আমরা কি ভালবাসতে ভুলে গেছি?

এখনকার সম্পর্কগুলো কেন এত কঠিন হয়? কেন আমরা এত চেষ্টার পরও ঠিকঠাকমত ভালবাসতে পারি না কাউকে? কেন মানুষ ভালবাসায় এত অদক্ষ হয়ে যাচ্ছে? আমরা কি ভালবাসতেই ভুলে গেছি? নাকি ভালবাসা কি – সেটাই ভুলে গেছি?

আমরা হয়তো প্রস্তুত নই, প্রস্তুত নই আত্মত্যাগে, মানিয়ে নিতে কিংবা নি:স্বার্থভাবে ভালবাসতে। একটা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে যে বিনিয়োগগুলো দরকার, তার জন্য হয়তো আমরা তৈরি নই। আমরা সব কিছু সহজে চাই, নীরবে চাই। নিছক কিছু বিপত্তিতেই আমাদের সম্পর্কগুলো টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের ভালবাসাগুলোকে বড় হতে দিচ্ছি না, সময়ের আগেই চলে যেতে দিচ্ছি।

আমরা হয়তো জীবনে ভালবাসা খুঁজি না। খুঁজি জীবনে উত্তেজনা ও রোমাঞ্চ। আমরা চাই এমন একজনকে যারা আমাদের সাথে সিনেমা দেখবে কিংবা পার্টি করবে, এমন কাউকে চাই না যে কি না আমরা নীরব থাকলেও মনের ভেতর কি চলছে সেটা ধরে ফেলতে পারবে।

আমরা একসাথে সময় কাটাই, কিন্তু সেগুলো আমাদের স্মৃতিতে ঠাঁই পায় না। আমরা একঘেঁয়ে কোনো জীবন চাই না। আমার জীবনে সঙ্গী চাই না, চাই এমন কাউকে যে এক নিমিষে আমাদের মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে পারে। যখন সেই জাদু বা সেই উত্তেজনা থাকে না, আমরা হঠাৎ করে আবিষ্কার করি মানুষটি এই পার্থিব জগতে আমার নয়। স্বাভাবিক সৌন্দর্য্যেও আমাদের ভরসা নেই, কারণ আমরা তো রোমাঞ্চের সন্ধানে অন্ধ।

একটা ভিষণ অসঙ্গত নাগরিক-শহুরে জীবনে আমরা নিজেদের ডুবিয়ে রেখেছি। এখানে ভালাবাসার জন্য কোনো জায়গা নেই, মসময় নেই। আমাদের সম্পর্কটা টিকিয়ে রাখার ধৈর্য্যও নেই। আমরা কেবল বস্তুগত সাফল্যের পেছনে ছুটছি, যেখানে আবেগ-ভালবাসার বিন্দুমাত্র জায়গা নেই। ভালবাসার সম্পর্কগুলো এখন তাই উপযোগীতার চেয়ে বেশি কিছু নয়।

যেকোনো কিছুতে আমরা তাৎক্ষণিত তৃপ্তি খুঁজি। তা যে কোনো কিছুই হোক না কেন – হোক তা ফেসবুকে দেওয়া কোনো স্ট্যাটাস, কিংবা নিজের ক্যারিয়ার, এমনকি ভালবাসাতেও। আমরা এক মুহূর্তে ভালবাসায় পরিপক্কতা খুঁজি, আদতে যেটা সময়ের সাথে সাথে পাকাপোক্ত হয়।

মানুষের সাথে মানুষের আবেগ দিয়ে বাঁধা যে সম্পর্ক সেটা বছরের পর বছর ধরে একটু একটু করে বড় হয়, সমৃদ্ধ হয়। প্রায় অপরিচিত একজনকে এক মুহূর্তে জীবনের সবচেয়ে আপন মানুষ বানিয়ে ফেলা যায় না। যদিও, আমাদের এত ধৈর্য্য আর সময়ের মূল্য তো অনেক, ভালবাসা দিয়ে তো আর সেটা পোষাণো যায় না।

আমরা একঘণ্টা করে হাজারজন মানুষের সাথে কাটাতে পারি, কিন্তু কাউকে একটি দিন দিতে পারি না। আমরা সব সময় হাতে ‘বিকল্প’ রেখে দেই। আর অবশ্যই আমরা ‘সামাজিক’ জীব। আমরা একজন মানুষকে জানা-বোঝার চাইতে তাঁর সাথে মেলামেশাকে বেশি প্রাধান্য দেই।

আমরা লোভী। আমাদের সব কিছ চাই। আমরা ক্ষণিকের খানিক মোহে সম্পর্কে জড়াই, আর সেই মূহূর্তে সরে আসি যখন আমরা তাঁর চেয়েও ‘ভাল কিছু’ খোঁজ পাই। আমাদের কাছে ভালবাসা মানসিক নয়, বস্তুগত এক ব্যাপার।

আমরা কোনো একজনের ভেতর থেকে সেরাটা বের করার চেষ্টা করি না। আমরা চাই সে ‘পারফেক্ট’ হবে। আমরা অনেকের সাথে মেলামেশা করি, অনেকের সাথে সো কল্ড ‘ডেট’ করি, কিন্তু সত্যিকারের সুযোগ কাউকে দেই না। আমরা সবাইকে নিয়ে হতাশ।

