আর্ট ফিল্ম না ‘হার্ট ফিল্ম’

আমি নিজে খুব ঝানু মুভি ক্রিটিক না। তবে বেসিক ধারণামতে আমার মনে হয়, ‘আর্ট ফিল্ম’ চলে তখনই যখন তা ‘হার্ট ফিল্ম’ হয়! অর্থাৎ মন ও মগজে মুভিটির গল্প আর মেকিং গেঁথে যায়। সেদিক থেকে চিন্তা করলে মোস্তফা সারোয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ ডুবিয়েই দিয়েছে বলা যায়। এই প্রথম দুই ঘণ্টার এক সিনেমা দেখলাম যার কোনো দৃশ্যই দর্শককে ছুঁয়ে গেল না।

সিনের পর সিন, সিকুয়েন্সের পড় সিকুয়েন্স যাচ্ছে কিন্তু কোনকিছুই আমার দর্শকমনে কোন আগ্রহ বা অনুভিতু পয়দা করতে পারছে না, এমন ‘আর্ট ফিল্ম’ খুব বেশী দেখিনি! দেখালেনটা কি আসলে ফারুকি? হুমায়ূন আহমেদের জীবন কি এতই খেলো? এতই সহজ? ওয়ান ডাইমেনশনাল? হুমায়ূন আহমেদের জীবন বাংলাদেশের ইতিহাসের সমস্ত সেলিব্রেটিদের জীবনের মধ্যে সবচেয়ে ডাইনামিক, বিতর্কিত, আবেগি ও আইকনিক ছিল। তার জীবন, দ্বিতীয় বিবাহ আর পুরনো সমস্ত সম্পর্কের অবলুপ্তির স্পর্শকাতর এই ঘটনাগুলা যদি একটু ডিটেইলডভাবে, ইমোশনালভাবে ভিন্ন ভিন্ন পার্সপেক্টিভ দিয়ে দেখানোর ট্রাই করতেন তাহলেও হত।

কিন্তু তিনি কি করলেন? তিনি ঘন্টা দুই ধরে যা দেখালেন, সম্ভবত তার চেয়ে আমাদের দর্শকরাই ইস্যুটা নিয়ে বেশী গভীরভাবে জানে। কোন ক্যারেক্টার ডেভেলপমেন্ট নাই, কোন গভীর সীন নাই, কোন ডিটেইল নাই, এই সিনের সাথে ওই সিনের কোন মিল নাই। ধাই ধাই করে সব হয়ে যাচ্ছে আর মাথার ওপর দিয়ে যাচ্ছে।

আর ‘ইনডায়রেক্ট স্টোরিটেলিং’ আর ‘মডার্ন ডেপিকশন’ করতে গিয়ে মূল ঘটনাকেও এমন মোডিফাই করছেন যে এইটা আসলে হুমায়ূন আহমেদরে একপ্রকার অপমানই করা হয়েছে আমি বলব! হুমায়ূন, শাওন দূরে থাক, গুলতেকিন, শিলাদেরও কোন ইমোশন, কোন পার্সপেক্টিভের খুব একটা দাম ডিরেক্টর দেন নাই।

এই মুভিতে ভারতীয় অভিনয়শিল্পী নেওয়াটাই শুরু থেকে আমার অপছন্দ ছিল। ইরফান খান, যতই ভালো অভিনেতা হোক, তিনি জানেনটা কি হুমায়ূন আহমেদ সম্পর্কে? হুমায়ুনের ডিপনেস, হুমায়ুনের চরিত্রের বিচিত্রতা কি আর দুইদিন বসায়ে ক্লাস নিয়ে একটা অবাঙালি মানুষকে শেখানো যায়? পার্নোর মত ফ্ল্যামবয়ান্ট, সারাজীবন বড়লোকের বখাটে মেয়ের চরিত্রে অভিনয় করা কলকাতার মেয়ে শাওনের রহস্যময়তা কি করে আনবে? আনতে পারেনি। তাই এইসব কিছু মুভিতে ছিলও না।

