আজকের শিশু: আগামী দিনের পরিপূর্ণ মানুষ না যন্ত্রমানব?

ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া আনিলার প্রিয় খেলা আইফোনের ক্যান্ডি ক্রাশ গেম।

‘আমি ওর বয়সে মাঠে খেলে আর রংবেরঙের ছবি এঁকে শৈশব পার করেছি, আর ও কাগজের চাইতে বিভিন্ন অ্যাপসে ছবি আঁকতেই বেশি সাচ্ছ্যন্দবোধ করে’, অনেকটা আপেক্ষের সুরেই কথাগুলো বলছিলেন আনিলার মা। এমনকি ১৩ মাস বয়সী জাওয়াদেরও রয়েছে ডিভাইস প্রীতি। সামনে তার ট্যাব খোলা থাকা চাই, না পেলেই কান্না জুড়ে দিবে ও।

অথচ এক দশক আগেও এই চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল। ছোটদের খেলার পরিধি ছিল মাঠ জুড়ে, কল্পনার রঙ মেলত তারা গল্পের বই কিংবা কমিক্সের পাতায় পাতায়। ভিডিও গেমসের উপস্থিতি থাকলেও, তখনও তা শৈশবকে গ্রাস করতে পারেনি। অথচ এখন টিভি কিংবা ল্যাপটপে প্রিয় ভিডিও ছাড়া না হলে বাচ্চাদের রীতিমত খাওয়া বন্ধের উপক্রম হয়।

অনেক অভিভাবক একে নিছক ছেলেমানুষী বলে উড়িয়ে দিলেও, শিশুদের ওপর এই আসক্তির রয়েছে দীর্ঘমেয়াদী শারীরিক ও মানসিক প্রভাব। শিশু-বিশেষজ্ঞ মো: মারুফুজ্জামানের মতে, ‘শিশুদের অতিরিক্ত ডিভাইস আসক্তির ফলে ত্রুটিপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস তৈরি হয়। শিশু সময়মত খেতে চায় না, আর খেলেও তা অনেক সময় ধরে। এছাড়াও দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ট্যাব নিয়ে বসে থাকার ফলে শিশুর শরীরে দেখা দেয় ‘ওবেসিটি’ বা স্থুলতা রোগ।’

বয়োজ্যেষ্ঠরা অনেকক্ষেত্রেই শিশুদের এই টেক-প্রীতিকে মেধা বিকাশে সহায়ক বলে মনে করেন। অ্যাপ নির্মাতারাও তাদের তৈরি নিত্য-নতুন অ্যাপগুলোকে শিশুবান্ধব বলে প্রচার করে থাকে। কিন্তু বিশ্লেষকদের মতে, এইসকল শিক্ষামূলক অ্যাপ পড়ালেখার মনোযোগে ব্যঘাত ঘটাচ্ছে বলে জানায় টেক টাইমস।

বলা হয় শিশুদের মন কাদার মত। তাকে যেভাবে গড়া হবে, সে সেভাবেই বড় হয়ে উঠবে। ট্যাব-মোবাইল ইত্যাদি ইলেক্ট্রনিক ডিভাইস কিংবা গ্যাজেটে বেশি নির্ভরশীল হয়ে গেলে সে নিজের চারপাশে একটা ‘হাইপার রিয়েলিটি’ বা নিজস্ব জগৎ তৈরী করে। নি:সন্দেহে সেটা অবাস্তব জগৎ।  গ্যাজেটে দীর্ঘ সময় আসক্ত থাকলে এই অবাস্তব জগতের প্রবলতা বাড়ে। তখন যেখা যাবে আর মোবাইল, ট্যাব ছাড়া খাবার খেতে চাইবে না, ঘুমাতে চাইবে না।  সব কিছু বন্ধ করে দিলে একেবারে খাওয়া-ঘুম বন্ধ করে দেবে। এই সময়ে মানসিক প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।

ঢাকা মেডিকেলের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ডাঃ রশিদুল হক জানান, ডিভাইস নিয়ে ব্যস্ত থাকার কারণে শিশুরা বাস্তবতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তাদের মধ্যে জেদ ও একরোখা স্বভাব বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে মা-বাবার সাথে সম্পর্কের অবনতি ঘটছে। তিনি পরামর্শ দেন, এরকম অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে পরিবারকে এগিয়ে আসতে হবে। তবে একদিনে নয়, ধীরে ধীরে অন্যান্য কাজে আগ্রহ সৃষ্টির মাধ্যমে শিশুকে এই আসক্তি থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করতে হবে।

রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যেন এই সময়কে উৎসর্গ করেই লিখেছিলেন, ‘দৃশ্যমান প্রযুক্তির জটাজুটে অবরুদ্ব কাল।’ আর এই প্রযুক্তির জালে আটকে পড়ছে কোমলমতি শিশুরাও। এখান থেকে মুক্ত করতে হলে, তাদের হাতে ট্যাব কিংবা ফোনের বদলে তুলে দিতে হবে রং-তুলি, ছড়া অথবা গল্পের বই।

প্রতিদিন না হলেও সপ্তাহে অন্তত একদিন আপনার সোনামণিকে নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন মাঠে, প্রকৃতির কাছাকাছি। এই ছোট কিছু পদক্ষেপই সাহায্য করবে আপনার শিশুকে ‘যন্ত্রমানব’ নয় বরং একজন পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে।

https://www.mega888cuci.com