঞ্চ দেয়া যায়না একটু? থ্রিপিচ পরা কালো মেয়েরাই বা কি দোষ করলো! আর কতদিন এই চেহারা আর এই নীল শাড়ি বিক্রি করে খাবেন। পাঠকরা যে এখন আপনাদের উপর বিরক্ত সেটা বুঝেন? আর আপনার নাম কি শুনি? অবন্তি না নীলা?

– অবন্তি।

– বাহ ভালো তো। এই একই টাইপের নাম নিয়ে আর কত? লেবু বেশি চিপলে যে তিতা হয়ে যায়, সেটা জানেন? সালমা, খাদিজা, মনোয়ারা, বিলকিস এদের কি হক নেই কোনো? এদের কি ইচ্ছা করেনা একবার নায়িকা হওয়ার?

মেয়েটা কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। যেন ভাষা খুজে পাচ্ছে না কি বলবে। আবির এতে রেগে গেল আরো।

– এখন তো চুপই থাকবেন। কিছু বলার মুখ থাকলে তো! আমি আপনাকে লাস্ট ওয়ার্নিং দিয়ে যাচ্ছি মিস অবন্তি। এরপরে আর কোনোদিন যদি এই নীল শাড়ি আর লম্বা চুল নিয়ে বাংলা সাহিত্যের আশেপাশেও ঘুরাঘুরি করতে দেখেছি তাইলে আমার মত খারাপ আর কেউ হবে না। মাইন্ড ইট।

অবন্তি এবারে মুখ খুললো, ‘কে আপনি? এসব কি বলছেন? আমাকে চিনেন আপনি?’

– হেহ, আপনারে কেডা না চিনে! আবির মুখ বাকালো। দুনিয়ার ছেলেদের সাথে প্রেম করা ছাড়া আপনাদের আর কোনো কাজ আছে? আল্লাহ যে পৃথিবীতে মানুষরে শুধু প্রেম ভালোবাসার জন্য পাঠায়নাই এটা কবে বুঝবেন আপনারা? খাওয়া, ঘুম, গোসল কিচ্ছু নাই, সারাদিন খালি প্রেম আর প্রেম। ছিহ!

– আপনি তো আচ্ছা লোক মশাই। কিছু বলছি না দেখে সেই তখন থেকে বকবক করে যাচ্ছেন। আপনি এখান থেকে না গেলে কিন্তু আমি আমার ভাইয়াকে ডাক দিব।

– ও আচ্ছাহ, আপনার ভাইয়া তো আবার মাস্তান হয়, আমি ভুলেই গেছিলাম। সিরিয়াসলি? এসব আর কত? বাস্তবে সব সুন্দরী মেয়ের ভাইয়া মাস্তান হয় না, ওকে? কেউ কেউ ভদ্রও হয়। অবশ্য বাস্তবতার আপনারা কি বুঝবেন। আপনারা পাঠকদের সেই একই জিনিস খাওয়াচ্ছেন আর পাঠক খাচ্ছে।

অবন্তি এবার উলটো রেগে গেল, ‘ভাই আপনার মাথায় যে সমস্যা আছে সেটা জানেন? আপনি একটা ভালো ডাক্তার দেখান। আমারে বিরক্ত কইরেন না। আমি গেলাম। বাই!’

অবন্তি রেগেমেগে চলে যেতেই আবির মুচকি হাসলো। এবার একটু ভালো লাগছে। এতোদিনের জমানো রাগ শোধ নেয়া গেল। বাংলা সাহিত্যের প্রেমের গল্পগুলো বড্ড বেশি একই রকম হয়ে যাচ্ছিল। কোনো বাস্তবতা নেই, নেই কোনো ব্যতিক্রমও। তবে আবির দেখাবে। তার প্রেম কাহিনী হবে একদম আলাদা। যেখানে নীল শাড়ি পরা অপ্সরীর মত লম্বা চুলের চোখে কাজল দেয়া কোনো নায়িকা থাকবে না। সে একাই বাংলা সাহিত্যকে এই ক্লিশে ক্যাটাগরি থেকে বের করার চেষ্টা করবে।