হুমায়ুনের ‘হু’টাও ইরফান হয়ে উঠতে পারেননি। শাওনের ‘শা’টাও হতে পারেননি পার্নো।
তাদের নিজেদের যতটুকু চেষ্টা তারা করেছেন, এরপরেও মেকি বা ইমপোজড একটা ভাব থেকেই গেছিল। সবচেয়ে মাথা ধরিয়ে দিছে ইরফানের ইন্ডিয়ান উচ্চারণে ভাঙা ভাঙা বাংলা আর পার্নোর কলকাতার টানে ঢাকাইয়া করসি গেসি বলার চেষ্টা। এদের ডায়লগ এতই বিচ্ছিরি ছিল সেটা মে বি ডিরেক্টর ও বুঝেছিল। তাই এদের বেশিরভাগ সিন ছিল ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে শ্যুট করা।

জাস্ট চিন্তা করে দেখেন। যাদের নিয়া মূল মুভি তাদের একজনও বাংলা বলতে পারছে না আর তাই তাদের সিনে মুখ না দেখায়ে শ্যুট করছে এটা কি বিচ্ছিরি একটা ব্যাপার! এই মুভির একমাত্র প্লাস পয়েন্ট ছিল তিশা, তিশা তিশা আর তিশা! যদি আমি এই মুভিকে ১ পয়েন্ট ও দেই সেটা হবে তিশার জন্য!

ফারুকী এই মুভিতে ইন্টারন্যাশনাল মাপের সিনেমাটোগ্রাফি শিখেছেন বলে মনে হয়েছে, এইটাই তার ইমপ্রুভমেন্ট, বাকি সবকিছুতে প্রায় শুন্যই পাবেন! এবং তিনি যে সিনেমাটোগ্রাফি শিখছেন, এইটা বুঝাতে গিয়ে তিনি ফিল্মমেকিংয়ের বাকি সমস্ত বেসিককে নাল এন্ড ভয়েড করে দিয়ে খালি সুন্দর সুন্দর গাছ ফুল লতাপাতা বেডরুমের ছবির দেয়াল জানালার পর্দা ড্রয়িংরুমের শোপিসের সিন আর ভিডিও দেখানোয় ব্যস্ত ছিলেন পুরা মুভিতে। এক একটা ক্যারেক্টারের দুই মিনিটের সাধারণ ‘ভাত খাইছ?’ ‘হ্যাঁ খাইছি’ টাইপ ডায়লগের একটা সিকোয়েন্সই এইসব ক্যামেরার কারসাজি আর ব্যাকগ্রাউন্ডে ‘আহারে জীবন’ এর মিউজিক দিয়ে ১০ মিনিটের বানিয়ে টাইম ওয়েস্ট করেছেন। কিন্তু মূল গল্প যদি অন্তঃসারশূন্য থাকে তো এইসব দিয়া বেশিদিন অডিয়েন্স টানা সম্ভব না।

বাংলা সিনেমার এই জোয়ারের টাইমে এইরকম একটা টপিক নিয়ে একটা ভালো সিনেমা কালজয়ী হয়ে থাকতে পারতো! যৌথ প্রযোজনার বেনিফিটে এই মুভি লাভ হয়ত করবে। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ আগে ঢাকা অ্যাটাক নামের কমার্শিয়াল ফিল্ম আমাদের ক্লাস অ্যান্ড মাস কে যেভাবে এক করেছে।

এই মুভি ক্লাস অডিয়েন্সের মনেই ছাপ ফেলতে পারবে বলে মনে হয় নাই, মাস তো দুরের কথা!

মাথার উপর দিয়া যাওয়া ‘আর্ট ফিল্ম’ বানানোর চেয়ে মনের ভিতর দিয়ে যাওয়া ‘হার্ট ফিল্ম’ বানালে মনে হয় বেশি লাভ হত এই সময়ে ফারুকী সাহেব।

https://www.mega888cuci.com