এই দেশে মানুষ থাকে না!

আমাদের অবস্থা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছে, এখন যখন এইচএসসি পরীক্ষা শুরু হয়েছে এবং কোন রকম প্রশ্ন ফাঁস ছাড়া’ই একটা পরীক্ষা সফল করা গিয়েছে; তখন লোকজন শিক্ষা মন্ত্রীকে সাধুবাদ জানাচ্ছে!

আমারা এমন অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছি, এক জেলায় ২০০ জন পুলিশ কনস্টেবল বিনা ঘুষে নিয়োগ পেলে সেটা পত্রিকায় খবর হয়!

ভাবখানা এমন- প্রশ্ন ফাঁস হওয়াটাই স্বাভাবিক কিংবা ঘুষ দিয়ে পুলিশের চাকরী পাওয়াটাই স্বাভাবিক; যদি এর ব্যতিক্রম ঘটে, তাহলে সেটা প্রশংসা পাবার যোগ্য!

এই যে এতসব অনিয়ম, এর একটা মূল কারন অবশ্য আছে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক।

গত পরশু এক সচিব (স্বরাষ্ট্রসচিব) ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাচ্ছিলেন বিমানে করে। তো বিমানে করে কোথাও যেতে হলে তাদের লাগেজ স্ক্যানারে চেক করার নিয়ম আছে।

তো, স্ক্যানার ওই সচিবের লাগেজটিতে ধাতব জাতীয় কোনো পদার্থ থাকার সিগন্যাল দেয়। এ সময় কর্তব্যরত দুই আনসার লাগেজ তল্লাশি করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি লাগেজ মালিককে জানান।

ধাতব কিছু থাকার সন্দেহ হলে কতৃপক্ষ চেক করতে চাইবে, এটাই স্বাভাবিক। কারন এর সঙ্গে অনেক গুলো মানুষের নিরাপত্তা জরিয়ে আছে।

তো আনসারের ওই দুই সদস্য তার লাগেজ চেক করতে চাইলে, তিনি প্রথমেই নিজের পরিচয় দিয়ে বলেছেন- ‘আমি একজন সচিব!’

তিনি কেন নিজের পরিচয় দিতে গেলেন?

কারন তিনি জানেন, নিজের পরিচয় দিলে প্রভাব খাটিয়ে কাজ করে ফেলা যায়।

কিন্তু দুই আনসার পরিচয় জানার পর, খুব বিনীত ভাবে তাকে বলেছেন

-আমরা আমাদের দায়িত্ব টুকু পালন করবো। দায়িত্ব পালন করার জন্য ওই দুই আনসার উল্টো এই সচিবের কাছে বেশ বিনীত ভাবে অনুমতি চেয়েছে।

আর এতেই ক্ষুব্ধ হয়ে ওই সচিব ভদ্রলোক বিষয়টি বিমানবন্দরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করেন।

শেষমেশ এই সচিবের কথা শুনে বিমান বন্দর কতৃপক্ষ ওই দুই আনসারকে সাময়িকভাবে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিয়েছে।

তো বিমান বন্দর কতৃপক্ষ কেন ওই দুই আনসারকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দিয়েছে?

কারন তারা নিজেরাই ভয়ে আছে। নইলে কখন আবার এই সচিব নিজের ক্ষমতা ব্যাবহার করে কতৃপক্ষের চাকরিই না আবার খেয়ে বসে!

এই হচ্ছে আমাদের দেশ।

অথচ এইতো মাস কয়েক আগে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী লাইফ জ্যাকেট না পড়ে ডিঙ্গি নৌকা চালাচ্ছিলেন বলে, সেই দেশের পুলিশ তাকে ফাইন করে দিয়েছিল এবং ওই প্রধানমন্ত্রী তার ভুল বুঝতে পেরে পুলিশের কাছে ক্ষমা চেয়েছে, সেই সঙ্গে ফাইন’টাও দিয়ে দিয়েছে!