যেই ভাবা সেই কাজ। আবির আশেপাশে চাইলো ভালো করে। অনেক মেয়েই ঘোরাঘুরি করছে। হ্যা, ঐতো একজনকে দেখা যাচ্ছে। চেহারা খুব বেশি ভালো না। মুখে ব্রণ। ববকাট চুল। গায়ের রঙ শ্যামলার এক শেড নীচে। পরনে সালোয়ার কামিজ।

ইয়েস, এই মেয়ের সাথেই প্রেম করবে ও। এগিয়ে গেল মেয়েটার দিকে।

– হ্যালো।

মেয়েটা হাসলো, ‘হাই।’

– আপনার নামটা জানতে পারি?

– হ্যা, আমার নাম মনিরা।

ইয়েস, পারফেক্ট। আবির খুশি হলো। এই মেয়েকেই তো খুজছে ও। অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর আস্তে আস্তে বললো, ‘মনিরা শোনো, আমি খুব জটিল একটা ছেলে। এর আগে আরো চার পাঁচটা প্রেম করেছি, কিন্তু টিকেনাই। আজ দূর থেকে যখন তোমাকে দেখি তখন মনে হয়েছে তোমাকে আমার পাইতেই হবে এমন কিছু না, তবে পাইলে ভালো হয় আরকি। তোমাকে না পেলে আমি মরে যাব না অবশ্য। পাইলে যে সারাজীবন বেঁচে থাকব ব্যাপারটা এরকমও না। আল্লাহ যে কয়দিন হায়াৎ দিছে ওই কয়দিন পর এমনিই মরবো। এখানে তোমাকে পাওয়া না পাওয়ার কোনো হাত নাই। তোমার নামে আমি আমাদের গ্রামের তেইশ শতক ধানী জমি লিখে দেব, বাজার থেকে এনে দেব তাজা মাছ। সাথে কচি লাউ। আমি তোমার জন্য খুব বিজি গাইনী ডাক্তারের ফার্স্ট ডে সিরিয়াল এনে দিব। প্রতিদিন রাতে নিজ হাতে টাঙাবো মশারি। বাচ্চাদের টাইমমত স্কুল থেকে নিয়ে আসব, ভুলে যাব না একদিনও। ঘরে তেলাপোকা উড়লে মেরে দিব শুধু তোমার জন্য। তোমার সব ছবি আমি নিজ হাতে এডিট করে সুন্দর বানিয়ে দিব। কারেন্ট বিল দিতে ভুলে যাব না কখনো। লাইনে দাঁড়িয়ে তোমার ব্যাংক একাউন্টের ইএমআই শোধ করে আসব। তোমার জন্য অনলাইনে অর্ডার করে এনে দিব আড়াইশো টাকার নেইল পালিশ রিমুভার। তুমি কি আমার প্রেমিকা হবে মনিরা?’

মনিরা চোখ বড় বড় করে চেয়ে আছে। যেন এতো আশ্চর্য সে তার লাইফে কখনো হয়নি। ধাতস্থ হতে টাইম নিলো বেশ কিছুক্ষণ। তারপর বললো, ‘এক্সকিউজ মি ভাই, আপনি এগুলা কি বলছেন? আমি তো কিছুই বুঝলাম না।’

