একঘেঁয়ে অধিনায়কত্ব ও মুশফিকের ব্যক্তিত্ব

‘অধিনায়ককে সবসময় সামনে কি হবে তা নিয়ে ভাবতে হয়, অতীতে যা হয়ে গেছে তা নিয়ে নয়।’ – বলেছিলেন উইন্ডিজ কিংবদন্তী কলিন ক্রফট। ক্যারিবিয়ান আরেক কিংবদন্তী রিচি রিচার্ডসন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে একটা টেস্টে মাত্র ১৮৬ রানের টার্গেট দিয়েই হম্বিতম্বি করছিলেন, এই রানই ওদের করতে দেবো না। অস্ট্রেলিয়াকে রিচার্ডসনরা ঠিকই ওই রান করতে দেয়নি। অস্ট্রেলিয়া অল আউট হয়েছিল ১৮৪তে। টেস্ট ক্রিকেটে ‘১’ রানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হওয়ার ওইটাই একমাত্র ঘটনা।

ইমরান খান এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘আমাদের প্রায় হেরে যাওয়ার অবস্থা তখন। গাদ্দাফী স্টেডিয়ামের প্রেসবক্সে দেখলাম শেয়ালগুলোর(পাকিস্তানের ক্রীড়া সাংবাদিকদের ‘শেয়াল’ বলতেন ইমরান। তাঁর সাথে পাক-সাংবাদিকদের সম্পর্ক নাকি খুব একটা সুবিধের ছিল না।) লাফ ঝাঁপ শুরু হয়ে গেছে। সবকটা তেঁড়ে আসার জন্য প্রস্তুত। তখনি ঠিক করলাম, এই ম্যাচ কিছুতেই হারা যাবে না।’ সেই ম্যাচ ঠিকই বাঁচিয়ে ফেলেছিলেন ইমরান।

বলতে চাইছি, ক্রিকেটে ক্যাপ্টেন মাত্রই শিরদাঁড়া সম্পন্ন ব্যক্তি হতে হবেন অবশ্যই। বোর্ড সভাপতি যখন ক্রিকেটারদের নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন সবাই চুপ থাকলেও অধিনায়ক ‘সাকিব’ বলে উঠেন ‘আপনি এভাবে বলতে পারেন না!’ এখানেই আসে ব্যক্তিত্বের প্রশ্ন, শিরদাঁড়া সোজা রাখার প্রশ্ন।

মনে আছে, মুশফিক প্রথম বিপিএলে সেমিফাইনাল থেকে বাদ যাওয়ার হতাশা থাকার পরও খুব চমৎকারভাবে সংবাদ সম্মেলন সামলেছিলেন। সেবার বরিশালকে নিয়ে উদ্ভট কাজ করা হয়েছিল, তা নিয়ে বাংলাদেশ-দলপতি যা বলেছিলেন তা ছিল খুবই ব্যক্তিত্ব সম্পন্ন ক্যাপ্টেনের কথা। উলটো দিকে শাহরিয়ার নাফিসের গা-বাঁচানো কথায় মর্মাহত হয়েছিলাম।

আমাদের ক্যাপ্টেন কিং তো অহরহই শিরদাঁড়া সমুন্নত রাখার প্রমাণ দেন।

এখন কথা হচ্ছে, এরপর মুশফিকের কি হয়েছে? বছর পাঁচেক আগের মুশফিক আর এই মুশফিকের মধ্যে কি ব্যক্তিত্বের হ্রাস-বৃদ্ধি ঘটেছে? ম্যানেজমেন্টের এমন খেলার পুতুল, ডামি ক্যাপ্টেন তো তিনি থাকতে পারেন না। অন্তত তাঁর যে সোশ্যাল অ্যাকটিভিটি দেখা যায়, সামাজিক যে দায়বদ্ধতা তিনি দেখান তাতে তাঁকে মেরুদন্ডহীন বলেও তো মনে হয় না। তাহলে হচ্ছেটা কি?

