আমেরিকা আমাকে যা শিখিয়েছে

আমি আমেরিকা যাবার পরেই আমাকে ‘ইন্ট্রোডাকশন টু অ্যামেরিকান কালচার’ নামে একটা ক্লাস এ পাঠানো হলো। কোর্স ইন্সট্রাক্টর আইরিশ আমেরিকান। চল্লিশোর্ধ ভদ্রমহিলা ক্যামব্রিজ থেকে পড়ালেখা করেছেন। ক্লাসের শুরুতে নিজের পরিচয় দিতে যেয়ে কোনো একাডেমিক ইনফর্মেশন দিলেন না। প্রজেক্টরের বিশাল পর্দায় তার কিছু ছবি দেখালেন। বেইজবল খেলতে যেয়ে হাত ভেঙ্গে ফেলেছেন, সাইকেল চালাতে ভালবাসেন, বার্গার হাতে নিয়ে জিব বের করে ভেংচি কাটছেন, র‌্যাটেল স্নেকের কামড় খেয়ে হসপিটালে শুয়ে আছেন, এরকম আর কি।

তারপর বললেন, প্রথম ক্লাসে আমরা আইস ব্রেকিং করবো। তোমরা সবাই ১ মিনিট ধরে নিজেদের ব্যাপারে কিছু ফানি কথা বলো। সব ছাত্র কত মজার মজার গল্প বললো। একজন নাকি জম্বি থেকে ভয় পায়, একজন একসাথে ৫০টা বার্গার খেতে পারে। এরপর আমার পালা আসলো।

আমি ভেতো বাঙালি খাবার দাবার নিয়ে কি ফান করবো? এসব আবার কোনো ফান হলো নাকি! ‘আমার কাছে খাবার নিয়ে ফান মানে বন্ধুর টাকাতে খাওয়া’ তো আমি সাধারণ কথা বললাম। বাংলাদেশ থেকে এসেছি, সবাইকে ধন্যবাদ আমাকে এরকম সুযোগ দেবার জন্য, ব্লা ব্লা…

আমার কথা শেষ হতে প্রফেসর ভ্রু কুঁচকে বললেন, ‘তোমাকে ধন্যবাদ “অ্যারাফাট” এখানে এসে ক্লাস করার জন্য। এখানে এসে তুমি অনেক কিছুই শিখবে। কিন্তু জীবন থেকে অনেক কিছু হারিয়ে ফেলবে। তুমি যখন দেশে যাবে দেখবে কোনো কিছুই আগের মত নেই তোমার সাথে। তোমার বন্ধু, বাবা-মা, সবার সাথেই কিছু একটা হারিয়ে যাবে। আমরা এই ক্লাসে তোমার থেকে অনেক কিছু জানতে পারবো। ইউ হ্যাভ মেড দিস ক্লাস মোর ডাইভার্স!’

শুরুর ক্লাসে এসব শুনে আমি বিশ্বাস করিনি। ভাবতাম আমেরিকানরা তো কতো কিছুই বলে। এদের সব কথা আবার সত্য হয় নাকি… তারপরও আম্বেরের ক্লাস আমার খুব ভালো লাগতো। সকাল ৬ টার বিশ্রী আ্যালার্মটাও সুমধুর লাগত। আ্যালার্ম শুনেই মনে হতো এই তো একটুপর আম্বেরের সাথে দেখা হবে।

ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট দেখে ক্লাসের ফাঁকেও আম্বেরের সাথে কতো গল্পই না করতাম। শুধু একাডেমিক বিষয়ই না, তাঁর অসাধারণ জীবনবোধ খুব আকর্ষণ করতো আমাকে। দেশে আসার আগে আম্বের তার বাসায় আমাকে নিমন্ত্রণ দিলেন। গিয়ে দেখি উনি তাঁর প্রিয় কুকুরকে বেজমেন্ট এ রেখে এসেছেন। অবাক হলাম, আমার কুকুরভীতির কথা উনি মনে রেখেছেন! সাথে কি নিয়ে যাব ভেবে না পেয়ে আমি অবশ্য কুকুরের জন্য বিস্কুট নিয়ে গিয়েছিলাম!

খাবার টেবিলে দেখি বিরিয়ানিসহ অনেক রকম উপমহাদেশীয় খাবার-দাবার। আমার সাথে বিরিয়ানি খাবার সময় এই শ্বেত আমেরিকান নারী হাত দিয়ে খেলেন। সিনিয়রের সাথে তাল মিলিয়ে খাওয়া ভদ্রতা। উনি না খাওয়া পর্যন্ত আমি কোনো আইটেম নেব না। আম্বের প্রতিটা আইটেম খুব মনোযোগ দিয়ে খেলেন, যদিও ওরা রাতে তেমন কিছু খায় না। খাবার টেবিল এ আমাদের সফলতা দেখার ক্ষমতা নিয়ে অনেক গল্পই করলেন উনি।