আবির বিরক্ত হলো, ‘উফ এখানে না বোঝার কি আছে? আমি তোমাকে বাস্তবসম্মত উপায়ে প্রপোজ করলাম। বাংলা প্রেমের উপন্যাসের নায়কদের মত অবাস্তব কথাবার্তা বলিনাই। তাদের মত আমি তোমার নামে পুরো পৃথিবী লিখে দিতে পারব না। কারণ এই পৃথিবী আমার বাপের না। তাছাড়া টেকনিক্যালি চাঁদ এনে দেয়াও অসম্ভব। এতে সৌরজগতের ভারসাম্য নষ্ট হবে। এরচেয়ে টাটকা মাছ আর কচি লাউ বেশি গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। ধরো চাঁদ তোমার ফ্রিজে আছে কিন্তু বয়স্ক লাউ সেদ্ধ হইলো না, তখন কি খাবা? চাঁদ খেয়ে তো আর থাকা যায় না। এই যে বললাম ডাক্তারের সিরিয়াল এনে দিব, এটাই কি লাইফের জন্য বেশি প্রয়োজনীয় জিনিস না? একশো আটটা নীলপদ্ম দিয়ে কোনো কাজ হয়? নীলপদ্ম আর গোলাপ ভেজে খাওয়া গেলেও একটা কথা ছিল। তাই আমি গল্প উপন্যাসের মত অবাস্তব ও অপ্রয়োজনীয় না, বাস্তব ও প্রয়োজনীয় পদ্ধতিতে প্রপোজ করেছি। সাথে সাথে এরকম প্রপোজ যেহেতু কেউ করেনা সেহেতু এটা ব্যতিক্রমও হলো। কি বলো? আমার শখ আমি ব্যতিক্রমী প্রেম করব। বাংলা প্রেমের গল্পগুলোর মত গতানুগতিক, বহু ব্যবহারে পুরানো প্রেম না। সেজন্যই তো নীল শাড়ি পরা অপ্সরী ছেড়ে তোমার কাছে আসছি।’

মনিরা এবার ফিক করে হেসে দিল। বললো, ‘আপনি তো ভালো পাগল আছেন। আপনার পদ্ধতি আমার পছন্দ হইছে। ব্যতিক্রমী আছে। বাংলা সাহিত্য আসলেই আজকাল ক্লিশে হয়ে গেছে।’

আবির স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়লো, ‘তাহলে কি তুমি হ্যা? আমরা কি এখন প্রেমিক প্রেমিকা’

– উহু, ছোট্ট একটা সমস্যা আছে।

– কি সমস্যা?

– আমার বয়স এখন তেইশ। আর আমি উপন্যাসের নায়িকা না যে স্বপ্নের নায়কের আশায় এতোদিন একা থাকবো। আমি বাস্তব জীবনের মেয়ে। আর বাস্তবতা অনুযায়ী আই হ্যাভ এ বয়ফ্রেন্ড।

– ওহ শিট, আবীর হতাশ হলো। তাহলে আর কি করা, আমি যাই।

– উহু, এখনো কিছু করার আছে।

– কি সেটা শুনি?

মনিরা হাসলো আবারো, ‘দেখেন আমি যদি এখন সিঙ্গেল থাকতাম আর আপনার সাথে আমার প্রেম হয়ে যেত তাহলে কি সেটা ব্যতিক্রম কিছু হতো? হতো না।’

– আরে তাইতো, এটা তো ভেবে দেখিনি।

– হ্যা, একারণেই আপনার জন্য আমার কাছে একটা অফার আছে। ব্যতিক্রমী প্রেমের অফার।

– কি সেটা, শুনি?

– সেটা হলো এই যে, আমি আপনার সাথে প্রেম করব। এমন প্রেম যা পৃথিবীতে আগে কোনো ছেলে করেনি। এই প্রেমের শর্ত হবে আমার বয়ফ্রেন্ড থাকবে তার জায়গাতেই, আবার আপনিও থাকবেন। আমি আমার বিএফকেই বিয়ে করব। কিন্তু আপনি লাইফে কখনো বিয়ে করতে পারবেন না। কারণ আপনি শুধু আমাকেই ভালোবাসেন এবং আপনার প্রেম পবিত্র। এছাড়া আমাদের দেখা হবে প্রতি সপ্তাহে এক ঘন্টার জন্য। কিন্তু আপনি এজীবনে কখনো আমাকে ছুতে পারবেন না। এভাবেই সারাজীবন আমাদের প্রেম চলবে। কি? ব্যতিক্রম না অনেক?