মুশফিকের ডিফেন্সিভ ক্যাপ্টেন্সি চরম বিরক্তিকর হলেও, আমি অনেকটা মেনে নিয়েছি। কিন্তু ম্যাচ শেষের আগে হার মেনে নেওয়া কেন? আশরাফুলের ক্যাপ্টেন্সিতেও দেখেছি স্বল্প পুঁজি নিয়েও চমৎকারভাবে ফাইট করতে। নিউজিল্যান্ডকে যেবার হোয়াইটওয়াশ করলো বাংলাদেশ, তখন ১৭৪ রান নিয়েও সাকিব দারুণ লড়াই করেছিলেন, ম্যাচও বের করে ফেলেছিলেন ৩ রানে।

পরে সংবাদ সম্মেলনে সাকিব বলেছিলেন, ‘আমার কখনোই মনে হয়নি আমরা ম্যাচটা হারতে পারি।’ একজন ক্যাপ্টেনের তো ম্যাচ শেষের আগ পর্যন্ত এরকম মানসিকতা থাকা উচিৎ। আজকে যদি আমরা উলটো পজিশনে থাকতাম, তাহলে আমি নিশ্চিত আমাদের ৬-৭ উইকেট পড়ে যেত। কারণ, প্রতিপক্ষ ম্যাচটা ঠিক কঠিন বানিয়ে ফেলত। চতুর্থ ইনিংসে যত ছোট স্কোরই হোক না কেন, চেজ করা বরাবরই চাপের। বাংলাদেশ জিম্বাবুয়ের সাথেই ১০১(বোধহয়, ঠিক মনে নাই) চেজ করতে গিয়ে ৭ উইকেট খুঁইয়ে বসেছিল।

একটা জাতীয় ক্রিকেট টিম নিয়ে এই ধরণের তামাশা চলতে পারে না। আপনি দিনের পর দিন টেম্পারমেন্ট-লেস প্লেয়ারদের টেস্ট আঙিনায় রাখতে পারেন না। শর্টার ফরম্যাটে যাকে-তাকে নামিয়ে দিতে পারেন না। প্লেয়ার সিলেকশনের একটা সিস্টেম আছে, একজন খেলোয়াড়কে জাতীয় দলে আসতে হলে কিছু ধাপ পার করতে হবে, কিছু ক্রাইটেরিয়া পূরণ করতেই হবে। স্পেশাল ট্যালেন্ট ছাড়া সিস্টেম ব্রেক করা যায় না। আর স্পেশাল ট্যালেন্ট তো ভাই, মাসে মাসে জন্মায় না।

ম্যানেজমেন্টকে টিম নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবতে হবে। সোশ্যাল নেটওয়ার্কের একটা বিশাল প্রভাব আছে। সেই প্রভাব, সেই প্রতিপত্তি কাজে লাগাতেই হবে। আমাদের লক্ষ লক্ষ সমস্যার মাঝে ক্রিকেট এক টুকরো তাজা বাতাসের মতো। এই তাজা বাতাসটাকে কিছুতেই দূষিত করতে দেয়া যাবে না।

ম্যাচ জেতা-হারার চেয়ে বড় হচ্ছে, সিস্টেম ও প্রসেস। সিস্টেম আর প্রসেসকে আপনি ‘খেলো’ বানিয়ে দেবেন, আর এক-দুইজনের ‘এক্সট্রা অর্ডিনারী’ পারফরম্যান্সের ক্রেডিট নেবেন, তা তো হতে পারে না।

ম্যানেজমেন্টের কাজ হচ্ছে, সিস্টেম ঠিক রাখা, প্রসেসটা স্বচ্ছ রাখা। বড় বড় কথা বলা না। ক্রিকেটারদের কাজ ক্রিকেটাররা করবেন, ম্যানেজমেন্টের কাজ ম্যানেজমেন্ট করলেই তো হয়!

আমাদের সৌভাগ্য যে, আমাদের দলটাতে কোনো ‘ইগো’ প্রবলেম নেই। সিনিয়র-জুনিয়রদের মধ্যে দারুণ একটা সম্পর্ক আছে। ক্রিকেটাররা দলের প্রতি, দেশের প্রতি শতভাগ নিবেদিত। আবার সেই ক্রিকেটারদের কোয়ালিটিও হাই লেভেলের। তারপরও আমরা বিশ্বের অন্যতম সেরা দল হতে পারব না কেন?

এরকম একটা প্রজন্ম পেতে বহু দেশের বছরের পর বছর লেগে যায়। আর আমরা পেয়েও হেলায় হারাবো, তা তো হতে পারে না।

এমনিতেই অনেক দেরী হয়ে গেছে। এখনও ম্যানেজমেন্ট যদি ঠিক সময়ে ঠিক সিদ্ধান্তটা নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার খেসারত দিতে হবে অনেক অনেক বছর। হয়তো গোটা দুই-তিন প্রজন্ম গিয়েও সেই ক্ষতি সামাল দিতে পারবে না।

https://www.mega888cuci.com