ইঞ্জিনিয়ার হতে গিয়ে দক্ষিণের সুপারস্টার

সিনেমাজগতের সঙ্গে তার ভাল একটা যোগসাজশ রয়েছে। বাবা সূর্যনারায়ণ রাজু ছিলেন তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির নামকরা প্রযোজক, আর বড় চাচা কৃষ্ণম রাজু বিখ্যাত তেলুগু অভিনেতা। চাচার হাত ধরেই মূলত রঙ্গিন দুনিয়ায় পা রাখা। অথচ, কোন এক সময় নাকি ফিল্মে আসার ইচ্ছে বা পরিকল্পনা কোনটাই ছিল না তার।

ছোটবেলায় আর দশজনের মত তারও ইচ্ছে ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার কিংবা ব্যবসায়ী হওয়ার। তাই হায়দ্রাবাদের শ্রী চৈতন্য কলেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ারিংও পাশ করেছিলেন। কিন্তু অভিনয় রক্তে মিশে থাকলে যা হয় আর কি—হয়ে গেলেন সিনেমা সুপারস্টার। বলছি ‘কাটাপ্পা নে বাহুবলি কো কিউ মারা’–এর সেই মহামতি ‘বাহুবালি’র কথা, মানে প্রভাসের কথা।

প্রভাস—সাউথ ইন্ডিয়ান ফিল্মস্টার। ‘প্রভাস’ নামে পরিচিতি পেলেও এই দক্ষিণী তারকার একটা পারিবারিক ভাল নামও কিন্তু রয়েছে। সেটা হচ্ছে—‘ভেঙ্কট সত্যনারায়ণ প্রভাস রাজু উপ্পালাপতি’। ২০০২ সালে ‘ঈশ্বর’ ছবির মধ্য দিয়ে তিনি চলচ্চিত্রজগতে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে মূল চরিত্রে প্রথম অভিনয় করেন পরের বছর, অর্থাৎ ২০০৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘রাঘবেন্দ্র’ ছবিতে।

স্বভাবতই নবাগত অভিনেতা হিসেবে শুরুটা খুব একটা সুবিধার হয়নি। কিন্তু সব বদলে গেল ২০০৫ সালে এসে। সে–বছর মুক্তি পায় বিখ্যাত পরিচালক এস এস রাজামৌলির ‘ছত্রপতি’ সিনেমাটি। এই ছবিতে তাকে সন্ত্রাসী বাহিনী কর্তৃক শোষিত একজন শরণার্থীর চরিত্রে দেখা যায়। বলা হয়ে থাকে এই ছবিটিই তার ক্যারিয়ারের টার্নিং পয়েন্ট। এই ছবিতে অসাধারণ অভিনয়ের ফলে তিনি রাতারাতি তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির উল্লেখযোগ্য নায়কে পরিণত হন।

ভারতীয় সিনেমার এই হার্টথ্রুবের পনের বছরের ক্যারিয়ারে ওই অর্থে খুব একটা উত্থান–পতন দেখা যায় না। একের পর এক সাফল্যের মই কেবল তার পায়ের কাছেই এসে ধরা দিয়েছে। ২০০৮ সালে রিলিজ হয় অ্যাকশন–কমেডিধর্মী সিনেমা ‘বুজ্জিগাডু’। এরপরের বছর আরও দুটি সিনেমা ‘বিল্লা’ ও ‘এক নিরাঞ্জন’। ‘বিল্লা’ ছবিটির কথা বিশেষভাবে বলতেই হয়। এই ছবির মাধ্যমে তিনি সিনে-বোদ্ধাদের বেশ প্রশংসা কুড়িয়েছেন, বক্স অফিসেও দাপট দেখিয়েছেন।

২০১০ সালে তিনি রোমান্টিক–কমেডি ‘ডার্লিং’ এবং ২০১২ সালে রাঘব লরেন্সের অ্যাকশনধর্মী সিনেমা ‘র‍্যাবেল’–এ অভিনয় করেন। এ ছবি দু’টিও তার ক্যারিয়ারের সর্বাপেক্ষা হিট ছবির তালিকায় জায়গা করে নেয়। এছাড়া ‘ভারশাম’ ‘চাকরাম’ ও ‘মিরচি’র মতো ব্যবসাসফল ছবিতেও দেখা গেছে তাকে।