– ইয়ে মানে, সেরকমই তো লাগে।

– তাইলে বলেন, রাজি?

– ডিসিশন নেয়ার জন্য আমার একটু টাইম লাগবে।

– আচ্ছা ভাবেন ভাবেন, সমস্যা নাই। কাল ঠিক এই সময় আমি এখানেই থাকবো। আপনি এসে উত্তর দিবেন। আজকের মত বাই।

আবির পাগল ঠিক আছে, কিন্তু এতোটাও পাগল না। এইটা কোনো প্রেমের ধরণ হলো? ব্যতিক্রমের চক্করে নিজের লাইফ নষ্ট করার কিছু নাই। আবির তখনই ডিসিশন নিয়ে ফেললো এই মেয়ের সাথে কাল আর দেখাই করবে না। কোনোদিনই আর দেখা করবে না।

রাতে বাসায় ফিরে সারারাত আবীরের ঘুম হলো না। উহু, মনিরার জন্য নয়, আবিরের অনিদ্রার কারণ অবন্তি। উফ, কি চোখ, কি চুল! এতো সুন্দর একটা মানুষ কিভাবে হয়! আবীর সকালবেলা রিয়েলাইজ করলো সে বহু ব্যবহারে পুরানো সেই একই প্রেমের গল্পের মত, একই নায়িকার প্রেমে পড়ে গেছে। বাস্তবতা যাক জাহান্নামে, আবীরের ঐ নীল শাড়ি পরা অপ্সরীর মত মেয়েকেই লাগবে। যে মেয়ে ওর জন্য এই তেইশ বছর অবধি সিঙ্গেল আছে।

কিন্তু একটা ঝামেলা হলো মেয়েটা কোথায় থাকে, কি করে এসব আবীর কিচ্ছু জানেনা। এই শহরের লক্ষ লক্ষ মানুষের ভীড়ে অবন্তিকে কোথায় খুজে পাবে আবির?

আবিরের ভীষণ আফসোস হলো। একটু বেশি বুঝতে গিয়ে সে তার ভালোবাসার মানুষটাকেই হারিয়ে ফেলেছে। এখন তার অবন্তিকে খুজে বের করতেই হবে। যেকোনো মূল্যে।

আবির পরবর্তী এক মাস সেই প্রথম দেখা হওয়ার জায়গাটাতে প্রতিদিন অবন্তিকে খুজলো। পেল না। সমুদ্র সৈকতে মানুষ তো আর প্রতিদিন আসেনা। আবির সব মহিলা কলেজের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, লোকাল বাসে চড়ে ঘুরলো উদ্দেশ্যহীন, ট্রেনের জানালা দিয়ে প্লাটফর্মে চোখ রাখলো তিন মাস। কিন্তু নাহ, নেই অবন্তি। মেয়েটা যেন সত্যি সত্যি হারিয়েই গেছে।

তারপর হঠ্যাৎ করেই আবিরের মাথায় চিন্তাটা আসলো। ও রিয়েলাইজ করলো এভাবে খুজে আসলে লাভ নাই। অবন্তির সাথে ওর এমনিতেই জীবনে আরো একবার দেখা হবে। কোনো প্ল্যান ছাড়া কোনো একদিন কোনো এক জায়গায় হুট করে দেখা হয়ে যাবে। বাংলা প্রেমের গল্পের এটাই নিয়ম। চিরাচরিত সূত্র। বাস্তব হলে এমনটা হতো না, কিন্তু ও যেহেতু গল্প অনুযায়ী প্রেম করতে রাজি হয়েছে সেহেতু এটাই হবে।