আমি ভাবছিলাম,আমাদের এই সচিব যে কোন ক্রাইমে কিংবা জঙ্গিবাদে জরিয়ে পড়েন’নি তার কি কোন নিশ্চয়তা আছে? তিনি তো বোম কিংবা অন্য কোন ভয়ংকর অস্ত্র নিয়েও প্লেনে উঠে পড়তে পারত।

ওই প্লেনে তো আরও অনেক সাধারণ যাত্রীও ছিল। এখন ওই সচিব যদি প্লেন’টা উড়িয়ে দিত; তাহলে এর দায় কার হতো? (আমি বলছি না তিনি দিতেন, একটা উদাহরণ দিচ্ছি কেবল)

বিমানবন্দর কতৃপক্ষ কি সেই দায় নিত?

নাকি সেই দায় তখন চাপিয়ে দেয়া হতো ওই দুই আনসারের ঘাড়ে? কারন তারা তাদের দায়িত্ব ঠিক ভাবে পালন করেনি!

এই দেশে লোকজন ভালো ভাবে কাজ করবে কেন? দায়িত্ব পালন করতে গেলেও হাজারটা সমস্যা। নিয়ম কিংবা আইন যে সবার জন্য এক নয় এই দেশে!

এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরিক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়, এসএসসি, এইচএসসি’র প্রশ্ন ফাঁস হয়, লোকজন ঘুষ দিয়ে পুলিশ হয়ে যায়; কিভাবে হয়, কারা এর সঙ্গে জড়িত?

এই ধরনের বড় বড় শিক্ষক, সচিব, কর্মকর্তারাই। এরা যদি ঠিক থাকতো, তাহলে এই দেশে এতো সব অন্যায় আসলে সত্যি’ই হতো না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে এরা তো সকল প্রশ্নের ঊর্ধ্বে!

পত্রিকায় এই ঘটনা পড়ার পর, আমার বার বার একটা ব্যাপার মনে হচ্ছে। ধরা যাক সচিব ভদ্রলোক বোমা নিয়ে যাচ্ছিলেন ওই প্লেনটি ধ্বংস করার জন্য এবং হলোও তাই!

তখন এই দেশে মানুষজন, পত্রপত্রিকা আহাজারি করে লিখবে- বিমানটিতে একজন সচিব ছিলেন! সবাই এই নিয়ে বড্ড আহাজারি করবে! আহা, কতোই না বড় পদের এবং বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি! এই দেশে তো আবার বড় পদে চাকরী করা মানেই, বিশাল মনের অধিকারী মানুষ! বিমানে থাকা বাদ বাকী যাত্রীদের কথা হয়ত আমরা তখন ভুলেই যাবো!

এই দেশে সচিব, বড় কর্মকর্তা এদের জীবন’ই কেবল জীবন । তাই এদের ব্যাগ পর্যন্ত চেক করা যায় না। এতে আবার উনাদের সম্মান চলে যায় কিনা!

জগতের সমুদয় নিয়ম কেবল আমাদের মতো সাধরন মানুষের জন্য। পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, ব্যাগ দরকার হয় হাজার বার চেক করা হবে; এরপরও চুপচাপ থাকতে হবে। আমাদের আবার সম্মান কিসের! বেঁচে আছি এইতো বেশি!

এই দেশে আইন নির্ধারিত হয় পেশাগত পদের উপর! এই দেশে সম্মান নির্ধারিত হয় আপনি কোন পদে চাকরী করছেন সেটার উপর! খেয়াল করে দেখবেন, কোন অনুষ্ঠানে গেলে লোকজন প্রথমেই নিজের পেশাগত পরিচয় দিয়ে বলে বসবে- আমি ডাক্তার, আমি ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, শিক্ষক, জজ, ব্যারিস্টার, সাংবাদিক ইত্যাদি।

কেন তারা প্রথম পরিচয়েই পেশাগত ব্যাপারটা বলে বসে? কারন তারা জানে, এতে করে তারা আলাদা একটা সম্মান হয়ত পাবে! আলাদা কিছু সুবিধাও হয়ত পেয়ে বসবে! ঠিক যেমন এই সচিব করেছে তার ব্যাগ চেক করতে চাওয়ার কারনে!

এই দেশে মানুষ থাকে না; থাকে কিছু ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, সচিব, ম্যাজিস্ট্রেট, পুলিশ, শিক্ষক, জজ- ব্যারিস্টার এবং সাংবাদিক!

https://www.mega888cuci.com