প্রযুক্তি আমাদের খুব কাছাকাছি নিয়ে এসেছে, এতটা কাছাকাছি যে নি:শ্বাস নেওয়াও কঠিন। আমাদের শারীরিক উপস্থিতি গ্রাস করেছে মেসেজ, ভয়েস মেসেজ, স্ন্যাপ চ্যাট কিংবা ভিডিও কল। আমাদের এখন আর এক সাথে সময়ের কাটানোর প্রয়োজন নেই। আমরা তো একে-অপরের সব কিছুই জানি, কথা বলার কিছু তো আর বাকি নেই।

আমরা ‘বিস্ময়কর’ এক প্রজন্ম, যারা এক জায়গায় বেশিক্ষণ টিকে থাকতে পারি না। আমরা প্রতিশ্রুতি-ফোবিযাতে আক্রান্ত। আমরা অশান্ত। আরাম করে চুপচাপ বসে থাকতেও আমরা ভয় পাই। একটি মানুষের সাথে আজীবন থাকতে হবে জেনে আমরা ভয়ে কেঁপে উঠি। আমরা এড়িয়ে যাই। স্থায়িত্ব বা টেকসইতাকে এমনভাবে অবজ্ঞা করি যেন এটা রীতিমত একটা ‘সামাজিক শত্রু’। আমরা অন্যদের চেয়ে আলাদা – এটা ভাবতেই আমাদের তৃপ্তি। সামাজিক রীতি আমরা মানি না, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় শান্তি, সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।

আমরা এমন একটা প্রজন্মে যারা শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনে নিজেদের স্বাধীন বলে মনে করি। আমরা যৌনতাকে ভালবাসার চেয়ে আলাদা করে দেখি। আমরা ‘হুক আপ ব্রেক আপ’ প্রজন্ম। আমাদের কাছে প্রথমে শরীর, পরে ভালবাসা। যৌনতা এখানে সহজ, বিশ্বাসভাজন হওয়া শক্ত।

আমরা শারীরিক সম্পর্কে জড়াই, কারণ আমরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলি, কিংবা আমরা ভাল বোধ করতে চাই, এর মধ্যে ভালবাসার কোনো ব্যাপার-স্যাপার নেই। আমাদের এই ক্ষণিকের আমোদই চাই। সম্পর্কের বাইরে কিছু করার ট্যাবু আমরা ভেঙে ফেলেছি। সম্পর্কগুলোও তাই এখন উদ্ভট – ওপেন রিলেশনশিপ, ফ্রেন্ডস উইদ বেনিফিটস, ক্যাজুয়াল ফ্লিংস, ওয়ান নাইট স্ট্যান্ড – ভালবাসার জন্য আমাদের মধ্যে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই।

আমরা খুব বাস্তববাদি প্রজন্ম যারা নিজেদের লজিকগুলো নিজেরাই চালাই। কিভাবে পাগলের মত ভালবাসতে হয় সেটা আমরা জানি না। আমরা হঠাৎ করে বিমানে চেপে কিংবা অনেক দূর ভ্রমণ করে কাউকে চমকে দিয়ে ভালবাসতে জানি না। দূরত্বের দোহাই দিয়ে আমরা সম্পর্ক ভেঙে দিতে সিদ্ধহস্ত। আমরা ভালবাসার ক্ষেত্রে সুঁচিবায়ুগ্রস্থ, নিজের ভাল আমরা খুব ভাল বুঝি।

আমরা ভয়ে ভয়ে থাকা একটা প্রজন্ম। আমরা প্রেমে পড়তে ভয় পাই, কাউকে প্রেমে পটাতে ভয় পাই, প্রতিশ্রুতি দিতে ভয় পাই, কাউকে কষ্ট দিতে ভাই, নিজেরা কষ্ট পেতে আরো বেশি ভয় পাই। আমরা কাউকে নি:স্বার্থ ভাবে ভালবাসতে পা বাড়াই না।

আমরা নিজেদের বানানো অদৃশ্য একটা দেওয়ালে বন্দী হয়ে থাকি, ভালবাসা খুঁজতে থাকি, খুঁজে পাওয়া মাত্রই আমরা পালিয়ে যাই। হঠাৎ করে মহামূল্যবান সম্পদ হাতে পেয়ে আমরা নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলার ভয় পাই। আমরা খুব ভঙ্গুর হতে চাই না। আমরা নিজেদের নগ্ন আত্মা কাউকে সপে দিতে চাই না। পারলে দারোয়ান দিয়ে সেটা রক্ষা করি।

আমরা সম্পর্কগুলোকে মূল্য দিতে জানি না। আমরা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মানুষটিকেও নদীর অন্য মাছগুলোর জন্য ছেড়ে দিতে পারি। আমরা তাদের আর পবিত্র বলে মনে করি না।

পৃথিবীতে এমন কিছু নেই যা আমরা জয় করতে পারি না। অথচ, ভালবাসার খেলায় আমরা হাত গুটিয়ে বসে থাকি – অথচ এটাই সেরা মানবীয় বৈশিষ্ট!

https://www.mega888cuci.com