অভিষেকে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই ভালো!

বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হয়ে কেউ অভিষেকে হৈ চৈ করা চমকপ্রদ কোনো কীর্তি করে বসলে আমি শংকিত হয়ে উঠি! আর কোনোরকম সাদামাঠা সূচনা হলেই বরং আনন্দিত হই! এইটুকু পড়ে যে কেউ ‘ছি ছি’ করে উঠে প্রশ্ন তুলতে পারেন আমার ক্রিকেটজ্ঞান নিয়ে। এবং সেটাই স্বাভাবিক!

শুরুতেই সতর্ক করে দিই- ফেসবুকে একটু বড় লেখায় যাঁদের ‘এলার্জি’ আছে, তাঁরা এখনই কেটে পড়–ন, প্লিজ! এই সেদিন পেস অলরাউন্ডার সাইফউদ্দিনের ওয়ানডে অভিষেকে ব্যর্থতায় যাওবা ‘খুশি’ হলাম; দেখি পরের ম্যাচেই বাদ দিয়ে দেয়া হলো তাঁকে! আহ, বেচারা!

বাংলাদেশের ক্রিকেট কর্তারা বোধহয় রেকর্ড ও ইতিহাসের পাতায় চোখ বোলান না! হয়তো সময়ও পান না! ‘নগদনারায়ন’ সাফল্যই চাই তাঁদের! অথচ শেষ পর্যন্ত সেটাই আমাদের জন্য হয় ‘কাল’!

বাংলাদেশের ক্রিকেটে অভিষেকে সাফল্যের উদাহরণ ভূরি ভূরি! সেই ২০০০ সালের ১০ নভেম্বর ভারতের সঙ্গে দেশের অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরি করা আমিনুল ইসলাম বুলবুল ও ইনিংসে ৬ উইকেট নেয়া নাঈমুর রহমান দূর্জয় পরে ক্যারিয়ারে আর ওই অর্জন টপকাতে পারেননি।

২০০১ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে টেস্ট অভিষেকে যে সর্বকনিষ্ঠ খেলোয়াড় হিসেবে সেঞ্চুরি করেছেন আশরাফুল; সেই ‘বোঝা’ তাঁকে বয়ে বেড়াতে হয়েছে সবসময়! ‘আশার ফুল’ পারেন নি শুরুর সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে। পেসার আবুল হাসানকে মনে আছে, যিনি অভিষেক টেস্টে দশ নম্বরে নেমে সেঞ্চুরি করেছিলেন? অথচ এরপর হারিয়েই গেছেন!

নজর দেয়া যাক ওয়ানডেতে। ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে অভিষেক ম্যাচেই ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তাসকিন আহমেদ। পরের বছর মোস্তাফিজুর রহমানও ওয়ানডে অভিষেকে ভারতকে কাঁপিয়ে দখল করেন ৫ উইকেট! কিন্তু এখন তাদের কাছে উইকেট যেন হয়ে উঠছে সোনার হরিণ! বিশ্বের একমাত্র খেলোয়াড় হিসেবে ওয়ানডে অভিষেকে হ্যাটট্রিক করা তাইজুল ইসলাম তো ওয়ানডে দলেই জায়গা পান না! ফরহাদ রেজা জীবনের প্রথম ওয়ানডেতে ফিফটি করেও বাংলাদেশ দলে কখনো জায়গা পাকা করতে পারেন নি।

তাহলে দেখা যাচ্ছে, অভিষেকে আলোড়ন তোলাদের সামনে বড় বিপদ এসে দাঁড়ায়! কেন? সম্ভাব্য কারণ দুটি…

১. আমাদের সমর্থকরা ধরেই নেন যে, অভিষেক ম্যাচের মতো প্রত্যেক ম্যাচেই তিনি তেমন অসাধারন কিছু করবেন! টিম ম্যানেজমেন্টও হয়তো তেমন কিছুই চায়! ফলে গড়পড়তা পারফরম্যান্সে কারোই মন ভরে না, পোষায়ও না! ওদিকে প্রত্যাশার চাপে ভেঙ্গেচুরে যদিওবা ক্যারিয়ার এগিয়ে নেন, সাফল্য পান না খুব বেশি।

২. শুরুতে আলোড়ন তুললে ক্রিকেট বিশ্বে হৈ চৈ সৃষ্টি হয়। প্রতিপক্ষ অনেক বেশি গবেষণা করে সেই খেলোয়াড়কে নিয়ে। আধুনিক বিজ্ঞানকে কাজে লাগিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষণে বেরিয়ে আসে তাঁর শক্তি ও দূর্বলতার জায়গা। তাঁর বিপক্ষে পরিকল্পনা সাজানো হয় বিশেষভাবে। আমাদের মোস্তাফিজ যেমন সব দলের ল্যাপটপে ঢুকে গেছেন! বিভিন্ন দল খেলতে নামার আগে তাঁকে নিয়ে অনেক হোমওয়ার্ক করে। ফলে তার পক্ষে উইকেট পেতে অনেক কস্ট করতে হয়। আশরাফুলও পুরো ক্যারিয়ারে প্রতিপক্ষের চোখে প্রতিভাবানের তকমা পেয়েছেন।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দিকে দৃষ্টিপাত করলে দেখা যায় শুরুতে ব্যর্থরাই পরে রাজত্ব করেছেন! টেস্ট ও ওয়ানডেতে সর্বাধিক রানের মালিক ভারতের শচীন টেন্ডুলকার টেস্ট অভিষেকে করেছিলেন ১৫ এবং প্রথম দুটি ওয়ানডেতেই আউট হয়েছিলেন শুন্য রানে!