আমাকে জিজ্ঞেস করলে আমার উত্তরগুলো অনেকটাই যান্ত্রিক আর বস্তুগত হয়ে যাচ্ছিল। যেমন এই ডিগ্রি চাই, এই জব চাই, এই বিষয়ে রিসার্চ করতে চাই…. এসব শুনে আম্বের কিছু গল্প শেয়ার করলেন, ‘আমরা মানুষরা আমাদের রাস্তা হারিয়ে ফেলেছি। অ্যাটেনশন ইকোনমিক্স আমাদের আত্মাকে নষ্ট করে ফেলেছে। যান্ত্রিকতার মধ্য দিয়ে আমরা গতি পেয়েছি কিন্তু আমরাই সেখানে আজ বন্দি। আমরা সবসময়ই অনেক চিন্তা করি কিন্তু তা অনুভব কম করি। জীবনে যান্ত্রিকতার চেয়ে হিউম্যান স্কিলের দরকার অনেক বেশি। একজন ভালো গবেষক হবার জন্য l স্কিলের চেয়ে আমাদের অনেক বেশি হৃদয় দরকার। আমাদের সফলতা আর সাফল্যের মধ্যে একটা পার্থক্য আছে। ধরো মার্ক ফেইসবুক বানিয়েছে। তুমি কি মনে করো না মার্কের চেয়ে হাজার হাজার ভালো কম্পিউটার প্রোগ্রামার আছে? অবশ্যই আছে। কিন্তু মার্ক বোঝার চেষ্টা করেছে মানুষের আনন্দ। এটা মার্কের সফলতা। আর যে বড় বড় প্রোগ্রামাররা ফেইসবুকে জব করে তাঁরা সফল। মানুষই মেশিন বানায় আবার আনন্দ তৈরি করে । কিন্তু একজন মানুষ অন্যজন মানুষ থেকে আলাদা হয় তার আনন্দ তৈরির ক্ষমতা দিয়ে। আমি যখন হাসপাতালে মরতে বসি আমার মাথাতে অনেক গুলো সৃতি ভেসে উঠছিল একসাথে। আমার একবারও মনে হয়নি আমি ক্যামব্রিজ পিএইচডি। আমি ওবামার সাথে এয়ার ফোর্স ওয়ানে চরেছি। আমার মনে ভাসছিল আমি চেরি ফুল তুলতে যেয়ে পোকার কামর খেয়েছিলাম। আমার মা আমার পাশে সারারাত বসেছিলেন।’

প্রফেসরের কথা শুনে আমি মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমেরিকানদের কাছে থেকে একটা উপলব্ধি এসেছিল। কোনো কাজকে ভালো লাগাবার জন্য কোনো ডেস্টিনেশন রাখা যায়না। পুরো জার্নিটাকেই উপভোগ করতে শিখতে হয়।

আমরা সফল হবার জন্য আমাদের আনন্দগুলোকেই হারিয়ে ফেলি। একটা সময়তা ফিরে পাবার জন্য আর্তনাদ করি। কবি এলিয়টের একটা কথা আছে, ‘আবার বলে কিছু নেই, ‘হোয়াট ইজ অ্যাকচুয়াল ইজ অ্যাকচুয়াল ফর ওয়ান টাইম।’ জীবনের সব জ্ঞান, টাকা-পয়সা বা চোখের পানি দিয়ে তা ফিরে পাওয়া যায় না। তবুও আমরা বার বার আনন্দের কাছেই ফিরে যেতে চাই।

আনন্দ খোঁজার মানে জীবনের কাছে ফিরে যেতে চাওয়া। কিন্তু আমারা নিজেরাই যাইনা। লুই আড়োলের একটা গল্পে পড়েছিলাম এলিস নামে এক শিশু অলৌকিক এক শিশি পানি খেয়ে বড় হয়ে যায়। ছোট থেকে চট করে বড় হয়ে জীবনের ধৃষ্টতা গুলো মেনে নিতে পারে না। সে প্রচণ্ড কেঁদে নিজের কোমর পর্যন্ত পানির বন্যা বইয়ে দেয়। কিছুক্ষণ পর অন্য একটা শিশির পানি খেয়ে সে আবার ছোট হয়ে যায়। কিন্তু তার চোখের পানিতে যে বন্যা হয়ে গেছে। সেখানে সে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না, ডুবে যায়।

আমরাও জীবনকে এতো বেশী বস্তুগত করে ফেলেছি যেখান থেকে চাইলেও আমরা ফিরতে পারিনা। ফিরতে পারি না বলেই ফেরার এতো আকুতি। কিন্তু আমারা ফিরতে পারিনা। এজন্য আমরা এমনভাবে চলি যাতে ফিরতে ইচ্ছেই না হয়। যার ফিরতে ইচ্ছে যত কম সে তত বেশি শক্তিশালী। চোয়াল শক্ত করে একে বাস্তবতা বলি। অনেকে এটাকে ব্যক্তিত্বের মানদন্ডের মাঝেও ফেলে দেয় । আমরা দূরকে দেখতে পাবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলি। এরপরেও আমরা ক্ষণিকের জন্য হলেও আনন্দের সাথে সংঘর্ষ করে ফেলি।

এই জন্য আমারা সফল হয়েও খুব দুঃখ নিয়ে বাঁচি।

https://www.mega888cuci.com