২০১৪ সালে আবার একসাথে হাত মেলান প্রভাস এবং এস এস রাজামৌলি। এবার এসেই লঙ্কাকাণ্ডটি ঘটিয়ে ফেললেন তারা! মুক্তি পেল—মহাকাব্যিক অ্যাকশন ড্রামা ‘বাহুবলি’। বাকি ইতিহাসটা তো সবারই জানা। এই সিনেমাটি প্রভাসকে নিয়ে গেছে এক অন্যন্য উচ্চতায়। ছাড়িয়ে গেছে তার আগেকার সব সাফল্য। ভারতীয় ছবির আঞ্চলিক সীমারেখা ছিন্ন করে পৌঁছে গেছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে।

‘বাহুবালি’র এ সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার অজস্র ত্যাগ–তিতিক্ষা। এই ফ্র‍্যাঞ্চাইজির শুটিং করতে গিয়ে প্রভাসের জীবন থেকে হারিয়ে গেছে পাঁচটি বছর! এই সময়ের মধ্যে অন্য কোন ছবিতেও চুক্তিবদ্ধ হতে পারেননি তিনি।

জানা গেছে, ‘বাহুবলী’র শুটিং চলাকালীন ১০ কোটি রুপির বিনিময়ে একটি বিজ্ঞাপনের মডেল হওয়ার প্রস্তাব পেয়েছিলেন তিনি, একই সঙ্গে কিছু হিন্দি সিনেমায় অভিনয়ের প্রস্তাবও পেয়েছিলেন। কিন্তু মনোযোগে যাতে ব্যাঘাত না ঘটে, সে–জন্য সব প্রস্তাবই বিনয়ের সঙ্গে ফিরিয়ে দিয়েছেন তিনি।

‘বাহুবলি’ ছবিতে দু’টি চরিত্রে দেখা গেছে তাকে— অমরেন্দ্র বাহুবলি এবং মহেন্দ্র বাহুবলি। প্রভাস জানিয়েছেন, চরিত্রে মানানসই হতে ২২ কেজিরও বেশি ওজন বাড়িয়েছেন তিনি। পরে আবার তা কমাতে হয়েছে ‘শিভুদু’ ভূমিকার জন্য। ছবি দুটিতে কাজ করার জন্য কঠোর প্রশিক্ষণ নিতে হয়েছে তাকে। তিনি আরও জানিয়েছেন, বাস্তবে তার সঙ্গে মহেন্দ্র বাহুবলির বেশ মিল রয়েছে। ওই চরিত্রটির মতো প্রভাস নিজেও খুব প্রাণোচ্ছল।

তেলেগু সিনেমার এই স্টার খেলাধুলা খুবই ভালবাসেন, বিশেষ করে ভলিবল। সময় পেলেই বন্ধুদের নিয়ে ভলিবল খেলায় নেমে পড়েন তিনি। তার ধারণা—এর মাধ্যমে মানসিক চাপ অনেকটা কমে যায়।

প্রভাস পড়তেও খুব ভালবাসেন। একজন বইপ্রেমী পরিচিতজনদের কাছে আলাদা ডাকনাম রয়েছে। অবসরে যে কোন বই পড়াটা তার নেশা। জানা গেছে, বাড়িতে আস্ত একটা লাইব্রেরিও দিয়ে বসে আছেন এই অভিনেতা।

বলিউড থেকে ইতোমধ্যে একের পর এক অফার আসতে শুরু করছে তার কাছে। কিন্তু প্রভাস এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, তিনি প্রথমে বিশেষ একজন পরিচালকের সঙ্গে কাজ করতে চান। তিনি হলেন—‘মুন্নাভাই’ ‘থ্রি ইডিয়টস’ ও ‘পিকে’ খ্যাত ডিরেক্টর রাজকুমার হিরানি।

তেলেগু ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির মোস্ট এলিজেবল এই ব্যাচেলরের ব্যক্তিগত জীবন নিয়েও ভক্তদের আগ্রহের শেষ নেই। জানা গেছে, ‘বাহুবলি’তে অভিনয়ের পর থেকে এখন পর্যন্ত নাকি প্রায় ছ’হাজার বিয়ের প্রস্তাব পেয়েছেন প্রভাস! তবে, ঠিক কবে কার সঙ্গে ‘সাত পাকে বাঁধা’ পড়তে চলেছেন, তা অবশ্য জানা যায়নি।

১৯৭৯ সালের ২৩ অক্টোবর ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন এ সুদর্শন অভিনেতা। বাবা সূর্যনারায়ণ রাজু এবং মা শিব কুমারী। তার ভাইবোনদের মধ্যে তিনিই সর্বকনিষ্ঠ। অনাগত দিনের জন্য অজস্র শুভকামনা। আশা করছি, সামনে আরও দূর যাবেন—এমন কি ‘বাহুবলি’কে ছাড়িয়েও!

https://www.mega888cuci.com