শ্রীলঙ্কার মুরলিধরন ওয়ানডে ও টেস্টে সবার চেয়ে বেশি উইকেট নিলেও শুরুর দুই ওয়ানডে ম্যাচে পেয়েছিলেন একটি করে উইকেট, টেস্ট অভিষেকে তিনটি। আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে যাঁর রান সবচেয়ে বেশি, সেই নিউজিল্যান্ডের ব্রেন্ডন ম্যাককালাম অভিষেক ম্যাচে করেছিলেন ৩৬। এক্ষেত্রে সর্বোচ্চ উইকেট দখলে নেয়া পাকিস্তানের শহীদ আফ্রিদি তো প্রথম দুটি ম্যাচে কোনো উইকেটেরই মুখ দেখেন নি!

ইংল্যান্ডের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানদের একজন মানা হয় গ্রাহাম গুচকে। তিনি চশমা, মানে জোড়া শুন্য দিয়ে শুরু করেছিলেন টেস্ট ক্যারিয়ার! এক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কার মারভান আতাপাত্তু জীবনের প্রথম তিন টেস্টের ছয় ইনিংসে সর্বমোট এক রান করে ছাড়িয়ে গেছেন সবাইকে! অস্ট্রেলিয়ার স্পিন সম্রাট শেন ওয়ার্ন ভারতের সঙ্গে অভিষেক টেস্টে একখানা উইকেট নিতে গুনেছিলেন ঠিক দেড়’শ রান! বাংলাদেশের এখনকার পেস বোলিং কোচ ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোর্টনী ওয়ালশ অভিষেক টেস্টের প্রথম ইনিংসে বলই হাতে নেয়ার সুযোগ পাননি; দ্বিতীয় ইনিংসে পেয়েছিলেন ২ উইকেট!

বাংলাদেশ দলেও তো সার্বিক বিবেচনায় অভিষেকে চমকে দেয়ারা নয়, বরং সাদামাঠা শুরু করাদেরই জয়জয়কার! মাশরাফি, মুশফিক, সাকিব, তামিম ও মাহমুদউল্লাহ- বাংলাদেশের ক্রিকেটের এই পঞ্চরত্নের কারোই কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের কোনো সংস্করণে অবিস্মরণীয় কোনো নৈপূণ্যের ঝলকে অভিষেক হয়নি।

কিন্তু তাঁরা আস্তে ধীরে ঠিকই দাপট দেখিয়ে দলের মধ্যমনিতে পরিনত হয়েছেন এবং বাংলাদেশকে দারুণ সব সাফল্য এনে দিয়েছেন। অন্য চারজনের তুলনায় মাহমুদউল্লাহ টেস্ট অভিষেকে তবুও সফল ছিলেন। কিন্তু ইনিংসে ৫টি সহ ৮ উইকেট পেলেও এখন বোলার মাহমুদউল্লাহকে হিসেবে ধরা হয় না এবং টেস্ট দলেও তিনি নিয়মিত নন।

তাহলে রহস্য কী? খুব সোজা। ক্যারিয়ারের শুরুতে ব্যর্থ হলে পরে পরিশ্রম, ধৈর্য্য আর সাধনার ত্রিমুখি সমীকরণে সেই খেলোয়াড় নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তোলার চেস্টা করেন যা পরে এনে দেয় দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য।

এ ব্যাপারে বিস্তারিত লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে! সাইফউদ্দিন টি-টোয়েন্টির পর ওয়ানডে অভিষেকেও উইকেট পান নি। কে জানে, যদি সুযোগ পান তবে টেস্ট ডেব্যুতেও উইকেটশুন্য থাকবেন কী-না! তারপরও তাঁকে কিন্তু বাতিলের খাতায় ফেলে দিতে পারবেন না! এখানে সাইফউদ্দিনকে প্রতীকিও ধরতে পারেন।

হ্যাঁ, কেউ কেউ ধুমকেতুর মতো এসে দ্রুত মিলিয়ে যান; আবার কেউ কেউ মিটিমিটি করে দৃশ্যমান হয়ে পরে জ্বলতে থাকেন ধ্রুবতারার মতো! কোনটা ভালো?

https://www.mega888cuci.com