একজন নীরব যোদ্ধা

নায়ক শব্দটি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের নামের সাথে যায় না। বাংলাদেশের অনেকগুলো বড় জয়েই অবদান রয়েছে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের কিন্তু তার প্রায় সবগুলো ম্যাচেই তিনি পার্শ্ব-নায়ক। কোন জয়েই মূল লাইমলাইটে আসা হয়ে উঠে না।

২০০৭ সালের ২৫ জুলাই কলম্বোয় শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের অভিষেক বাংলাদেশের হয়ে। তৎকালীন বাংলাদেশের কোচ ডেভ হোয়াটমোরের মাল্টি-স্কিল তত্ত্বের সুবাদে দ্রুতই দলে জায়গা পাকা করতে সক্ষম হন মাহমুদউল্লাহ। ধীরে ধীরে হয়ে উঠেন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মূল ভরসার একজন। বদলে যাওয়া বাংলাদেশের অন্যতম রুপকার এই মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

২০০৭ সালে অভিষেক হওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে পরিনত হতে থাকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তা তার ক্যারিয়ার গ্রাফ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান। ২০০৭ আর ২০১৭ – এই ১০ বছরে দারুণ উন্নতি রিয়াদের ব্যাটে!

বছর ম্যাচ রান গড় স্ট্রাইক রেট
২০০৭ ৩৬ ৩৬.০০ ৬৬.৬৭
২০০৮ ১৮ ২৭৯ ২৫.৩৬ ৬০.৫২
২০০৯ ১৮ ২৪৮ ২৭.৫৬ ৭২.৯৪
২০১০ ২৪ ৫০৭ ৩১.৬৯ ৬৯.২৬
২০১১ ১৫ ৩০৪ ৩৮.০০ ৭৫.২৫
২০১২ ২১২ ৭০.৬৭ ৮৫.৪৮
২০১৩ ২৪৩ ৩৪.৭১ ৮৪.৯৭
২০১৪ ১৬ ২৯৪ ২৬.৭৩ ৭৫.৯৭
২০১৫ ১৫ ৫০৬ ৩৮.৯২ ৭৮.২১
২০১৬ ২২৯ ২৮.৬৩ ৮২.৯৭
২০১৭ ১১ ২৯৭ ৭৪.২৫ ৯৪.৮৯
মোট ১৪৫ ৩১৫৫ ৩৪.৬৭ ৭৬.০৬

 ২০১৫ বিশ্বকাপে দারুণ ক্রীড়া নৈপুন্য প্রদর্শন করে বিশ্বকাপে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সেঞ্চুরি করার কৃতিত্ব গড়লেন তিনি। চার নম্বরে ব্যাটিং করতে নেমে অসাধারণ ক্রীড়াশৈলী প্রদর্শন করে। আর সম্প্রতি আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে সাকিবের সাথে মহাকাব্যিক জুটি গড়ে সেমিফাইনালে তুলে বাংলাদেশকে। এরকম বাংলাদেশের অসংখ্য বড় জয়ে দারুণ অবদান বাংলাদেশের আনসাং হিরোর; অথচ এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের হয়ে খেলা ১৪৫ ম্যাচের মধ্যে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ ম্যান অব দি ম্যাচ হয়েছেন মাত্র চারটি ম্যাচে!

দলের বিপদে ইনিংস মেরামত করায় মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের দারুণ খ্যাতি। তাইতো অনেকের কাছে পরিচিত ‘ক্রাইসিস ম্যান’ হিসাবে। দলের ক্রাইসিসে সতীর্থদের অভয় দিয়ে দলকে কাঙ্গিত লক্ষ্যে নোঙ্গর করাতে জুড়ি মেলা ভার।

বাংলাদেশ দলের হয়ে দু’টি ম্যাচের কথা মাহমুদুল্লাহ রিয়াদের কখনো ভুলবার কথা নয়। ২০১২ এশিয়া কাপের ফাইনালে পাকিস্তানের সাথে দুই রানে পরাজয় আর ২০১৬ সালে টি-টিয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ১ রানে পরাজয়। হয়ত ক্যারিয়ার শেষেও এই দুইটি ম্যাচের কথা আক্ষেপ সহকারে স্মরণ করবে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

ওয়ানডে ক্রিকেটের মত মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের টেষ্ট পারফরমেন্স ততটা উজ্জ্বল না হলেও নেহাত মন্দ নয় (৩৯ টেষ্টে ২৯.৭৭ গড়ে ২০৮৪ রান)। যদিও টেস্টে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের শুরুর দিকে পা্রফরমেন্স ছিল দৃষ্টিনন্দন। সুনীল গাভাস্কার তাকে বিশ্বের সেরা আট নম্বর ব্যাটসম্যান হিসাবে আখ্যায়িত করেছিলেন। কিন্তু টেষ্ট ক্যারিয়ারে মাঝপথে এসে খেই হারিয়ে ফেলে রিয়াদ। ৩০-৪৮ রানের মধ্যে আউট হয়ে যাচ্ছিলেন, কোনভাবেই ইনিংস লম্বা করতে পারতেছিলেন না, তারই খেসারত দিয়ে বাংলাদেশের শততম টেষ্টে দল থেকে বাদ পড়েন।

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটের সাথে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হলেও বর্তমানে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদ বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। সর্বশেষ আইসিসি র‍্যাংকিংয়ে টি-টোয়েন্টি অলরাউন্ডারের তালিকায় বাংলাদেশের ছয় নম্বর জার্সিধারী খেলোয়াড়টির অবস্থান পাঁচ নম্বরে। টি-টোয়েন্টিতে ব্যাটে–বলে দারুণ পারফর্ম করে যাচ্ছেন নিয়মিত।

তামিম, সাকিব, মাশরাফি, মুশফিকের মত মাহমুদউল্লাহ রিয়াদও বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের মূল স্তম্ভ। তার পারফরমেন্সই এটা প্রমান করে। অথচ প্রতিটি ধাপে ধাপে মাহমুদুল্লাহ রিয়াদকে প্রমান করে যেতে হয়। মুশফিক ওয়ানডে অধিনায়ক থাকার সময়তো রিয়াদ ভায়রা ভাইয়ের কল্যানে সুযোগ পায় এ জাতীয় কথা নিয়মিত শুনতে হয়েছে।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে কখনোই মাশরাফি, সাকিবের মত তুমুল দর্শকপ্রিয় ক্রিকেটার বলা যাবে না। হালের সৌম্য, তাসকিনরা যতগুলো ইন্টারভিউ দিয়েছেন তার তুলনায় মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ইন্টারভিউয়ের সংখ্যা খুবই নগণ্য। কিংবা মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে নিয়ে রিপোর্টের সংখ্যাও খুবই কম। অথচ তাকে নিয়ে নিয়মিত রিপোর্ট করার মত যথেষ্ট কারণ আছে। আসলে পাদপ্রদীপের নীচে থাকতেই পছন্দ যেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের!

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে বাংলাদেশের এই ‘সাইলেন্ট ওয়ারিয়র’ সফলভাবে পার করেছেন ১১ বছর। এই ১১ বছরে লাইমলাইটে না এসেও বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছেন অসংখ্য জয়। বাকী দিনগুলোতে বাংলাদেশের অগনিত জয়ের সাক্ষী হয়ে কাটুক বাংলাদেশের এই ‘আনসাং হিরো’র।

https://www.mega888cuci.com