জিনিসটা সত্যি সত্যিই ঘটলো। আবির এক ফ্রেন্ডের বড় ভাইয়ের বিয়েতে গিয়ে দেখলো কনের আসনে অবন্তি বসে আছে। আজ অবন্তির বিয়ে। আকাশ ভেঙে পড়লো আবিরের মাথায়। ও এখন কি করবে? অবন্তির বিয়ে হয়ে গেলে গল্প না, বাস্তবেই ও মরে যাবে। পৃথিবীর রিয়েলিটি অন্য সময় যা ই হোক না কেন, এই মুহুর্তে এটাই সত্যি। অবন্তি ছাড়া আবিরের লাইফে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই নেই। না ডাক্তারের সিরিয়াল, না টাটকা মাছ আর কচি লাউ। না কারেন্ট বিলের লাস্টডেট। এই পৃথিবী যদি আবিরের হতো তাহলে কোনো চিন্তাভাবনা ছাড়াই অবন্তির নামে লিখে দিত। সাধ্য থাকলে এনে দিত চাঁদটাও, এতে যত কষ্টই হোক, ও করত। লাইফে প্রেমের চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অনেক জিনিস আছে, কিন্তু সবার জীবনেই এমন একটা মুহুর্ত আসে যখন সব বাস্তবতা মিথ্যা হয়ে যায়। তখন মেয়েটাকেই মনে হয় পৃথিবীর সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ কিছু। একমাত্র বাস্তবতা।

আবির অবন্তির কাছে গিয়ে বললো, ‘এইটা কি হলো? তোমারই কেন বিয়ে হতে হলো আজ।’

অবন্তি হাসলো, ‘এটাকে বলে গল্পের টুইস্ট’

– এখন আমি কি করব?

– সেটা তুমি জানো।

– চলো পালাই।

– উহু সম্ভব না। আমি আমার আব্বু আম্মুকে কষ্ট দিতে পারব না। তাছাড়া তোমার সাথে এমন না যে আমার প্রেম আছে।

– কিন্তু আমি তো তোমাকে ভালোবাসি।

– সেটা তোমার সমস্যা। তোমাকেই কিছু করতে হবে। এখানে আমার কিচ্ছু করার নেই।

আবির বিয়ের আসর থেকে বের হয়ে আসলো। তার ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ফার্মেসীতে গিয়ে দুই পাতা ঘুমের ঔষধ কিনলো। এই জীবন সে আর রাখবে না। বাসায় যাওয়ার জন্য রিক্সায় উঠলো। হঠ্যাৎ আবিরের মাথায় আসলো আইডিয়াটা। হ্যা একজন আছে যে ওকে এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচাতে পারে। এই পৃথিবীর একমাত্র মানুষ যে এনে দিতে পারে অবন্তিকে। সে আর কেউ না। এই গল্পের লেখক সোহাইল রহমান।

সোহাইল রহমান হাসলো, আমার পা ধরে লাভ নাই।

আবির কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, ‘প্লিজ। আমি অবন্তিকে ছাড়া বাঁচবো না।’

– আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু এক লাখ টাকা লাগবে।

– হোয়াট।

– হুম, এক দাম একলাখ। এখনই দিলে আমি ব্যবস্থা নিব।

– কিন্তু আমার কাছে তো এতো টাকা নাই এখন। আমি পরে দিব। প্লিজ। বিশ্বাস করেন।

– উহু, আমি বাকিতে বিশ্বাসী না।

– দেখেন আপনি এতো নিষ্ঠুর হইয়েন না।

– ওকে, তোমার পকেটে একটা আইফোন দেখা যাচ্ছে।

– আচ্ছা এটা রাখেন আপনি। প্লিজ অবন্তির বিয়ে থামান।

– আর ঘড়িটা।

– এটাও রাখেন।

– কোটটাও বেশ সুন্দর।

– আচ্ছা দিলাম।

– মানিব্যাগ আর জুতা।

– আপনি সব নিয়ে নেন। শুধু অবন্তিকে এনে দেন।

সোহাইল রহমান আইফোন পকেটে ঢুকাতে ঢুকাতে বললো, ‘আচ্ছা তুমি বাসায় গিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুম দাও।’

– আর অবন্তির বিয়ে?

– সেটার দায়িত্ব আমার উপর ছাড়ো।

কাজী অবন্তিকে বললো, ‘মা কবুল বলো। বলো আলহামদুলিল্লাহ কবুল।’

কাজীর পাশে দাঁড়ানো আবির চিৎকার দিল, ‘না অবন্তি বইলো না। প্লিজ।’

আবিরের আম্মু দৌড়ে আসলো, ‘কি ব্যাপার তুই ঘুমের মধ্যে চিৎকার দিচ্ছিস কেন? কি হয়েছে? দুঃস্বপ্ন দেখছিস?’

আবির উঠে পড়লো, ‘এ এটা স্বপ্ন ছিল? অবন্তির বিয়ে হচ্ছে না?’

– কে অবন্তি? কার বিয়ে?

– আজ সকালে আমি যার বিয়েতে গেলাম।

– কই তুই তো আজ সারাদিন বাসা থেকে বেরই হোসনি।

আবির বুঝতে পারলো সোহাইল রহমান গল্প লেখার সেই কমন ট্রিক্স ইউজ করেছে। যেকোনো ঘটনাকে স্বপ্ন দিয়ে বদলে দেয়া। এই যে এতোদিন যা হলো সবই স্বপ্নে ঘটেছে। অবন্তির সাথে ওর এখনো বাস্তবে দেখাই হয়নি। আবির ক্যালেন্ডার দেখলো। আজ এগারো ডিসেম্বর। বারো ডিসেম্বর কালকে।

আবির ঘুম থেকে উঠে পড়লো। আজ আর ঘুম হবে না। কাল অনেক বড় একটা দিন ওর জন্য।

বারোই ডিসেম্বর সকাল দশটা। বেশ রোদ্দুর চারপাশে। শীতের রোদটা বেশ উপভোগ্য। আবির সেই রোদ্দুর গায়ে মাখতে মাখতে অনেকক্ষণ ধরে মেয়েটাকে দেখছে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে সমুদ্রের পাড়ে। তার পরনে নীল শাড়ি। আবির কখনো অপ্সরী দেখেনি, কিন্তু সামনের মেয়েটা দেখতে একদম অপ্সরীদের মত সুন্দরী এ বিষয়ে শিওর ও। ও জানে মেয়েটার নাম অবন্তি। ওর নাম আবির। আবির আর অবন্তি বেশ রোমান্টিক জুটি। যেকোনো কমন প্রেমের উপন্যাসের জন্য। আবির এগিয়ে গেল। মেয়েটাকে সুন্দরভাবে প্রপোজ করতে হবে।

গল্প আর বাস্তব এক হওয়ার আসলে কোনো দরকার নেই। গল্প জগৎটা কল্পনার। এটা আলাদাই থাক। গল্পে অপ্সরীর মত মেয়েরা বার বার নীল শাড়ি পরে ঘুরে বেড়াক। নায়ক মেয়েটার পায়ে এনে দিক চাঁদ। বাস্তব জীবন কাউকে দ্বিতীয়বার সুযোগ না দিলেও গল্প ঠিকই দিক। এটাই তো গল্পের ম্যাজিক!

অলিগলি.কমে প্রকাশিত সকল লেখার দায়ভার লেখকের। আমরা লেখকের চিন্তা ও মতাদর্শের প্রতি শ্রদ্ধাশীল। প্রকাশিত লেখার সঙ্গে মাধ্যমটির সম্পাদকীয় নীতির মিল তাই সব সময় নাও থাকতে পারে।